প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে ইট তৈরি ভারতীয় শিক্ষার্থীর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : ঢাকার আশপাশের থাকা অজস্র ইটভাটার কারণে ঢাকার দূষণ ভয়াবহ মাত্রা পেয়েছে। ইটভাটা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়াবিষয়ক একটি আদেশ এই কিছুদিন আগেই এসেছে উচ্চ আদালত থেকে। কিন্তু এসবে কিছু হচ্ছে না। অবকাঠামো উন্নয়নের কথা উঠলে নির্মাণসামগ্রী তো লাগবেই। অন্যতম নির্মাণসামগ্রী হিসেবে ইট নিজের স্থান এখনো বেশ পোক্তই রেখেছে। আর এর কারণ, যথাযথ বিকল্পের অভাব। এই অভাবটিই এতদিন ধরে দেখিয়ে আসছে সবাই। আর এ সুযোগে যেনতেনভাবে পরিবেশ বিধি না মেনে তৈরি হয়েছে একের পর এক ইটভাটা। কিন্তু এবার মনে হয় এ অজুহাতে একটু লাগাম পরাতে হচ্ছে। কারণ বিকল্প ইটের উপস্থিতি। একে বলা হচ্ছে প্লাস্টিকিউব, যা তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিকবর্জ্য থেকে। আর তৈরি করেছেন ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিষেক ব্যানার্জি ও তাঁর দল। অভিষেক একটি ইভাটায় গিয়ে সেখানকার পরিবেশ ও শ্রমিকদের সঙ্গে ভাটা কর্তৃপক্ষের আচরণ দেখেই এ ধরনের কিছু করার ব্যাপারে প্রথম উজ্জীবিত হন। ২২ বছর বয়সী এই তরুণ নিজের ইটভাটা পরিদর্শনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সিএনএনকে বলেন, ‘সেখানে শ্রমিকরা ভয়াবহ অমানবিক পরিবেশে থাকেন। হাত দিয়ে কাদা তুলে কাজ করেন তাঁরা। সেখানকার কর্মপরিবেশ ভয়াবহ।’ অভিষেক বলেন, ‘ইটভাটায় দাসশ্রম চলে বললেও ভুল হবে না। অনেক শ্রমিকই সেখানে ঋণের জালে আটকা পড়ে শ্রম দিতে বাধ্য হন। আর পরিবেশ-প্রকৃতির ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় আনলে তো কথাই নেই।’ ভারতে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটা থেকে সালফার ডাই অক্সাইড থেকে শুরু করে নানা বায়ুদূষক পদার্থ নির্গত হয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতে শুধু ইট তৈরিতেই প্রতি বছর দেড় থেকে দুই কোটি টন কয়লা পোড়ানো হয়। আর এ থেকে নির্গত হয় ৪ কোটি টনেরও বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড। এসব নানা পরিসংখ্যান ছিল অভিষেকের সামনে। তিনি তাঁর তিন বন্ধু অগ্নিমিত্র সেনগুপ্ত, অঙ্কন পোদ্দার ও উৎসব ভট্টাচার্যকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁরা ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কিউব নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানই তৈরি করেছে প্লাস্টিকিউব নামের নির্মাণসামগ্রীটি, যা প্লাস্টিকবর্জ্য থেকে তৈরি। বিকল্প ইট হিসেবে এটি ভালো কাজ করবে বলে তাঁরা আশাবাদী। এখনো কোনো ভবন তৈরিতে এটি কাজে না লাগালেও পরীক্ষাগারে বেশ কিছু পরীক্ষায় বেশ সাফল্যের সঙ্গে এটি উৎরে গেছে। অভিষেক বলছেন, এটি প্রচলিত কাদা থেকে তৈরি ইটের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও শক্ত হবে। এটি দিয়ে কাঠামো নির্মাণের জন্য আরেক পরিবেশ দূষণকারী সামগ্রী সিমেন্টের প্রয়োজন পড়বে না। কারণ, এটি অনেকটা লেগোর মতো। একটি সঙ্গে অন্যটি জুড়ে দেওয়া যাবে কোনো ধরনের সিমেন্ট ছাড়াই। এরই মধ্যে অগ্নি প্রতিরোধী হিসেবে এটি উৎরে গেছে। এই প্লাস্টিকিউব তৈরিতে খরচ পড়ে পাঁচ থেকে ছয় রুপি। অথচ বাজারে প্রচলিত ইট বিক্রি হয় ১০ রুপিতে। ফলে খুব সহজেই এটি প্রচলিত ইটের বাজারে ভাগ বসাতে পারবে বলে মনে করছেন তরুণ এ উদ্ভাবকেরা। সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্লাস্টিকিউব তৈরিতে কোনো চুল্লির প্রয়োজন পড়ে না। ফলে শুধু ইট পোড়ানোর কারণে সৃষ্ট পরিবেশস দূষণের কোনো আশঙ্কাই এখানে থাকছে না। আবার এটি তৈরিতে প্লাস্টিকবর্জ্য ব্যবহার করা হচ্ছে বলে, পরিবেশকেও প্লাস্টিক দূষণ থেকে এটি রক্ষা করতে পারে। প্রতিটি প্লাস্টিকিউব তৈরিতে লাগে দেড় কেজির মতো প্লাস্টিক। এমন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে অভিষেক ও তাঁর দল পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। এরই মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে ফোর্বসের তালিকায় ঢুকে পড়েছেন তাঁরা। কম্পোজিট থেকে বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী তৈরি এটিই অবশ্য প্রথম নয়। বাংলাদেশেও এ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। এক পরমাণু শক্তি কমিশনেই এ সম্পর্কিত বহু গবেষণা এখন পর্যন্ত হয়েছে। এর দু-একটি নিয়ে সাময়িক হইচই হলেও পরে তা হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে হওয়া কম্পোজিট ম্যাটেলিয়াল নিয়ে গবেষণাগুলোর মূলে থাকে পরিবেশ সংবেদনশীলতা। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে গবেষণাকাজে গিয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর হতে পারে এমন বেশ কিছু সামগ্রী তৈরি করতে সমর্থ্য হয়েছেন। এর মধ্যে কিছু গবেষণার ফলাফল বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে জায়গা করে নিলেও পরে তা হারিয়ে গেছে। বাস্তব উৎপাদনে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রয়োগের বাইরে থেকে যাওয়ায় এই সম্ভাবনাগুলোর কোনোটিই তেমন পরিণতি পায়নি। এ ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম হচ্ছে ভারতের ঘটনাটি। অভিষেকের এ গবেষণায় তার বিশ্ববিদ্যালয় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণ সহযোগিতা দিয়েছে। এর বাণিজ্যিক উৎপাদনকে সম্ভব করে তুলতে দিয়েছে নানা পরামর্শ। অভিষেকও গবেষণা করে থেমে থাকেননি। নিজের স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে বন্ধুদের নিয়ে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। আর এই উদ্যোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..