মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার করতে হবে লুটেরাদের হাত থেকে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মোহাম্মদ শাহ আলম : মুক্তিযুদ্ধের ৪৯ বছর আসন্ন। কয়েকদিন পর বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর। পূর্ণ হবে ঊনপঞ্চাশ বছর। কম সময় নয়, প্রায় অর্ধশত বছর। কিন্তু কী পেলাম আমরা, প্রশ্ন সিংহভাগ মানুষের। মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটা মানচিত্র, একখণ্ড ভূমি ও পতাকা ছিল না। রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি ছিল মানুষের সামাজিক মুক্তি, আর্থ-সামাজিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সমাজ ও দেশের আজ কী অবস্থা? ধনবৈষম্য শ্রেণিবৈষম্য আকাশচুম্বী। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। সাম্প্রদায়িক জাতিতত্ত্ব, দ্বিজাতিতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত হলো পাকিস্তান। জাতি পরিচয়কে পেছনে ফেলে সাম্প্রদায়িক পরিচয় প্রধান হয়ে উঠলো। বাঙালি আত্মপরিচয়ের সংকটে পড়লো। জাতিগত বৈষম্য-নিপীড়ন শুরু হলো বাঙালির ওপর। পশ্চিম পাকিস্তানীদের উপনিবেশিকরণের শোষণ চেপে বসলো পূর্ব পাকিস্তানের ওপর। ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ-চাকরি-বাকরির নিয়োগদাতা হয়ে উঠলো পশ্চিম পাকিস্তানীরা। চাকুরির সমস্ত উচ্চপদ ওরা দখল করে বসলো। সৃষ্টি হলো ব্যবসা-বাণিজ্যে পশ্চিম পাকিস্তানী ২২ পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্য। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা শুরু করে পাকিস্তানীরা। বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা ভাষার উপর এসে পড়ে আক্রমণ। মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। ১৯৪৬-এর ‘লেরকে লেংগি’ পাকিস্তানের স্লোগানের মোহ ভেঙে যায় বাঙালিদের। পাকিস্তান জন্মের ৫ বছরের কম সময়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক জাতিতত্ত্ব counter হয়ে যায়–ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ধাক্কায়, ১৯৫২ সালে। শুরু হয় নতুন ধারার আন্দোলন– শোষণ-বৈষম্য-জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয়মুক্তির লড়াই। মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক গণবিরোধী অপরাজনীতি প্রতিরোধের মুখে পড়ে। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ করে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট মুসলিম লীগের গণবিচ্ছিন্নতা বাড়তে থাকে। এই পটভূমিতে ১৯৫৪ সালে ২১ দফার ভিত্তিতে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের ভরাডুবি ও তার চূড়ান্ত গণবিচ্ছিন্নতাকে উন্মোচিত করে। ৩০০ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পায়। শুরু হয়ে যায় যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র। কারণ ২১ দফাতে পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি ছিল। সংগঠিত হয় আদমজী-কর্ণফুলী পেপার মিলে বাঙালি ও অবাঙালি দাঙ্গা। রাজনীতিবিদদের দেউলিয়াত্ব ও সুবিধাবাদ মানুষ প্রত্যক্ষ করলো। সকাল-বিকাল সরকার পরিবর্তন হতে থাকলো। বিস্তারিত বর্ণনা এই নিবন্ধে দেওয়া সম্ভব নয়। রাজনীতিতে অনেক উত্থান-পতন– ৯২(ক) ধারা জারি। সোহরাওয়ার্দী সাহবের মন্ত্রী হওয়া-আওয়ামী লীগে ভাঙন-মৌলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ১৯৫৭ সালে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন। এর এক বছরের মাথায় স্বৈরশাসক জেনারেল আয়ূব খানের সামরিক অভ্যুত্থান, ক্ষমতা দখল। ১০ বছরের স্বৈরশাসন, এই সময়ের ঘটনা প্রবাহ। আয়ূবের অভিনব গণতন্ত্র, মৌলিক গণতন্ত্র চালু, ১৯৬২’র ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন, ৬৪’তে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী প্রতিরোধ, ৬৬’তে ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ৬৯-এ ১১ দফা ভিত্তিক গণঅভ্যুত্থান, শেখ মুজিব-মণি সিংহসহ-রাজবন্দিদের মুক্তি, জনজোয়ার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে রেসকোর্সের গণসম্বর্ধনায় শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদান। লাহোরে গোলটেবিল বৈঠক, গোলটেবিল বৈঠকের পর স্বৈরাচার আয়ূবের পতন, জেনারেল ইয়াহিয়ার ক্ষমতা দখল, সামরিক শাসন জারি, L.F.O লিগ্যাল ফ্রিইম ওয়ার্ক ঘোষণা, একলোক একভোটের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ নির্বাচন, ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন, পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের ধ্বস নামানো বিজয়। পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়। ৩ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান- ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান কর্তৃক পরিষদ অধিবেশন স্থগিত। নতুন চক্রান্ত ষড়যন্ত্র শুরু। পূর্ব পাকিস্তান অগ্নিগর্ভ, বাঙালির প্রতিরোধ অসহযোগ আন্দোলন-গণতন্ত্র-স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন এক দফার স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত। ইয়াহিয়া-ভুট্টোর নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সাথে লোক দেখানো, ষড়যন্ত্রের বৈঠক ও সময়ক্ষেপণ। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানীদের সর্বাত্মক আক্রমণ বাঙালির মরণপণ প্রতিরোধ লড়াই। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা। ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ-ভারতের সার্বিক সহযোগিতা-সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থন। ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ। বাঙালির বিজয়-স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। এইতো বাংলাদেশের জনগণের লড়াইয়ের সংক্ষিপ্ত রেখাচিত্র। আগেই উল্লেখ করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তির লড়াই শুধু পতাকা ভূখণ্ডের ছিল না। ছিল নীতি-আদর্শের, এই লড়াইটা শুধু ঢাকা পিণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ঘটেছিল আন্তর্জাতিক মেরুকরণ। একদিকে ছিল ঢাকা-দিল্লি-মস্কো, অন্যদিকে পিন্ডি-পিকিং-ওয়াশিংটন। লড়াই ছিল সাম্রজ্যবাদবিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা-গণতন্ত্র ও শোষণমুক্তির লড়াই। ফলে আমাদের বিজয় ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিপরীতে গণতন্ত্র, ধর্মান্ধতার জায়গায় ধর্মনিরপেক্ষতার, সাম্প্রদায়িক জাতিতত্ত্বের বদলে ভাষাভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তার, শোষণ-বৈষম্যের বিপরীতে সমাজতন্ত্রের ঘোষণার। স্বাধীনতার পর ব্যাংক-বীমা-পাটকল-সূতাকলসহ অর্থনীতির প্রধান-প্রধান খাত জাতীয়করণ ও রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। দেশের রাজনীতি অর্থনীতিতে প্রগতির ধারার সূচনা হয়। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যোগাযোগ-পরিবহন-দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অর্থনীতি ছিল নাজুক। লুটপাট-অর্থনীতিতে অন্তর্ঘাত দেশের বাজার ব্যবস্থাকে প্রচ-ভাবে অস্থিতিশীল করে তুলে। বামপন্থি হঠকারিতা-ডানপন্থি সুবিধাবাদ, পরাজিত-প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি–আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র, সরকারি দলের নেতাদের লুটপাট ও দলের ভেতর আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ১৯৭৫ এর পটপরিবর্তনের পটভূমি তৈরি করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্ব-পরিবারে নির্মমভাবে নিহত হন। রাজনীতি-ভাবাদর্শ-অর্থনীতিতে পাকিস্তানী ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। বাঙালির আত্মপরিচয়ের সঙ্কট একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেটা রাজনৈতিকভাবে ঘুচে গিয়েছিল তা আবার নতুনভাবে উদ্ভব হয়। যা এখনও অব্যাহত আছে, সমাধান হয়নি। সাম্প্রদায়িক চেতনা প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে সামাজিক চেতনায়। এখানে সিপিবি’র রণনীতি দলিলের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখতে পাই, পঁচাত্তর পরবর্তী সরকারগুলি সম্পর্কে বলা হয়েছে “পঁচাত্তর পরবর্তী শাসকদের অভ্যন্তরীণ নীতির মূল কথা হলো: সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা ধনবাদের ধারা অনুসরণ, সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজিকে অবাধ সুযোগ প্রদান এবং সাম্রাজ্যবাদনির্ভর আমলা মুৎসুদ্দি পুঁজির প্রসার ও তাদের স্বার্থে বিরাষ্ট্রীয়করণ, গ্রামাঞ্চলে নব্য কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সৃষ্টি, জনগণের অধিকার খর্ব ও হরণ করা, স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে অর্জিত সুফল নস্যাৎ করা, পাকিস্তানী আমলের সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল ভাবাদর্শ এবং তাদের অনুসারীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।” [পৃষ্ঠা-৫ রণনীতি দলিল] মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল রাষ্ট্রক্ষমতায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্ষমতার স্বার্থে miss use হচ্ছে। ৭৫-এর পূর্ববর্তী ধারা এখনও ফিরে আসেনি। মুক্তবাজারের নামে চলছে লুটপাট। স্বাস্থ্য-শিক্ষা-ব্যাংক-বীমা-শেয়ার মার্কেট-ধান-চাল-পেঁয়াজ অর্থাৎ ভোগ্যপণ্যের বাজারসহ সবকিছু সিন্ডিকেটের দখলে– বাজারে প্রতিযোগিতার কথা বললেও বাজারে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-পাড়া-মহল্লা-শিল্প এলাকা মাফিয়াদের কব্জায় ও নিয়ন্ত্রণে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও পতাকা লুটেরা মাফিয়ারা ব্যবহার করছে তাদের লুটপাটের স্বার্থে। সরকার এদের পাহাড়াদারে পরিণত হয়েছে। ফলে সংবেদনশীলতা ও আগ্রহ হারিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। প্রতিদিন বিপন্ন হচ্ছে এই চেতনা। তাই আজ মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্তির প্রগতির চেতনাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে লুটেরাদের হাত থেকে। একইসাথে লড়তে হবে লুটেরা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নিপীড়ন মানুষের ভোট-ভাতের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। সভা-সমাবেশ-মিছিল-মিটিং-এর অধিকার নেই। গণতন্ত্র নির্বাসনে। গুম-খুন-বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে গণবিরোধী গণতন্ত্রবিরোধী কাজে। এটা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করছে। তারা এটাই চায়- মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যেন নতুন প্রজন্মকে আবেগ আপ্লুত না করে। জাতির জন্য এটা এক অশনিসংকেত। মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত চেতনা ও পতাকা ব্যবহারকারী গণবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে তাই আজ গড়ে তুলতে হবে পাড়া-মহল্লায়-কলে-কারখানায়-স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ও রাজপথে গণআন্দোলন ও গণপ্রতিরোধ। এই হোক বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের শপথ। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..