টিইউসির জাতীয় সম্মেলন

শ্রমিক আন্দোলনের নতুন বার্তা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মাহবুবুল আলম : বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের দশম জাতীয় সম্মেলন আগামী ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ ঢাকায় মহানগর নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ৬ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, বর্ণাঢ্য র্যালি এবং ৭ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিনিধিরা বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করবেন। এই সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দেশ আজ এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। শ্রমিক শ্রেণি ও দেশবাসীর দুশমনেরা সমস্ত কলকারখানা, শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যকে ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে গিয়ে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিকে অবাধ পুঁজিবাদী শোষণের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে। স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব ও প্রগতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত অব্যাহত আছে। পুঁজিবাদী ধারায় দেশবাসীর মুক্তি হবে না। মুক্তির পথ শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। আমরা আত্মনির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই। আমরা চাই উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সব কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি দূর হোক। কিন্তু সমস্যার শেষ নেই। শ্রমিক-কর্মচারীরা ট্রেড ইউনিয়ন করার পূর্ণ অধিকার থেকে বঞ্চিত। ২০০৬ সালের শ্রম আইন এবং সংশোধিত শ্রম আইন ২০১৩-এ যেটুকু শ্রমিক অধিকার আছে, তাতেও নানা জটিলতার কারণে শ্রমিক-কর্মচারীরা সংগঠিত হতে পারছে না। শ্রমিক-কর্মচারীদের হাত-পা বেঁধে রাখার মতো করে রাখা হয়েছে। আর এই সুযোগ নিয়ে মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শোষণ ও নির্যাতন বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে। ন্যায়সংগত দাবি ও অধিকারের কথা বললেই রক্তচক্ষু দেখতে হয়। মালিকরা শিল্প-পুলিশ নিয়ে শ্রমিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে এবং শ্রমিকদের এলাকাছাড়া করছে। প্রতিনিয়তই চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির জন্য দেশের শ্রমিক-কর্মচারীরা এক নিদারুণ অসহায় অবস্থায় জীবন যাপন করছেন। বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার এক দারুণ সংকট দেখা দিয়েছে। দুর্নীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক কথায় বলা যায়, দেশের শ্রমিক শ্রেণি আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা এই অবস্থার পরিবর্তন চাই, আত্মনির্ভরশীর স্বাবলম্বী দেশ গড়ে তুলতে চাই। আর এজন্যই দেশের সমস্ত কলকারখানা, প্রতিষ্ঠান ভালোভাবে চলুক, কোনো অব্যবস্থাপনা না থাকুক, কোনো দুর্নীতি না হোক এবং নিয়মিত ভালো উৎপাদন হোক আমরা তাই চাই। কিন্তু অসন্তুষ্ট ও সমস্যায় জর্জরিত শ্রমিকেরা দেশ গড়ার কাজে উৎসাহিত হতে পারে না, হয় না। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র স্বাধীনতার পর থেকে শ্রমিক শ্রেণির দেশপ্রেমিক দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে একদিকে কল-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সকল প্রকার অব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করছে, অন্যদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায়সংগত দাবিতেও আন্দোলন করে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- স্বাবলম্বী দেশ, আত্মনির্ভরশীল দেশ কীভাবে গড়া যাবে? মেহনতি শ্রমিক-কৃষকের ওপর আস্থা না রেখে দেশ গড়া যায় না, দেশকে স্বাবলম্বী করা যায় না, যাবেও না। সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণি ও দেশবাসীর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারাই দেশ গড়ে তুলতে হবে। ২০০৬, ২০১৩ ও ২০১৮ সালের শ্রম আইন ও বিধি হচ্ছে নব্য উদারবাদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি অনিবার্য ফসল। ২০০৬, ২০১৩ ও ২০১৮ সালের শ্রম আইন আইএলও কনভেশন নং ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী করা হয়নি। বর্তমানে শ্রমিকদের প্রধান দাবি হচ্ছে আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮-এর সাথে সংগঠিত রেখে শ্রম আইন সংশোধন করা। বর্তমানে বাংলাদেশ গার্মেন্টসসহ ব্যক্তিমালিকানায় বিপুল সংখ্যক কারখানা গড়ে উঠেছে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন ব্যক্তিমালিকানাধীন। এসব সেক্টরের শ্রমিকরাও অসংগঠিত। এসব শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার না দিয়ে শোষণ-নির্যাতন চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তাজরিন ফ্যাশন ও রানা প্লাজায় শ্রমিক হত্যা তারই চরম পরিণতি। অপরদিকে দেশের কৃষি খাতে শ্রম দেয় যে শ্রমিকরা, তারা এখনও কোনো আইনের আওতায় আসেনি। যদিও শ্রম আইনে কৃষি শ্রমিককে শ্রমিক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কৃষি শ্রমিকের জন্য কোনো আইন না থাকায় কৃষি শ্রমিকরা এখনও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার পায়নি। অথচ কৃষি শ্রমিকের সংঘবদ্ধ হওয়ার অধিকার বিষয়ক আইএলও কনভেনশন-১১ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অসমর্থিত। তাই আজ গার্মেন্টস, ব্যক্তিমালিকানাধীন শ্রমিক ও কৃষি শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারের দাবি নিয়ে আন্দোলন করতে হচ্ছে। শ্রমিক আন্দোলন ও সংগঠনের বর্তমান বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে আদর্শবাদী বিপ্লবী ধারায় শ্রমিক সংগঠন গড়ে তুলতে হলে বিপ্লবী নেতৃত্ব তৈরি করতে হবে। ত্যাগের মানসিকতা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করতে হবে। তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। সৎ, ত্যাগী, নিষ্ঠাবান আদর্শবাদী কর্মী ছাড়া সুস্থ ধারার ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সম্ভব নয়। আর এই জন্যই আদর্শবাদী সচেতন কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা জরুরি। শ্রমিক আন্দোলনে আজকের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হচ্ছে- শ্রমিকদের দাবি দাওয়া, অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে তাদের সচেতন করে তোলা। পাশাপাশি সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ এবং পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণিকে শ্রেণি সচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে তুলতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনের একটি ধাপ হিসেবে সফল করে তুলতে হবে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের ১০ম জাতীয় সম্মেলনকে। আমাদের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা সম্মেলনে সুচিন্তিত আলোচনা করে আগামী দিনের জন্য সংগ্রামী ও সুশৃঙ্খল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ও সংগঠন করার সিদ্ধান্ত নেবেন। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায়সংগত দাবি আদায়ের জন্য এক নতুন ধারার সংগ্রামের স্রষ্টা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, অভিষ্ট লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাবই। সরকার যে শ্রমনীতি ঘোষণা করেছে, তাতে নানা আইনের ফাঁকে বস্তুত ধর্মঘটের অধিকার প্রদান করা হয়নি। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মচারীর যৌথ দরকষাকষির অধিকার আনুষ্ঠানিকভাবেই কেড়ে নেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ইচ্ছামতো নেতা নির্বাচনের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। যেকোনো সময় ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ ট্রেড ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ কাজ-কর্মে হস্তক্ষেপ করার অবাধ সুযোগ করে দেয়া হয়েছে সরকারি শ্রম দফতরকে। বিভিন্ন কালাকানুন এখনও বজায় আছে। অবশ্য ইতোমধ্যে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের আইন, মজুরি প্রদান আইন, সড়ক পরিবহন শ্রমিক আইনের কিছু ভালো সংশোধনী করা হয়েছে। কিন্তু এসব আইনে কিছু ত্রুটি থাকায় এবং সামগ্রিকভাবে সরকারি নীতি শ্রমিক স্বার্থবিরোধী হওয়ায়, এগুলোর সুফল পাওয়া শ্রমিকদের জন্য কঠিন হবে। শ্রমিক শ্রেণি ও মেহনতি জনগণ তথা সমগ্র দেশবাসীর সামনে যে সমস্যার পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে, জনজীবনে যে গভীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে, পুঁজিবাদ তার সমাধান দিতে পারে না। মেহনতি জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সমাজতন্ত্র। আমাদের দেশে মুক্তির পথে অগ্রসর হতে হলে সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদী ধারার বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রমুখী মৌলিক বিপ্লবী রূপান্তরের পথে অগ্রসর হতে হবে। সরকারের অবাধ পুঁজিবাদী গণবিরোধী নীতির ফলে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গভীর সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মেহনতি মানুষ ও দেশবাসীর বিক্ষোভ ও সংগ্রাম দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে মেহনতি জনগণের স্বার্থে মৌলিক সামাজিক অর্থনৈতিক রূপান্তরে সক্ষম, জনগণের আস্থাভাজন উপযুক্ত দেশপ্রেমিক প্রগতিশীল বিকল্প শক্তি আজও গড়ে ওঠেনি। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে সর্বপ্রথম শ্রমিক শ্রেণিকেই এগিয়ে আসতে হবে। সমগ্র রাজনৈতিক গতিধারার ওপর শ্রমিক ও মেহনতি জনগণের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বৃদ্ধি করতে হবে। শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব স্বাধীন রাজনৈতিক উদ্যোগ ও তৎপরতা বাড়াতে হবে। শ্রমিক শ্রেণি অন্যান্য মেহনতি-শোষিত জনগণকে সমবেত করে তার ওপর ন্যস্ত এই ঐতিহাসিক কর্তব্য কতখানি সম্পাদন করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র দমনীতি ও নির্যাতন মোকাবিলা করে শ্রমিকশ্রেণির স্বার্থে তার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবিসমূহ আদায়ের জন্য শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবন-ধারণের মান উন্নয়নের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণের জন্য, সর্বপ্রকার শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। এসব সংগ্রামকে সাফল্যজনকভাবে অগ্রসর করে নেয়ার জন্য ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র ব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তোলার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। টিইউসি শ্রমিকশ্রেণিকে রাজনৈতিকভাবে শ্রেণি সচেতন করে তুলে সমাজবিপ্লবের লক্ষ্যে বিপ্লবী আন্দোলন গড়ে তুলছে। ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র দেশের অভ্যন্তরে অন্যান্য শ্রেণির ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধেও সোচ্চার রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন, জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, শান্তি ও প্রগতির সংগ্রামগুলির প্রতি সক্রিয় সংহতি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ও শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিকতাবাদী চেতনার সুমহান ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে টিইউসি সবসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সবরকম সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণিকে সঙ্গে নিয়ে আপসহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে এবং ইউনিয়নগুলোতে গণতান্ত্রিক কর্মধারা, যৌথ নেতৃত্ব, সাংস্কৃতিক, গঠনমূলক ও কল্যাণমুখী বিভিন্ন ধারার কর্মকাণ্ড পরিচালনার মধ্য দিয়ে ‘বিপ্লবের স্কুল’ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়াসী। লেখক : সহ-সভাপতি, টিইউসি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..