রোহিঙ্গা ইস্যুতে স্বচ্ছতা কাম্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর হত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে এসে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করছিল। সব মিলিয়ে এই সংখ্যাটি ১২ লাখের কাছাকাছি হয়ে যেতে পারে বলে অনেকেই অনুমান করছেন। এটাই সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট। এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। অনেক এনজিও, দেশ এ ব্যাপারে নানা সময়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু সংকট মোকাবিলার ব্যাপারটা কীভাবে সম্পন্ন হবে সেটা বোধহয় এক বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গত দুই বছরের বেশি সময়ে তিনবারের বেশি উদ্যোগ নেয়া হয়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের। কিন্তু তার ফলাফল শূন্য। রোহিঙ্গারা জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে চায় না। এটা ঠিক, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিই প্রাধান্য পাওয়া উচিত। আর এটা মিয়ানমারকে নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এর জন্য মিয়ানমারের প্রতিই চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের দায়টি বোধহয় শুধু বাংলাদেশের একার বিষয় হয়ে উঠেছে। বাকি সবার অবস্থা অনেকটা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো’। সরকারের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগও করা হয়েছে, কোনো কোনো এনজিও প্রকাশ্যেই প্রত্যাবাসনবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ অর্থের একটি বড় অংশ বিলাসিতায় ব্যয় করছে বলে ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গত মার্চে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিদেশি এনজিওগুলো বরাদ্দের তিন-চতুর্থাংশই বাংলাদেশে আসা তাদের কর্মীদের জন্য ব্যয় করছে। কেবল ছয় মাসেই এনজিও কর্মকর্তাদের হোটেল বিল বাবদ খরচ করা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। আর তাদের জন্য ফ্ল্যাট ভাড়ায় ব্যয় হয়েছে ৮ কোটি টাকা।’ তাহলে এসব এনজিওর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভূমিকা কী? সম্প্রতি টিআইবি এ ব্যাপারে একটি গবেষণা প্রতিবেদন দাখিল করেছে। তাতে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার কাজে থাকা এনজিওগুলো নিজেদের পরিচালন ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ করতে চায় না। যে হিসাব তারা দেয়, প্রকৃত ব্যয় তার চেয়ে বেশি। জাতিসংঘের যে সংস্থাগুলো কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রে কাজ করছে, তাদের মধ্যে ইউএন উইম্যানের পরিচালন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। যে টাকা তারা সেখানে খরচ করছে, তার ৩২ দশমিক ৬ শতাংশই ব্যয় হচ্ছে পরিচালন বাবদে। বাকি ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে খরচ করছে তারা। টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে ইউনিসেফের পরিচালন ব্যয় সবচেয়ে কম, তাদের মোট ব্যয়ের ৩ শতাংশ। বাকি ৯৭ শতাংশ টাকাই তারা কর্মসূচিতে ব্যয় করে। ২০১৯ সালে মানবিক সহায়তার তহবিলে বাংলাদেশ আড়াই মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কটের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ধীরে ধীরে কমে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা অনুদান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, ফলে খাতভিত্তিক বিভিন্ন সহায়তার অপ্রতুলতা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের ওপর আর্থিক ঝুঁকির আশংকা তৈরি করছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কমপক্ষে ২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে রোহিঙ্গাদের পেছনে। পরোক্ষ ব্যয় আরো অনেক বেশি। এ ছাড়া রয়েছে আর্থ-সামাজিক, পরিবেশ ও রাজনৈতিক সংকট। ফলে সকল দিক থেকেই এখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি স্বচ্ছতা আসা উচিত। সত্যিকার অর্থেই এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন স্থানীয়দের কাছে বোঝাস্বরূপ হয়ে উঠেছে। তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও নিশ্চিত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা উচিত। এর জন্য মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিকভাবে চাপ বাড়াতে হবে। আর যেসব দেশ এই বিষয়ে দুমুখো নীতি নিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে তাদের ব্যাপারেও সতর্ক থেকে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..