জলবায়ু পরিবর্তন

পৃথিবী বাঁচাতে দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

নেলসন : না কোনো যুদ্ধ, না অন্য কিছু; বরং এসব সংকটের অন্যতম উৎসভূমি হিসেবে এরই মধ্যে স্বীকৃত জলবায়ু পরিবর্তনই এ মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা। বর্তমান গতিতে যদি এ জলবায়ু পরিবর্তন চলতে থাকে, তাহলে শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। আর এই মহাসংকটের ক্ষণটি ক্রমেই এগিয়ে আসছে। বাড়ছে ঝুঁকি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিলুপ্তির বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না বলেই মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের পথ ধরে পৃথিবী ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে বন্দুকের নল লক্ষ্য করে। এক সূক্ষ্ম সুতার ওপর এখন দাঁড়িয়ে সে। সময় যত যাচ্ছে, সে সুতার শক্তি তত কমছে। কমতে কমতে একসময় এই সুতাটি ছিঁড়ে যাবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিশ্বখ্যাত নেচার জার্নালে প্রকাশিত এক মন্তব্য প্রতিবেদনে এক দল বিজ্ঞানী গোটা বিশ্বকে এই বলে সতর্ক করেছেন যে, সভ্যতার যে গৌরব মানুষ করে, তাকে অস্তিত্বের সংকট থেকে রক্ষা করতে হলে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র থেকে শুরু করে গোটা প্রকৃতিতে এমন কিছু পরিবর্তন হয়ে চলেছে, যা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিকে পুরো গ্রহের জন্যই জরুরি অবস্থা হিসেবে বলা যায়। কেউ ঘোষণা করুক, আর নাই করুক, পৃথিবী এখন এক জরুরি অবস্থার মধ্য দিয়ে চলছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাজন, সুন্দরবনের মতো বনাঞ্চল ধ্বংস, প্রতিনিয়ত বরফ গলার গতি বৃদ্ধি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে পুরো প্রকৃতিতে ওলট-পালট ঘটে চলেছে। এভাবে পুরো কাঠামোটাই ভেঙে পড়ছে। আর এই ভেঙে পড়া চলতে থাকলে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রাণের বাস-অযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। ওই নিবন্ধের লেখকেরা বলছেন, এই দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষের হাতে একেবারেই সময় নেই। দুর্যোগ প্রতিরোধের সময় শূন্যের কোটায় নেমে আসছে বলা যায়। অথচ বিশ্বনেতারা কার্বন নিঃসরণের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনার জন্য ৩০ বছরের সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন। এটি হাস্যকর। মন্তব্য প্রতিবেদনটির মূল লেখক হিসেবে রয়েছেন সাউথওয়েস্ট ইংল্যান্ডের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক টিমোথি লেনটন। এই প্রতিবেদনে বিজ্ঞানীরা নয়টি ক্ষেত্রকে চিহ্নিত করেছেন, যেগুলো ইতোমধ্যেই ধসে পড়ার পর্যায়ে রয়েছে। এই নয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে আমাজন বনাঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকা উজাড়, আর্কটিক অঞ্চলে বরফের পরিমাণ হ্রাস, বিপুল পরিমাণে কোরাল ধ্বংস, গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে যাওয়া, সমুদ্রের ¯্রােতে আসা পরিবর্তন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই নয়টি ক্ষেত্রই একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর একটিতে হওয়া যেকোনো পরিবর্তন, অন্যগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে কোথাও নেতিবাচক কোনো পরিবর্তন হলে, তা অন্যগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর কোনো একটির বিষয়ে আলাদা করে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর এরই মধ্যে এ ক্ষেত্রগুলোয় এমন কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে, যা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেয়াটা প্রায় অসম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বের গড় মানের চেয়ে আর্কটিক অঞ্চলে উষ্ণায়ন দ্বিগুণ হারে হচ্ছে। ফলে আর্কটিকের বরফ গলে যাচ্ছে অনেক দ্রুত গতিতে। এই বরফ গলার কারণে আবার উষ্ণায়ন বাড়ছে। কারণ, বরফের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সূর্যালোক প্রতিফলনের হার কমে যাচ্ছে। আর প্রতিফলন কমার অর্থ হচ্ছে পৃথিবী আগের চেয়ে বেশি পরিমাণে তাপ শোষণ করবে। আর এই আঞ্চলিক উষ্ণায়নের কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের স্থায়ী বরফ গলে যাচ্ছে। এতে উন্মুক্ত হচ্ছে মাটি। আর মাটি থেকে বেরিয়ে আসছে কার্বন ডাই অক্সাইড ও মিথেনের মতো গ্যাস। এতে উষ্ণায়ন আরও বাড়ছে। প্রকৃতিতে থাকা কীট-পতঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের বনভূমিতে দাবানলের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবে কার্বন শোষক অঞ্চল ক্রমে হয়ে উঠছে কার্বন নিঃসরণের উৎসভূমিতে। শুরুতে জলবায়ুকে যতটা সংবেদনশীল মনে হয়েছিল, বিভিন্ন উপাত্ত বলছে, তা আদতে তার চেয়ে অনেক বেশি সংবেনশীল। গবেষকেরা গত বছর ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখেন যে, পশ্চিম অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে হওয়া বরফের মজুতে যে পরিবর্তন হয়েছে, তা অন্য আটটি ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসছে। ফলে এর যেকোনো একটি ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ার অর্থ হচ্ছে, অন্য ব্যবস্থাগুলোর জন্যও হুমকি তৈরি হওয়া। ‘ধ্বংসের দ্বারে জলবায়ু’ বা ‘ক্লাইমেট টিপিং পয়েন্ট’ ধারণাটি অবশ্য নতুন নয়। জাতিসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) ২০ বছর আগেই এ ধারণার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বিশ্বকে। সে সময় অবশ্য জাতিসংঘ বলেছিল, এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি কেবল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলেই হতে পারে। কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, আইপিসিসির ২০১৮ ও ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন বলছে, এমন পরিস্থিতি এমনকি ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলেই সৃষ্টি হতে পারে। উল্লেখ্য, শিল্পযুগের আগের অবস্থা থেকে বর্তমানে তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। এই তাপমাত্রা সময়ের সঙ্গে বাড়ছেই। এ সম্পর্কিত ২০১৮ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে একটি ‘ডোমি ইফেক্ট’-এর সম্মুখীন হতে পারে পৃথিবী। অর্থাৎ একটি শিকল বিক্রিয়ার (চেইন রিঅ্যাকশন) মতো, একে একে সবকিছু ভেঙে পড়তে পারে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো ফ্যাক্টরে হওয়া পরিবর্তন অন্য ফ্যাক্টরগুলোকে যেভাবে পরিবর্তিত করবে, তা এমন পরিস্থিতির জন্ম দেবে, যখন একটির বিলোপ অন্যটিকেও এগিয়ে নেবে। ২০১৫ সালে হওয়া প্যারিস চুক্তিতে বিশ্বের দেশগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখার বিষয়ে একমত হয়। এটিকে অনেক বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে এ প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে কার্বন নিঃসরণের হার প্রত্যাশামাফিক কমিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এদিকে জাতিসংঘের পরিবশেবিষয়ক প্রোগ্রাম ইউনেপ বলছে, বর্তমান হারে উষ্ণায়ন হতে থাকলে ২১০০ সালের মধ্যে তা ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। বিজ্ঞানীরা যেখানে ২ ডিগ্রিকেই ভয়াবহ বলছেন, সেখানে ৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে, তা কেমন পরিস্থিতির জন্ম দেবে, তা নিয়ে কথা বলাও অবান্তর।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..