শহীদ জগৎজ্যোতি দাস

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার : মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ‘দাস পার্টি’ ছিলো পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে এক আতঙ্কের নাম। জগৎজ্যোতি ছিলেন সেই ‘দাস পার্টি’র নেতা। মুক্তিযুদ্ধে ভাটি এলাকায় মানুষের মুখে মুখে ছিলো ‘দাস পার্টি’র বীরত্বের কাহিনি। অসংখ্য লড়াইয়ে শত্রুকে ধরাশায়ী করেছেন জ্যোতি। এমনই এক সম্মুখ লড়াইয়ে জগৎজ্যোতি আত্মহুতি দেন। শত্রুরা তার প্রাণহীন দেহ নিয়ে মেতে উঠে উন্মত্ত খেলায়। খুঁটির সাথে পেরেক ঢুকিয়ে তাকে টাঙিয়ে রাখে দু’দিন। মুক্তিযুদ্ধে জ্যোতির বীরত্বের জন্য পরাধীন দেশের অস্থায়ী সরকার সর্বোচ্চ খেতাব দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলো। জগৎজ্যোতি তার কথা রেখেছেন। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা এতে দিয়েছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশের স্থায়ী সরকার কথা রাখেনি। হবিগঞ্জ জেলার আজমিরিগঞ্জ থানার জলসুখা গ্রামে জগৎজ্যোতি ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। পিতা-জিতেন্দ্র কুমার দাস, মাতা-হরিমতি দাস। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আদরের জ্যোতিই সবার ছোট। সবাই আদর করে ডাকতো শ্যাম বলে। রাজমিস্ত্রি বাবার অভাবের সংসার, তবু জ্যোতি প্রাইমারি পেরিয়ে স্থানীয় বিরাট গ্রামে ‘আজমিরিগঞ্জ বীরচরণ হাইস্কুল’ থেকে ১৯৬৮ সনে দ্বিতীয় বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। ন¤্র-ভদ্র আচরণের জন্য শিক্ষকসহ গ্রামের সবাই তাকে স্নেহ করতেন। অভাবের সংসার আর তো সামর্থ্য নেই, বাপ-ভাইয়ের ইচ্ছা চাকুরিতে ঢুকে সংসারের হাল ধরতে। কিন্তু জগৎজ্যোতির মনে অন্য আগুন জ¦লছে তাই ভাবলেন আরও লেখাপড়া করতে হবে।নওগাঁ কলেজে ভর্তি হয়ে জ্যোতি এইচএসসি পাস করেন। বিএ পড়ার অদম্য ইচ্ছা জ্যোতির তবু হারানদার মন রক্ষার্থে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়ে হিন্দি ও ইংবেজি ভাষাটা ভালো করে রপ্ত করেন যা পরবর্তী জীবনে খ্যাতি এনে দিয়েছিলো। প্রশিক্ষণ শেষ, তবে চাকুরিতে যোগদানের দু’দিন আগে জ্যোতি সোজা আজমিরিগঞ্জ চলে এসে হারানদাকে চিঠিতে জানান আমি বিএ পাস করতে চাই এখনই চাকুরিতে আবদ্ধ হতে চাই না। এভাবেই জ্যোতির রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া এবং পরবর্তী জীবনের সকল কর্মকাণ্ড চিন্তা-চেতনার ধারাবাহিকতা। কিন্তু নিজের আর্থিক অবস্থার জন্য অগত্যা স্থানীয় ‘কৃষ্ণগোবিন্দ পাবলিক হাইস্কুলে’ ৭৫ টাকা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। তাও মূল কাজে রেহাই নেই, একবার স্থানীয় জমিদারের দখলে খাস জমি উদ্ধারে তাঁর গ্রুপ তৎপরতা চালান। জমিদারের প্রভাবশালী লোকজন একদিন একা পেয়ে তাকে আক্রমণ করলে খালি হাতে একাই সশস্ত্র আক্রমণ প্রতিহত করেন। আজমিরি এলাকায় বিষয়টি আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং জ্যোতি অপ্রতিরোধ্য ‘ছাত্রনেতা’য় পরিণত হন। আসলে জীবনযুদ্ধই জ্যোতিকে জীবনসংগ্রামী করে তুলেছে, যা পরবর্তী জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু বিএ পাস করা, উচ্চশিক্ষার কী হবে? তাই কিছু টাকা জমিয়ে প্রথমে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে ও পরে সুনামগঞ্জ কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। জাতির সামনে দাঁড়িয়ে গেলো মুক্তিসংগ্রাম। কী আর করা- মক্তিযুদ্ধকে জীবনযুদ্ধ বলে ঝাঁপিয়ে পড়াই নিজের কর্তব্য বলে ধরে নিলেন। জ্যোতি ‘৭১’র উন্মাতাল দিনে সুনামগঞ্জে ছাত্র ইউনিয়নের একজন প্রথম সারির কর্মী হিসেবে জগৎজ্যোতি শহরের সকল আন্দোলন সংগ্রামের কর্মসূচিতে অগ্রভাগে থাকেন। সকলের আগে তাঁর কণ্ঠেই মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ ধ্বনিত হয়। তাঁর দ্রোহী মন উপযুক্ত সময়ে নতুন একটি দেশের স্বপ্নে বিভোর হযে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধ পর্বে সুনামগঞ্জের সকল মিছিল মিটিং র্যালি শোভাযাত্রায় তাঁর সক্রিয় প্রচেষ্টা ও উপস্থিতি ছিলো সবার কাছে আকর্ষণীয়, প্রশংসনীয়। এবার ‘দেশের ডাক’ মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবে। চলে যান গ্রামের বাড়ি আজমিরিগঞ্জের জলসুখায়। মা’কে প্রণাম করে, ‘‘মা’ আবার তোমাকে দেখতে আসবো স্বাধীন দেশে’ বলে বিদায় নেন। বাবা জিতেন দাস, বড়ভাই জীবনানন্দ দাস হতবাকের মত পাশে দাঁড়িয়ে সায় জানান। সহজ সরল অবুঝ মা বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না-জড়িত কণ্ঠে বিদায় দেন, আশীর্বাদ করে বলেন তোমাদের মঙ্গল হোক। এটাই মা’র সঙ্গে নাড়িছেড়া ধন জগৎজ্যোতির শেষ দেখা শেষ কথা। জগৎজ্যোতির মুক্তিযুদ্ধে যোগদান কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়। শৈশব-কৈশোরের দীক্ষা ও পরবর্তী বৃহত্তর জীবনের আলোকরশ্মি ছিলো তার চেতনায় গ্রথিত মুক্তির প্রসব বেদনা। সুনামগঞ্জে জগৎজ্যোতি ছিলো ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় কর্মী ও তখনকার সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এছাড়াও হাওর-নদীবেষ্টিত ভাটি অঞ্চল আজমিরিগঞ্জে জগৎজ্যোতির গ্রাম জলসুখা ছিলো ব্রিটিশ আমল থেকেই একটি নামজাদা ও বিখ্যাত জনপদ। তাঁর গ্রামে দু’জন ভারত বিখ্যাত লোক খনিজসম্পদ গবেষণাবিদ স্বদেশপ্রেমী রমাকান্ত রায় ও শিক্ষবিদ সতীশ চন্দ্র রায়ের জন্ম। রমাকান্ত রায় এই হাওর এলাকার ভূ-গর্ভে অমূল্য খনিজসম্পদ আছে মনে করতেন এবং স্ব-উদ্যোগেই অনেক গবেষণা করেছেন। এ অঞ্চলে সতীশ রায়ই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করা প্রথম ছাত্র। পরে মেধার স্বীকৃতি স¦রূপ ১৯০৬ সনে বিখ্যাত ‘বলাইচাঁদ’ পুরস্কার পান এবং ১৯০৯ সনে ‘সুরমা উপত্যকা রাষ্ট্রীয় সমিতি’র এক সভায় প্রধান বক্তা হয়ে ঋষি অরবিন্দ আসেন এই গ্রামে। জগৎজ্যোতি আজমিরিগঞ্জের বিরাট “বীরচন্দ্র হাইস্কুল” এ পড়া অবস্থায়ই ‘শরীফ কমিশন’ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। এছাড়াও অনেক ছাত্র আন্দোলন সেখানে গড়ে তুলেছেন ফলে এলাকায় অনেক সুখ্যাতি ছড়ায়। তার পেছনে প্রেরণায় ছিলেন গ্রামেরই দুই নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব। তাই একথা তো বলাই যায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া, নিজেকে আত্মোৎসর্গ করা জগৎজ্যোতির ভিতরের সুপ্ত অগ্নিস্ফূলিঙ্গ তা তার স্থানীক ও কালিক উত্তরাধিকারেরই বহিঃপ্রকাশ। উদাহরণস্বরূপ যদি বলা যায় রবীন্দ্রনাথ যেমন মুকুন্দরাম-ভারতচন্দ্র-ঈশ্বরগুপ্ত-বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-মধুসূদন-বিহারীলালের উত্তরাধিকারী তেমনই তিল তিল করে এই ভাটির জলাভূমির আবেশই হাসন-করিম, জগৎজ্যোতিদের জন্ম দিয়েছে। কেউ জনমনের চাপাকান্না তুলে ধরেছেন, কেউ জীবনের বিনিময়ে স্বাধীন মাতৃভূমি দিয়ে গেছেন, সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে তাঁকে যেতেই হতো শহিদ হতেই হতো তা বিধিলিপি নয়, অবশ্যম্ভাবী। জগৎজ্যোতি জলময় নদী-বিল-হাওরে বেড়ে ওঠা তরুণ, মক্তিযুদ্ধের শত্রু নিধনে ট্রেনিং এর বাইরে নিজস্ব ও পূর্ব-অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সবাইকে অবাক করে শত্রু পক্ষকে ঘায়েল করেছেন। ভেরামোহনার শত্রুবাহিনীর রসদবাহী কার্গো ধ্বংসে ডুব দিয়ে ‘লিম্পপেট’ না লাগিয়ে নদীর এক পাড়ে পানির নিচে একটি খুঁটি ও ওপর পাড়ে অন্য খুঁটিতে বড় ধরনের শক্ত একটি রশিতে পাঁচ পাঁচটি ‘এন্টি ট্যাঙ্ক মাইন’ ঝুলিয়ে মাইন ডেটোনেটরের স্থলে ‘পিইকে-১’ ভর্তি করে কার্ডেক্স সিরিজ কানেকশন দিতে সহকর্মীকে নির্দেশ দেন। কার্ডেক্সের শেষপ্রান্তে ডেটোনেটর ও তার মুখে সেফটি ফিউজের সংযোগ দিয়ে দেন। ভার্জ রশিতে ধাক্কা লাগা মাত্রই মাইন সিরিজের ফিউজে সেফটি ম্যাচ দিয়ে অগুন ধরিয়ে দেন। মুহূর্তেই বিস্ফোরণে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় গানবোট। ভাটির হাওরের পূর্ব-অভিজ্ঞতা ছাড়া অন্য এলাকায় অভ্যস্ত কেউ এমনটা চিন্তাই করতে পারতো না। জগৎজ্যোতি (শাল্লা-২, দিরাই-৪, তাহিরপুর-২, বানিয়াচং-৪, জামালগঞ্জ, খালিয়জুরি, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ সদরসহ) ষোলটি সফল অভিযান করেছেন। যার অনেকগুলি অভিযান সেক্টর কামান্ডার-মিত্রবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত মেজরেরও কল্পনার অতীত। সতেরো’তে শেষ অভিযানটি তাঁর নিজ এলাকায় আজমিরিগঞ্জের বদলপুর ইউনিয়নের খৈয়াগুপি বিলে নিজ জন্মমাটিতেই আত্মাহুতি দিতে হয়। ‘দাসবাহিনী’র কাছে খবর ছিলো দিরাই-মার্কলী নদীপথে বার্জে পাকসেনাদের রসদ যাবে। আগে থেকেই ছক করে যথাসময়ে বার্জ আক্রমণ করে, অনেক মালামলের সাথে ১৩/১৪ বছরের একটি কিশোরকে উদ্ধার করে ‘জ্যোতি’ তাকে সাথে করে নেন এবং গচিয়ার কাছে বার্জটি ডুবিয়ে দেন। কিন্তু পরবর্তী শেষ অপারেশনটিতে নিজভূমে একটু ভুলের জন্য আজমিরিগঞ্জের তথা মুক্তিযুদ্ধের গর্ব জগৎজ্যোতির প্রাণ-প্রদীপ নিভে গেলো। ১৫ নভেম্বর ‘৭১ জগৎজ্যোতির নেতৃত্বে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানার অন্তর্গত টেকেরঘাট সাব-সেক্টর থেকে নৌকাযোগে একদল মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্রশস্ত্র রসদ নিয়ে বানিয়াচং-আজমিরির দিকে রওয়ান হয়ে ১৬ নভেম্বর সকালে বদলপুর পৌঁছান। লক্ষ্যস্থলে পৌঁছেই জ্যোতি দেখতে পান তিন-চারজন রাজাকার ব্যবসায়ীদের নৌকা থেকে চাঁদা তুলছে। ক্ষুব্ধ হয়ে জ্যোতি এদের ধরে আনার নির্দেশ দেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেই ওরা পিছু হটতে শুরু করে। তখন নিজেই তাঁর দলবল নিয়ে রাজাকারদের তাড়া করে অনেক ভিতরে চলে যান। অপরদিকে পাকসেনাদের একটি বিশাল বহর অস্ত্রশস্ত্র গোলাবরুদ নিয়ে ঘাপটি মেরে একটি নিরাপদ স্থানে অপেক্ষা করছিলো। আসলে চাঁদা তোলা পিছু হটা ছিলো তাদের একটা কৌশল। এভাবে মুক্তিযোদ্ধা দলটিকে অনেক ভিতরে ব্যুহের মধ্যে নিয়ে যায় রাজাকার-পাকসেনারা। কিন্তু পেছানোর উপায় নেই, শুরু হয় সামান্য গোলা-বারুদ নিয়ে দাস-পার্টির সঙ্গে প্রশিক্ষিত পাক-বাহিনীর বিশাল বহরের এক অসম যুদ্ধ। গোলা-বারুদ কমে যাওয়ায় বেকায়দায় পড়ে যায় দলটি। পাক-বাহিনীর আক্রমণে এক সময়ে টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় দাস-পার্টির সদস্যরা। এক পর্যায়ে তার সদস্যদের ফিরে যাবার নির্দেশ দেন, কিন্তু তিনজন সহযোদ্ধা তাকে অনুসরণ করে যুদ্ধ চালিয়ে যান। একটি এলএমজি, একটি এসএমজি দিয়ে কী আর করা যায়, তবু ১৩ জন সহযোদ্ধা নিরাপদে পৌঁঁছা পর্যন্ত তার বেঁচে থাকতে হবে চিন্তা করেও শেষ রক্ষা হলো না। সাবাইকে পালাতে নির্দেশ দিলেও প্রাণপ্রিয় ইলিয়াস চৌধুরী শেষ পর্যন্ত সঙ্গ ছাড়েননি। ইলিযাসের পাজরে গুলি লাগলে জ্যোতি নিজের মাথার গামছা দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চেপে বাঁধেন, বললেন- ‘পারলে আমাকে ম্যাগজিন ভরে দাও’। এক পর্যায়ে আশপাশের অবস্থান দেখতে মাথা তুলতেই একটি গুলি ‘জগৎজ্যোতি’র চোখ ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ‘আমি যাইগা’ বলে চিৎকার দিয়েই নীরব হয়ে যান। এভাবেই ‘ভাটির সিংহ-পুরুষ, হাওরের অমৃত-পুত্রে, মা’য়ের নাড়িছেড়া ধন’ জ্যোতি–শ্যাম’র সলিল সমাধি হয়। ইলিয়াস জ্যোতির লাশটা কাঁদায় ডুবিয়ে লুকিয়ে অনেক কষ্টে নিরাপদে চলে যেতে চেষ্টা করেন। সব শেষ হয়ে গেলো। স্বাধীন দেশে মা’কে আর দেখা হলো না। পরদিন নাকি লাশটা কাঁদা থেকে তুলে নৌকার গলইয়ে করে ঘাটে ঘাটে রাজাকারেরা প্রদর্শন করিয়েছে, পরে আজমিরিগঞ্জ বাজারে পাকিস্তানের বিপক্ষে গেলে কী দশা হয় লোকশিক্ষা দিয়েছে, মানুষকে বুঝিয়েছে। কথায় বলে না–‘হাতিরও পিছলে পা, সুজনেরও ডুবে না (নাও)। দয়া দেখাতে গিয়ে সেদিনের সেই কিশোরটিই নাকি ‘জ্যোতি’র পরবর্তী অভিযান বদলপুরের জন্য কাল হয়েছিলো। এই ছেলের বাবা পাকিদের বার্তাবাহক, বেশদিন পর ছেলেটিকে তার বাবা ফিরিয়ে নেয় এবং ছেলেটির কাছ থেকে পরের অভিযানের সমস্ত পরিকল্পনা আন্দাজ করে নেয়। নয়তো জগৎজ্যোতির ছেলেবেলার যে দুরন্তপনার কথা শোনা যায় তাতে তাঁর এলাকায় নদী-হাওরের পথ ভুল করে রাজাকার-পাক-বাহিনীর ব্যুহে ঢুকে দিশেহারা হবার কথা নয়। যে জগৎজ্যোতির বীরত্বপূর্ণ মৃত্যুতে সারাদেশের মুক্তিকামী মানুষ স্তম্ভিত স্তব্ধ ‘৭১’র অস্থায়ী মুজিবনগর সরকারের পক্ষে ‘স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র’, ‘আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র’ ১৬ নভেম্বর রাতেই বিশেষ বুলেটিন প্রচার করে বলেছে- তাঁকে “বীরশ্রেষ্ঠ জগৎজ্যোতি দাস” নামে আখ্যায়িত করে মরণোত্তর সর্বোচ্চ খেতাবে ভূষিত করা হবে। দেশের বিপদগ্রস্ত মুক্তিকামী মানুষ যে খরবটি শুনে চোখের জল মুছেছে সেই জগৎজ্যোতিকে ১৯৭৩ সালে খেতাব বণ্টনে আজ তিন নম্বর খেতাবে ‘বীর বিক্রম’ লিখা হচ্ছে। স্থানীয়, জাতীয় বিভিন্ন তালিকায় তাঁর নাম তিন নম্বরে কলঙ্ক ছড়াচ্ছে। কিন্তু কেন? নানান কথা, নানা প্রশ্ন, নানা বিতর্ক। মুখ খোলা ভার কেননা আগে ছিলো স্বৈরতন্ত্র, পরে পাকিস্তানি গণতন্ত্র, এখন তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্নয়ন চলছে, অন্য কথা বললেই অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কমিউনিস্ট কর্মী ও লেখক অঞ্জলী লাহিড়ীর শিলঙের বাড়িতে জগৎজ্যোতিসহ তাঁর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল আশ্রয় নিয়েছিলো। সিলেটের মেয়ে লাহিড়ী খুব সমাদর করে তাঁর জ¦রের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও অপারেশনে যাওয়ার কথা বলে চলে আসে। পরে তিনি তাঁকে নিয়ে ২০০৩ সালে একটি উপন্যাস লিখেন। হবিগঞ্জের নাট্যকর্মী রুমা মোদক তাঁকে নিয়ে একটি মঞ্চনাটক লিখেন তা ঢাকা ও সিলেট বহুবার প্রদর্শিত হয়। সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের উপর পাঁচ/ছ’টি বই লিখা হয়েছে। শুধু জগৎজ্যোতি নামে ‘মুক্তিযুদ্ধে দাসপার্টি’–রনেন্দ্র কুমার তালুকদার, ‘অনন্য জগৎজ্যোতি’-অপূর্ব শর্মা, ‘দাসপার্টির খোঁজে’- হাসান মুর্শেদসহ তিনটি বই লিখা হয়। আজমিরিগঞ্জে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সহযোদ্ধাদের নির্মিত ‘শহীদ জগৎজ্যোতি (বীর উত্তম)’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ এখনও এভাবেই আছে। সুনামগঞ্জের সাবেক ‘জেলা পাবলিক লাইব্রেরি’ ‘শহীদ জগৎজ্যোতি পাঠাগার’ নামে নামকরণ করা হয়। তাও গত এক বছর আগে নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি’ করা হয়েছে। শহীদ শব্দটা মুছে দেয়া নিয়েও অনেক বিতর্কের মুখে টিকে আছে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র হিসেবে– শহীদ তালেব, শহীদ গিয়াস, শহীদ জগৎজ্যোতি, শহীদ আলী আজগর স্মরণে একটি মুক্তিচত্বর স্থাপন করা হয়েছে। সেখানেও জগৎজ্যোতির নাম তিন নম্বর স্থানে অথচ এই কলেজেরই শিক্ষক নায়েম প্রশিক্ষণে (১৯৯৯-২০০০ সনের দিকে) দেখেছেন বীরশ্রেষ্ঠদের তালিকায় জগৎজ্যোতির নাম আছে। এখন আর সে তালিকা নেই খুঁজেও পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যথাতুর ক্ষুদ্র মুখে কী আর বলবো— ‘৭৩ সন পর্যন্ত নিজের হাতে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বুঝে নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর কোন বন্ধুদের খুশি করতে গিয়ে নিজেই সপরিবারে নিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন বলা ভার। তবু পরম শ্রদ্ধা, লাল সালাম জানিয়ে জগৎজ্যোতি দাসের আত্মত্যাগকে শিরে স্থান দিয়ে আগামী প্রজন্মকে জানিয়ে যাব আমার হাওরেও একজন ‘স্পার্টাকাসতুল্য মহানায়ক’ জন্ম নিয়েছিলেন, তোমরা তাঁকে ভুলো না। (জগৎজ্যোতি দাস : ২৬ এপ্রিল ১৯৪৯-১৬ নভেম্বর ১৯৭১ ইং) লেখক : সভাপতি, সিপিবি, সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..