গ্রাম-বাংলার পথ থেকে পথে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আমহদ সিরাজ : ২২ নভেম্বর সকাল, এবার শীতের দাপট শুরু হয়ে গেছে একটু আগে থেকেই। বহু বর্ণিল বৈচিত্র্যময় কমলগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণের সীমান্তবর্তী আদমপুর ও ইসলামপুরের দিকে যাত্রা করেছি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। অটোরিকশাচালিত সিএনজি চড়ে উপজেলার চৌমোহনা থেকে রানী বাজার হয়ে ছুটছি। মণিপুরী অধ্যুষিত গ্রাম রানী বাজার অতিক্রম করার আগেই যে কেউ ডান কিংবা বাম দিকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির (সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) বাড়ির দিকে চোখ মেলে তাকাতো। তিনি বাড়িতে থাকুন বা নাই থাকুন বাড়িটি গমগম করতো সবসময়। এই উপজেলার একজন এস কে সিনহা একসময় বিশাল ক্ষমতার অধিকারী, এ নিয়ে উপজেলার জন থেকে জনে কথা উঠতো এবং নৃ-গোষ্ঠীর লোকজনেরা গর্বে উচ্চকিত থাকতো। রাণীর বাজার পার হয়েই ঘোড়ামারা গ্রামের মধ্যে দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে–দুপাশে ঘোড়ামারা মাঠে আমন ধানের লালচে আভা গালিচার মতো হয়ে আছে। ফাঁকে ফাঁকে নারী পুরুষেরা ধানেশ্রী রাগিনীতে যেন সবজি ক্ষেতের পরিচর্যার একটা আমোদে অবস্থানে–এই সোনালী মাঠ ভরা ধানে কৃষকের বুক ফুলে উঠলেও হায়নার মতো ওঁৎ পেতে থাকা এক শ্রেণির দূরাচারী কারবারি রাষ্ট্রের নির্বিকার অবস্থার সুযোগ নিয়ে পানির মূল্যে কৃষকের ধানের মালিক হয়ে উঠবে–এই আতঙ্কে কৃষকের ভেতর আগুন হয়ে আছে। কৃষক আলম একজন ভালো চাষি হিসেবে পরিচয় বহন করলেও তিনি চাষাবাদ করে যে ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাতে তিনি আগামীতে কৃষিক্ষেত ছেড়ে দিতেই চিন্তা করছেন। এভাবে বর্গাচাষি যারা ধান চাষ করে অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন, তারা এখন চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আদমপুরের মধ্যভাগে এসে সিএনজির পরিবর্তে মোটরসাইকেল দুটিতে আমরা চারজন। একজন বাবুল মাস্টার, একজন নাজমুল ছাত্র-মাস্টার, একজন ছাত্র রূপকসহ আমাদের যাত্রাটি মধ্যভাগ বাজার হয়ে হেরেঙ্গা বাজার দিয়ে শ্রীপুর হয়ে গোলেরহাওর বাজারে এসেছে। দোকানে চা খেতে আসা মানুষদের দেখা গেলেও জমজমাট কোনও চায়ের আড্ডা লক্ষ্য করা যায়নি। পথে পথে একটু অপেক্ষা করে মানুষদের পথচলা কথাবার্তায় গন্তব্যই বুঝে নেয়া গেছে। এতক্ষণে আমাদের মোটরসাইকেল দুটি কুরমার চা বাগানের দিকে এগিয়ে চলেছে। পথে পথে ধান সবজি চোখে পড়ছে। ছোট ছোট বাজারগুলিতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অবস্থান চোখে পড়ার মতো। আদমপুরের বাজার থেকে নানা সম্প্রদায়ের মানুষের একত্রিত অবস্থান যে কারও মন কাড়বে। এসব এলাকায় হাটবাজারগুলোতে মণিপুরী, খাসিয়া, সাঁওতাল, মুন্ডা, গারো, ত্রিপুরীসহ নানা সম্প্রদায়ের লোকজনদের একত্রিত অবস্থান একটা অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বহন করে। পরিবারে, গোষ্ঠীতে রক্তের উত্তরাধিকারে সম্প্রদায়গত পরিচয় চিহ্নিত থাকলেও এসব এলাকাগুলোতে ঘর থেকে পা ফেলেই বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশপাশি এমন বিচিত্র নৃ-গোষ্ঠীর সমাহার বা নৈকট্যে আসার সুযোগ ঘটে যায়, যা বাংলাদেশের কোথাও সহজে পাওয়া যায় না, আমরা তখন কুরমা বাজারে একটা চায়ের দোকানে একজন খাসিয়া সহকারী মন্ত্রী চালর্স সুমো সঙ ও একজন ত্রিপুরী সুধুদেব বর্মার সঙ্গে কথা বলছি। আরও লোকজন দোকানে চা পানরত। এখান থেকে এক দেড় কিলোমিটার দূরে খাসিয়া পুঞ্জি ও তিন চার কিলোমিটার দূরে ত্রিপুরীদের তৈলঙ্গ ছড়া। মন্ত্রী চালর্স সুমো সঙ জানান জুমে পান চাষ মোটামুটি চললেও তাদের দীর্ঘদিন ধরে পানীয় জলের সমস্যা বিদ্যমান। বিদ্যুতের সমস্যা এখনও সমাধান হয়নি পুরো পুঞ্জিতে। ৪৫টি খাসি পরিবারের সন্তানেরা স্কুলে নিয়মিত যেতে পারে না, কাছে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। কুরমা পুঞ্জি থেকে বের হয়ে দুটি ভাঙ্গা বাঁশের পুল বা সেতু আছে। তা দিয়ে পারাপার সহজ নয়। এছাড়া দেড় কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা–বর্ষার সময় কিছুতেই ছেলে মেয়েদের চার পাঁচ কিলোমিটার দূরে ইসলামপুর পদ্মা মেমোরিয়্যাল স্কুলে গিয়ে লেখাপড়া করতে পারে না। কলেজে যে কয়জন ছাত্র-ছাত্রী আছে, তাদের এখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে পড়ালেখা সহজ হয় না। তাই অনেকেই শ্রীমঙ্গল বা অন্য কোথায় অবস্থান নিয়ে লেখাপড়া করে থাকে। খাসি সুমো সঙ জানান, এখানে খাসিদের অনেকেই খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেছেন। খাসি ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্য ইত্যাদিতে নিজস্বতা হারায়নি। আগের অনেক কিছুই আগের মতো না থাকলেও মায়ের গুরুত্ব কমেনি। খাসি পরিবারের নামের শেষে মায়ের টাইটেল বা পরিচয় বহন করে থাকেন। যেমন চার্লস সুমো সঙ মাতা ভিলেন টিলা সঙ পিতা ডারবন মানার। এভাবে নামে পিতার বদলে মায়ের পদবী বহন করেন, এটাকে তারা মাতৃসূত্রী বলে থাকেন। খাসিয়ারা এখানে পান চাষের পাশাপাশি সবজি চাষও করেন। তবে এখানে বানরের উৎপাত বেশি থাকায়, চাষাবাদ, ফসলাদি,রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। হতদরিদ্র, তৈলঙ্গ ছড়ায় ২৩টি ত্রিপুরী পরিবার বসবাস করছে, ওখানেও বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুতের সার্ভে চলছে। বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। একসময় তারা ফরেস্টের হয়রানির শিকার হয়েছেন। একজন নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হকের হস্তক্ষেপে তারা এ হয়রানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এই নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা চলমান অবস্থা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন। এক ধরনের নিশ্চুপ তারা। এখানে কুরমায় চা পান ও আড্ডায় কথা বলে প্রায় দুই তিন কিলোমিটার দূরে চাম্পারায় চা বাগান হয়ে কলাবনের দিকে যাত্রা করে কলাবনের পিছের মুখে এসে নামি। এখান থেকেই ডানে ঘুরেই ফরেস্ট ভিটের স্টাফ অফিসের কাছ দিয়ে ‘হামহাম জলপ্রপাত’ দেখতে পর্যটকরা যাত্রা করে। এই কলাবনেই হামহাম ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। শহর নগর থেকে, কোন লোকালয় থেকে বহুদূরে নির্জন পাহাড়ের পাদদেশে নাগরিকদের জন্য স্বাগত হয়ে আছে। তখনই আমাদের চোখে পড়ে সর্পিল গতিতে পাহাড়ের বুক চিরে একদল মানুষের পায়ে হেটে এগিয়ে আসা, সুরঙ্গের মতো পথ দিয়ে যুদ্ধাবেশীর মতো তারা হামহাম থেকে রাস্তার মুখে আসেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা সকলেই হবিগঞ্জ এলাকার একদল যুবক। তাদের অভিযান কষ্টের হলেও আনন্দের। চোখে মুখে বিজয়ের ¯িœগ্ধতা তারা ১৫টির মতো দুর্গম টিলা পাড়ি দিয়ে তবেই হামহাম এর ঝর্ণা দেখতে সক্ষম হয়েছেন। একজন গাইড সঙ্গে থাকায় সহায়তা হয়েছে। তাদের সকলের হাতে লম্বা লাঠি শোভা পাচ্ছিল। তখন আমাদের মনে একটি দুর্ভাবনা জেগে উঠে, রাষ্ট্রের ডিজিটাল চোখ যদি এই পিছের মুখ থেকে পাহাড় জঙ্গল কেটে হামহাম পর্যন্ত রাস্তা তৈরির বাসনায় মত্ত হয়ে বলে উঠে, বন না থাকলেও বন তৈরি করা যায়, তখন আমও যাবে ছালাও যাবে। নানা আলামত থেকে এমন ভাবনায় তাড়িত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অতঃপর আমাদের সাইকেল ঘুরে গিয়ে চাম্পারায় বাগানের একটি স্কুলে গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। শুক্রবার দিন স্কুল বন্ধ থাকলেও আকস্মিকভাবে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুদ্র প্রসাদ বুনার্জীকে পেয়ে গেলাম। এখানে পড়ালেখার কোন ব্যবস্থাই ছিল না। ২০১৭ সালে তাদের নিজস্ব উদ্যোগে বিনা বেতনে একটা স্কুল চালু হলে সরকারের নজর পড়লে জাইকা প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় ২০ঙ১৮ ফুট একটি ঘর নির্মিত হলেও ওখানে ছাত্র-ছাত্রীদের বসার জায়গা হয় না। জানকী করের বাড়িতে ৭০জন ছাত্র-ছাত্রী ও ৩ জন শিক্ষক নিয়ে স্কুলটি কোনমতে চলছে। স্কুলে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই। কোন শৌচাগার নেই। শিক্ষকদের বেতন দূরে থাক কোন সম্মানিও নেই। একজন শিক্ষক মুন্নী আক্তার বাগানের দৈনিক হাজিরার পরিবর্তে ছাত্র পড়ান। অদ্ভুদ হলেও সত্য যে, রুদ্র প্রসাদ জানান, এখানে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, টিউবওয়েল নেই, ৫৫টি পরিবারে এখনও বিদ্যুৎ আসেনি। রাষ্ট্র এখানে নানাভাবে অনুপস্থিত। তবে এখানকার হাওয়া ভালো। হাওয়া খেতে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে নানা রঙ্গের এলিটজনেরা গাড়ি হাকিয়ে ঘুরে-ফিরে যান, কিন্তু মানুষ এসব চালচিত্রের অনেক কিছুই বুঝে না। মানুষ যখন ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন যেভাবে বুঝে নিয়েছে, তখন আর কোনও সুসমাচারই যেন বুঝে নিতে নারাজ। আমরা আমাদের গন্তব্যের দিকে ফিরে যেতে গিয়ে গোলের হাওরে একজন নাজমুলের বাড়িতে দুপুরের খাবার বিকালে খেয়ে নেই। বাঙালি মুসলমান অধ্যুষিত এই গ্রামের বাঙালি মুসলমান নারীর হাতে মুণিপুরী তাঁত এখানে তাঁত-নারী খুশবা, সালমা, বেলা, ইয়াসমিন, জয়গুন, নাজমা, জায়দা, সাজিদা, লিপি, রুজিনা, পেয়ারা, পারভীন, মনি, হাবিবা, মালন, ফুলন, মাইমা, রুবাসহ অনেকে–যাদের সকলেই বিত্তহীন, দিনমজুর পরিবারের, এই এলাকায় শত শত নারী পুরুষ তাঁত মধুচাষ বাঁশবেত সহ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরকারের নজর পড়ে না। পুঁজির জন্য এনজিও ও মহাজনী ঋণ তাদের সুদাসলে অনেকখানি লুটে নিচ্ছে। এখানে জনপ্রতিনিধির বৈশিষ্ট্য যেন, দীর্ঘকাল ধরে জবাবদিহি জব্দ হয়ে আছে। পথ থেকে পথে ঘুরে এটুকু মনে হয়েছে, মানুষের ভেতরে যে, ভয়ংকর নির্লিপ্ততা তৈরি হয়েছে, তা ভাঙ্গতে হলে প্রগতিশীল শক্তি বিশেষত বামপন্থি কমিউনিস্টরা নিরবধি মানুষের দুঃখের সকাল-বিকালে কতটুকু সময় দিতে পারবে তার উপরে কিন্তু পরিবর্তন যাত্রা বা পরিবর্তন নির্ভর করছে। লেখক : সদস্য, সিপিবি, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..