সড়কে অরাজকতা

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মনজুরুল আহসান খান : বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনে অরাজকতা নতুন কিছু ব্যাপার নয়। বিষয়টি বহুল আলোচিত। বিভিন্ন সময় সরকার ও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ড্রাইভারদের শাস্তির ওপর। তাদের শাস্তি আইন করে বাড়ানো হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক আইনে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য পুলিশকে প্রয়োজনে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে ড্রাইভারদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এসব করে দুর্ঘটনা কমানো যায়নি। দুর্ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। যানবাহন চলাচলে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করার জন্য নতুন করে বিআরটিএ’র মতো একটি বিশাল সংস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাতে গাড়ির ফিটনেস অথবা রেজিস্ট্রেশন ইত্যাদি সরল ও সহজ করা সম্ভব হয়নি। বিআরটিএ দুর্নীতির আখড়া হয়েছে। যানজট কমাতে সড়ক প্রশস্ত করা হয়েছে, কিন্তু সড়কের বড় অংশ নির্মাণসামগ্রী অথবা স্থাপনাগুলোর অবৈধ বিস্তার এবং সরকারি দলের অফিস ও দোকানপাটের দখলে। ফ্লাইওভারগুলো বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে যানজটকে এক স্থান থেকে ফ্লাই করে অন্য স্থানে নিয়ে যাচ্ছে। যথাস্থানে ফুটওভারব্রিজ না হওয়ায় পথচারীরা ব্রিজ ব্যবহারে অক্ষম। উপযুক্ত পরিকল্পনার অভাবে আন্ডারপাসগুলো অচল অথবা একেবারেই বন্ধ। আধুনিক স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা যাত্রার শুরুতেই ক্রটিপূর্ণ ও অচল বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীর জাগরণ ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, মিডিয়া ও জনসমক্ষে উল্টোপথে গাড়ি চালানো, মন্ত্রীদের লজ্জা অথবা বিদেশ থেকে আমদানি করা টায়ার ফুটো করতে সক্ষম ইস্পাতের কাঁটার বেড়া উল্টোপথে গাড়ি চালানো বন্ধ করতে পারেনি। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে সব সরকার যানজট কমাতে রিকশা উচ্ছেদের অভিযান চালিয়েছে বটে, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। বরং সার্ভে করে দেখা গেছে, যেসব রাস্তায় রিকশা চলাচল বন্ধ করা হয়েছে, সেসব রাস্তায় যানজট মোটেও কমেনি। ট্রাফিক পুলিশ সড়ক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে ঘুষ এবং ‘মান্থলি’ চাঁদা আদায় করতে ব্যস্ত। পুলিশের যখনই টাকা দরকার হাত তুলে গাড়ি থামায়। নকল লাইসেন্স বা রঙ পার্কিং কিংবা ফিটনেসের অভাবের কথা বলে টাকা আদায় করে। তবে পুলিশ নিজ হাতে টাকা নেয় না। প্রত্যেক বিটে ‘ছোকরা’ থাকে তারা গিয়ে টাকা আদায় করে। নকল লাইসেন্সের কারবার চলছে দেদার। সংবাদপত্রে নকল টাকা ছাপার চক্র গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়, কিন্তু নকল লাইসেন্সের দুষ্টচক্র ধরাছোঁয়ার বাইরে। কারণ আছে। লাইসেন্স চেক করতে গিয়ে ধরা পড়লেই ৫০০ টাকা পকেটস্থ করা যায়। বৈধ লাইসেন্স ইস্যু করে বিআরটিএ। সেখানে পদে পদে ঘুষ আর হয়রানি। বৈধ লাইসেন্স নিতে গিয়ে ড্রাইভাররা যে বার্তা পায় তা হচ্ছে, যাও নকল লাইসেন্স জোগাড় করো। তবে ভিআইপিদের ক্ষেত্রে আলাদা, তাদের কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। তাদের ক্ষেত্রে ওয়ান স্টপ সার্ভিস। দেশে শক্তিশালী মালিক সমিতি আছে। তারা ধর্মঘট করে সরকারকে কাবু করে ফেলতে পারে। তারাও তাদের নিজেদের অধিকার আদায় করতে আগ্রহী নয়। বিআরটিএতে যদি দুর্নীতি বন্ধ হয়, তা হলে তাদের অবৈধ চেসিস বা মডিফাইড গাড়ি কীভাবে রেজিস্ট্রেশন বা রুট পারমিট পাবে। কীভাবে অচল গাড়ি ফিটনেস পাবে। এক সময় সড়ক পরিবহন শ্রমিক সংগঠন ছিল শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণে। এই সংগঠনগুলো এখন শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য নয়, শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের জন্য। মালিক ও শ্রমিক সংগঠন মিলে মাসে কোটি কোটি টাকা অবৈধ চাঁদা উঠছে প্রকাশ্যে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে নামধাম এবং চাঁদা আদায়ের পরিমাণ উল্লেখ করে একাধিক প্রতিবেদন উঠেছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গৃহীত হয়নি। হবে কেন। ওরা তো একা খায় না। পুলিশ থেকে আরম্ভ করে সবাইকে ওরা ভাগ দেয়। মন্ত্রী-এমপিরা জড়িত। ক্ষমতার হাতবদল হলে যাতে বিপদে পড়তে না হয়, সে জন্য তারা নেতৃত্বের মধ্যে বড় দলগুলোর প্রতিনিধি রাখতে ভোলে না। কাজেই এসব অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ এবং ভুক্তভোগীরা। বর্তমান সরকার মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে অনেকদিন পর সড়কের জন্য আইন জারি করল। কিন্তু প্রথমেই বাধা এলো মালিক ও শ্রমিক পক্ষ থেকে। তার পর আবার দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা। কিছু সংশোধনী আনা হলো। পাসও হলো। কিন্তু কার্যকর করতে গিয়ে আবারও বাধা। নতুন আইন প্রয়োগ স্থগিত করা হলো। তবে শেষমেশ আইন প্রয়োগ করা শুরু হলো। মালিক-শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা কেউ টুঁ শব্দটিও করল না ভয়ে। ক্যাসিনোর কারিগরদের বিরুদ্ধে তাদের সতর্ক হতে বাধ্য করল। সরকারের বিরুদ্ধে কোনো কিছু বললে যদি তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। অভিযান শুরু করার জন্য সংবাদপত্রেই যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে। কিন্তু শ্রমিকদের তো গাড়ি চালাতেই হয়। দিন আনে দিন খায় তারা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধর্মঘটে নামল। দ্রুতই সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ল সেই ধর্মঘট। প্রথমদিকে সড়কমন্ত্রী বললেন, চাপের মুখে পিছু হটবেন না তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হটলেন। সরকারের সঙ্গে ধর্মঘটীদের নয় যে ধর্মঘটের দায় নেতারা নেননি সেই নেতারাই আলোচনায় বসলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলোচনা শেষে জানালেন, আইনের তিনটি ধারা ছয় মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। অন্য দাবিগুলো বিবেচনায় আনা হবে। তা হলে শেষ পর্যন্ত কী হলো। অশ্বডিম্ব। এই মাফিয়া চক্র দেশকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের ঘাঁটতে গেলেই বিপদ। বঙ্গবন্ধু এই লুটেরা দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়েই শাহাদাত বরণ করেছেন। সড়ক আইনের নানা ভালো দিক থাকলেও তার কতগুলো ত্রুটি আছে। এই আইনের মৌলিক দর্শন হচ্ছে শ্রমিকদের শাস্তি বৃদ্ধি। কিন্তু এটা সবাই জানার কথা যে, সড়ক পরিবহনের সঙ্গে শুধু শ্রমিকরা নয়, মালিক, মালিক-শ্রমিক নেতা (এদেরকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে চাই, যেহেতু তারা ইতোমধ্যেই একটি কায়েমি স্বার্থ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে), পুলিশ, বিআরটিএ, পথচারী, সরকার ইত্যাদি। এদের মধ্যে যারাই দায়ী তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। গাড়ির ফিটনেসের জন্য দায়ী একমাত্র মালিক। মালিকের কেন শাস্তি হবে না। শ্রমিক আনফিট গাড়ি চালাতে বাধ্য হয় কারণ গাড়ি না চালালে তার চাকরি চলে যাবে। ইন্স্যুরেন্সের জন্যও মালিক দায়ী। পথচারীর কারণে বা ত্রুটিপূর্ণ রাস্তার জন্য দায়ী যারা তাদের শাস্তি দিতে হবে। শ্রমিকের আইন অনুসারে নিয়োগপত্রের জন্য পাকিস্তান আমলে ইয়াহিয়ার শাসনকালে আমরা ধর্মঘট করেছিলাম। জেনারেল রাও ফরমান আলী গভর্নর হাউসে আলোচনায় বসে দাবি মেনে নেন। কিন্তু এখন কোনো শ্রমিকের নিয়োগপত্র নেই। আইন অনুসারে প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে শ্রমিকরা বঞ্চিত। ৮ ঘণ্টা কাজ, বিশ্রাম, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য ছুটি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা সব থেকেই বঞ্চিত। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ৫টি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন। একটিও কার্যকর করা হয়নি। এমনকি শ্রমিককে ৫ ঘণ্টা কাজের পর বিশ্রাম এবং দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প ড্রাইভার রাখার নির্দেশ কোনোটিই মানা হয়নি। ‘ভাত দেওয়ার মুরদ নাই কিল মারার গোঁসাই’ এটাই হচ্ছে আলোচ্য আইনের দর্শন। এই দর্শন পরিত্যাগ করে সড়ক পরিবহন আইন ঢেলে সাজাতে হবে। তবে তার জন্য একইসঙ্গে সমাজটাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। কিন্তু সরকার একা তো পারবে না। বিভিন্ন সময়ের ঘটনা তাই প্রমাণ করে। এর জন্য প্রয়োজন শ্রমিক-মালিকসহ ব্যাপক জনগণের সক্রিয় গণঅভ্যুত্থান। লেখক : উপদেষ্টা, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..