ধুলায় ধূসর নগরে আক্রান্ত মানুষ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : রাজধানীজুড়ে চলমান নির্মাণকাজে বায়ুদূষণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বয়স্ক ও শিশুদের নাক-চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের অসুখ। শীত ঘনিয়ে আসার এই সময়ে এসব রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা লোকজনের চাপও বেড়েছে। রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে বহির্বিভাগে টিকেট কিনে চিকিৎসকের সাক্ষাতের অপেক্ষায় থাকা ইব্রাহিমপুরের গৃহিণী ঝিনুক বলেন, ‘শীত আসার পর সর্দিকাশি বেড়ে গেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্বাসকষ্ট। আমি ধুলা সহ্য করতে পারি না। কিন্তু রাস্তাঘাটে ধুলার কারণে হাঁটা যায় না। বাসাতেও অনেক ধুলাবালি। শীত আসার পর শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে। এজন্যই এসেছি ডাক্তার দেখাতে।’ জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবরে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাজনিত রোগের চিকিৎসা নিতে এ হাসপাতালে রোগী বেশি এসেছে। নভেম্বরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শ্বাসতন্ত্রের জটিলতার চিকিৎসা নিতে এসেছেন এ হাসপাতালে। মাসের প্রথম ১২ দিনের হিসাব বলছে, ৪ হাজার ৭১৬ জন রোগী এ হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার চিকিৎসা নিয়েছেন। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে পঞ্চাশোর্ধই বেশি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। চিকিৎসা নিতে নিয়মিত আসা রোগীদের মধ্যে রয়েছে শিশুরাও। সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে বেড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর সংখ্যা। চিকিৎসকরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে শিশু ও বয়স্করাই বেশি ঝুঁকিতে। তবে রোগীদের মধ্যে নারীদের তুলনায় পুরুষের সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক এবং রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মো. সেরাজুল ইসলাম জানালেন, আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও পর্যাপ্ত সিট নেই। ‘এ সময় ধানকাটা এবং অন্যান্য কৃষিকাজ শুরু হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে রোগী কম আসে। নইলে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হত। ৬৬৫ শয্যার এ হাসপাতালে কোনো সিট খালি নেই।’ ঢাকা শিশু হাসপাতালের অ্যাজমা সেন্টারে গিয়েও চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের ভিড় দেখা গেছে। তিন বছরের ছেলে আবদুল্লাহর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় তাকে নিয়ে হাসপাতালে আসেন মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের বাসিন্দা শাহ আলম। শ্বাসতন্ত্রের রোগের জন্য এলাকার ধুলাবালির আধিক্যকে দায়ী করে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় মাস্ক পরে ঘুরি। ছেলেকে নিয়ে বাইরে বের হলেও মাস্ক রাখি। কিন্তু এরপরও তার এ অসুখটা এড়ানো গেল না। গত তিনদিন ধরে সর্দি লেগেছে, সঙ্গে শ্বাসকষ্ট।’ মিরপুরের পীরেরবাগ পাকা মসজিদ এলাকার বাসিন্দা অমিয়কে নিয়ে এসেছে তার বাবা নাজমুল হাসান। তিনিও জানান, তার সন্তান শীতের সময় বেশি কাবু হয়ে পড়ে। ১৮ নভেম্বর থেকে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হলে হাসপাতালে রোগী কিছুটা কমে আসে। কিন্তু শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগে আক্রান্ত রোগী বেড়েছে বলে জানান অ্যাজমা সেন্টারের সমন্বয়ক ডা. কামরুজ্জামান কামরুল। এ চিকিৎসা কেন্দ্রের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরের কয়েক দিনের তথ্য তুলনা করে দেখা গেছে নভেম্বরেই বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে এসেছে। দেখা গেছে, ৫ সেপ্টেম্বর ২০ জন, ১৬ সেপ্টেম্বর ১৪ জন, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯ জন, ১৮ সেপ্টেম্বর ২৪ জন এবং ২০ সেপ্টেম্বর ৩৫ জন শিশু চিকিৎসা নিতে এসেছে। অন্যদিকে ১৭ নভেম্বর ৩১ জন, ১৮ নভেম্বর ২৪ জন, ১৯ নভেম্বর ২৫ জন, ২০ নভেম্বর ১০ জন, ২১ নভেম্বর ২২ জন এবং ২২ নভেম্বর ৩৩ জন শিশু চিকিৎসা নিতে অ্যাজমা সেন্টারে আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, বায়ু দূষণের কারণে নাক, চোখ, শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে চোখ জ্বালাপোড়া, চোখ দিয়ে পানি পড়া, নাকের নানা ধরনের অসুখ হয়। এতে শিশু ও বয়স্কদের এমনকি ক্যান্সার হওয়াও আশঙ্কা রয়েছে বলে জানালেন তিনি। ‘বাতাসে থাকা নানা ক্ষতিকর উপাদান গলা ও ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্যও দায়ী বাতাসে থাকা কিছু ক্ষতিকর উপাদান। শিশুরা বাইরে বেশি থাকে বলে আক্রান্ত হয়। আর বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আস্তে আস্তে কমে যায়। এ কারণে সহজেই তারা আক্রান্ত হয়ে যায়।’ বর্তমানে ঢাকার বাতাসে যে ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা যে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি, পরিবেশ অধিদপ্তরও তা স্বীকার করছে। গত ২৬ নভেম্বর ঢাকার বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার) পরিমাণ ছিল ১৯০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন)। এর আগের ছয়দিনও বাতাসে ভারী বস্তুকণার উপস্থিতি ছিল সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম) পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রাম অর্থ্যাৎ পিপিএম এককে। এসব বস্তুকণাকে ১০ মাইক্রোমিটার ও ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ব্যাস শ্রেণিতে ভাগ করে তার পরিমাণের ভিত্তিতে ঝুঁকি নিরূপণ করেন গবেষকরা। বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের বস্তুকণার পরিমাণ যদি শূন্য থেকে ৫০ এর মধ্যে থাকে, তাহলে ওই বাতাসকে বায়ু মানের সূচকে (একিউআই) ‘ভালো’ বলা যায়। এই মাত্রা ৫১-১০০ হলে বাতাসকে ‘মধ্যম’ মানের এবং ১০১-১৫০ হলে ‘বিপদসীমায়’ আছে বলে ধরে নেয়া হয়। আর পিপিএম ১৫১-২০০ হলে বাতাসকে ‘অস্বাস্থ্যকর’, ২০১-৩০০ হলে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-৫০০ হলে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। ডা. মো. সেরাজুল ইসলামও বলেন, ‘বাতাসে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। বায়ুদূষণের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। বাতাসে শরীরের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন উপাদান ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর তাৎক্ষণিক কুফল, মানুষের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আর দীর্ঘ মেয়াদে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।’ রাজধানীর বায়ুদূষণ রোধে ব্যবস্থা নিতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর ধুলাবালিপ্রবণ এলাকায় এর আগে পানি ছিটানো হলেও শুধু পানি ছিটিয়ে এই বায়ুদূষণ কমবে না বলে করেন তিনি। এক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়ে সেরাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে বাতাস থেকে ক্ষতিকর পদার্থ শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ সম্প্রতি এয়ারভিজুয়াল ডটকমে বিশ্বের সর্বাধিক দূষিত বায়ুর দেশের তালিকায় ৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম উঠে আসে শীর্ষে। তাদের হিসাবে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের ভাসমান বস্তুকণার পরিমাণ ছিল গড়ে ৯৭ দশমিক এক শূন্য মাইক্রো গ্রাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..