প্রসঙ্গ: প্রাথমিক শিক্ষা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
দেবাশীষ দাশ দেবু : যদি বলি পরিবারই প্রাথমিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয় তাহলে হয়তো ভুল বলা হবে না। তবে যে পরিবারে মা-বাবা শিক্ষিত নয় সে পরিবারেটিকে কীভাবে বলবো প্রাথমকি শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়? নিশ্চয় নয়। সম্পতি একটি দৈনিক পত্রিকায় বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের একজন শিশুর ১১ বছরের স্কুলজীবনে সাড়ে ৪ বছর নষ্ট হয়ে যায়। শিশুরা ১১ বছরে শেখে মাত্র সাড়ে ৬ বছরের পাঠ্যক্রমের সমান। আর পঞ্চম শ্রেণির প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর তিনজনই নিজেদের শ্রেণির উপযোগী সাধারণ মানের অঙ্ক কষতে পারে না। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৩৫ শতাংশই ভালভাবে বাংলা পড়তে পারে না। তাদের ৪৩ শতাংশ বাংলায় কোনও প্রশ্নের পুরো উত্তর দিতে পারে না। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে বড় হয়ে এদের কাছ থেকে কীভাবে ভালো কিছু পাওয়ার আশা করা যেতে পারে? প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সেখানে আরও বলা হয়েছে, এদেশের প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পার হয়ে আসা শিশুদের প্রায় অর্ধেকই প্রাথমিকের মান অনুযায়ী পড়তে, শিখতে ও অঙ্ক কষতে জানে না। আর এই অসম্পূর্ণ জ্ঞান নিয়ে তারা মাধ্যমিক স্তরে চলে যাচ্ছে। আবার তাদের কেউবা ঝরে পড়ছে, কেউ কোনো রকমে উতরে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানে কি গলদ আছে? না কি বিদ্যালয়ের পরিবেশ পাঠদানের উপযুক্ত নয়? নাকি বেশি করে শিশুদের কাঁধে বইয়ের বোঝা চাপানো হচ্ছে? নাকি শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে? নাকি পাঠ্য বিষয়গুলোর উপস্থাপনে জটিলতা রয়েছে? প্রথমেই এগুলো ভেবে দেখা প্রয়োজন এবং সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে একটি সমাধান আনা প্রয়োজন। সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে শতভাগ অবৈতনিক করে দিয়েছেন। বছরের প্রথমেই শিশুদের হাতে বিনামূল্যে বই তুলে দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তবে প্রাথমিক শিক্ষার গলদটি কোথায়? উচ্চ শিক্ষালাভ করা যেসব শিক্ষক-শিক্ষিকাকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে তারা কি তাহলে পাঠদানে ব্যর্থ হচ্ছেন? না কি উচ্চ শিক্ষা লাভ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় নিজেদের খাপ-খাওয়াতে পারছেন না? প্রায়শই দেখা যাচ্ছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি না করিয়ে নামি-দামি কিন্ডার গার্ডেনে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। এখানেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থা কিন্ডার গার্ডেনের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কি দুর্বল? শিক্ষার গুণগত মান তাহলে কী হওয়া উচিত? এখন প্রশ্ন- আমাদের শিক্ষা মানুষ হওয়ার জন্য? নাকি ভালো নম্বর পেয়ে ভালো চাকুরী পাওয়ার জন্য? কথা হচ্ছে- প্রাথমকি শিক্ষা নিয়ে যতই বির্তক থাক প্রথমে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার মান নিশ্চিত করা আজ অতীব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমার মনে হয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় পার হওয়া একটি ছেলেকে পড়তে, লিখতে ও সাধারণ অঙ্ক কষতে পারা একান্ত দরকার। কেননা প্রাথামিক শিক্ষার মান অনুযায়ী একজন শিক্ষার্থীকে এটুকু অন্তত জানা উচিত। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে শিক্ষার মান যাচাই না করে এক স্তর থেকে উচ্চস্তরে একজন শিক্ষার্থীকে তুলে দেয়া হচ্ছে। তা হলে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা গুলো কিভাবে চিহ্নত হবে? ভবিষ্যৎতে তাদের দ্বারা আমাদের দেশের কতটুকু উন্নতি করা সম্ভব হবে? তা একবার আমাদের সবার ভেবে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রাথমিক পর্যায় থেকেই নজর দাড়ি দরকার। এ শিক্ষা ব্যবস্থা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় দূর্বলতা হলো চাকুরির বাজারের সাথে শিক্ষা ব্যবস্থার অমিল। তাই পরবর্তীতে চাহিদা অনুযায়ী দক্ষলোক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এখানে বলা প্রয়োজন পুরো শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন আমাদের করতে হবে। তাছাড়া মৌলিক শিক্ষার দিকে আমাদের লক্ষ্য দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যদি প্রাথমিক স্তর থেকে যোগ-বিয়োগ না শিখে আসে তা হলে বড় ক্লাসে উঠেই তারা তখন কিছুই বুঝবে না। আমাদের দেশে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে যেটা প্রয়োজন তা হলো আনন্দের সাথে শিক্ষা লাভ করা। একজন প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী তখনই প্রকৃত শিক্ষা লাভ করবে যখন তারা শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছ থেকে সব সময় প্রতিটি ক্ষেত্রে ভাল উপস্থাপনা পাবে। পাঠ্যবইয়ে যা তুলে ধরা হয়েছে তা হুবহু পাঠ করে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ে শুনালেই তা প্রকৃত পাঠদান হতে পারে না। এর সাথে সম্পর্কিত অনেক বিষয় উপস্থাপন করেই তাদের পাঠদান করা প্রয়োজন। তাই আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে প্রায়শই এ দৃশ্য প্রতিভাত হয় প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ঝড়ে যায়। অর্থনৈতিক সংকটের সাথে এটাও একটি বড় কারণ। অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে লক্ষ্য করা যায় যে, প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন সম্পন্ন করা হয় না। কিংবা যে ভাবে নজর দাড়িতে রাখা প্রয়োজন তা করা হয় না। ফলে বাড়িতে পড়া দিয়ে দেওয়া কিংবা পড়া আদায় করার মধ্যে বিরাট ব্যবধান থেকে যায়। প্রতিনিয়ত একইভাবে স্কুলে এসে ক্লাসে ঢুকে শিক্ষকদের শিক্ষার্থী পড়ানোর মানসিকতা কিছুটা হলেও পরিবর্তন প্রয়োজন। কারণ যে বিষয়টি পাঠদান করানো হবে সে বিষয়ে পাঠদান করার আগে মানসিকভাবে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করে নেয়া প্রয়োজন। (সেটা গল্প বলেই হোক কিংবা কবিতা আবৃত্তি, গান গেয়ে বা কৌতুক করেই হোক)। তবেই তারা আনন্দের সাথে পাঠদান গ্রহণ করবে ভালভাবে। এখন প্রশ্ন হলো শিক্ষকদের এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। তবেই শিক্ষার্থীদের আনন্দের সাথে পাঠদান সম্পন্ন করা সম্ভব। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে যদিও সপ্তাহের তিনদিন একটি ঘন্টা করে সংগীত, চরুকলা, কবিতা আবৃত্তিসহ শিক্ষার্থীদের বিনোদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে তবুও এসব বিষয়ে প্রকৃত শিক্ষাকদের অভাবে যথাযথভাবে শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেয়া সম্ভব হয়ে উঠছে না। এদিক থেকেও শিক্ষার্থীরা ঐটুকু আনন্দ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য ল্যাপটপ সরবরাহ করা হলেও তা শিক্ষার্থীদের নিয়ে ল্যাপটপের কার্যক্রম শেখানো অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়ে উঠে না। কারণ প্রায়শই ল্যাপটপ পরিচালনার জন্য দক্ষ শিক্ষকদের অভাব লক্ষ্য করা যায়। তাই আমাদের এই সোনার বাংলায় সোনার মানুষ তৈরি করতে হলে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবশ্যই যুগপোযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। তবেই আমরা বর্তমান প্রজন্মের কাছ থেকে ভাল কিছু পাওয়ার আশা করতে পারি-নচেৎ নয়। লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..