কৃষক আন্দোলন ও পরিবেশ রক্ষা জার্মান সরকারের চ্যালেঞ্জ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : সরকারের কৃষি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জার্মানির বিভিন্ন শহরে গত সপ্তাহে বড় ধরনের বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন দেশটির কৃষকেরা। অন্যদিকে এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানাচ্ছেন পরিবেশ ও প্রাণী অধিকার আন্দোলনকারীরা। মুন্সটার প্লাটজ। বন শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই চত্বরে কনসার্ট হয়, মেলা বসে, প্রদর্শনীও চলে বিভিন্ন দিবস উপলক্ষ্যে। গত সোমবার সেই চত্বরেই জড়ো হয়েছিলেন জার্মানির হাজারো কৃষক। তারা এসেছেন আশপাশ কিংবা কয়েকশো মাইল দূরের লোয়ার স্যাঙোনি থেকে। কেউ এসেছেন একা, কেউ গোটা পরিবার নিয়ে। তাদের মধ্যে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী যেমন ছিল তেমনি উপস্থিতি ছিল বয়স্কদেরও। তাঁদের কেউ চাষি, কেউবা খামারি। অনেকের হাতেই ছিল সূর্যমুখী ফুল, যা দেশটির অন্যতম কৃষিপণ্য । কৃষকেরা সাথে করে নিয়ে এসেছেন হাজার খানেক ট্রাক্টরও। সেগুলো সাধারণত সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ হলেও বন শহরের প্রবেশদ্বারগুলোতে তারা ঘিরে ফেলেন যানগুলো দিয়ে। তাতে গোটা শহরই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই কর্মসূচি ছিল সরকারের বিরুদ্ধে, দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক পদক্ষেপের প্রতিবাদে। আর মন্ত্রণালয়টির অবস্থান বন শহরেই। স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর হিসাবে, এক হাজার ট্রাক্টর নিয়ে ১০ হাজারের বেশি কৃষক এদিন বন শহরের প্রতিবাদ সমাবেশে সামিল হন। এর বাইরে বার্লিন, মিউনিখ, হ্যানোভারসহ আরো ১৭টি শহরে একযোগে এই কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে। কেন ক্ষুব্ধ জার্মান কৃষকরা গত সেপ্টেম্বরে জার্মানির কৃষিমন্ত্রী এবং পরিবেশমন্ত্রী দেশটির সংসদ-বুন্ডেসটাগে একটি কৃষি পরিকল্পনা পেশ করেন। এতে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকানো, পরিবেশ রক্ষা ও প্রাণীদের অধিকার সংরক্ষণের বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালে মধ্যে জমিতে ঘাসসহ আগাছা উৎপাটনের জন্য ব্যবহৃত গ্লাইফোসেটের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। লাগাম টেনে ধরা হবে সার ও রাসায়নিক ব্যবহারেও। যাতে ভূগর্ভস্থ পানিতে ক্ষতিকর নাইট্রেটের উপস্থিতি হ্রাস করা যায়। কিন্তু সরকারের এই পরিকল্পনাকে ফ্যামিলি ফার্মিং বা পরিবারভিত্তিক কৃষি ধ্বংসের প্রস্তাব বলে মনে করছেন কৃষকরা। তাদের দাবি অতীতে মজুদ নাইট্রেটই এখনও ব্যবহার করে যাচ্ছেন তারা। আর সারের ব্যবহার কমানোর কথা বলা হয়েছে যথাযথ বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই। প্রতিবাদকারীরা কৃষিমন্ত্রী ইয়ুলিয়া ক্ল্যোকনার এবং পরিবেশমন্ত্রী স্ফেনিয়া শুলৎসকে অবিলম্বের পরিকল্পনাটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে কোন আলোচনা করতেও রাজি নন তারা। জার্মান কৃষকরা আপত্তি জানিয়েছেন দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর জোটের সাথে করা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়েও। এর ফলে প্রতিযোগিতা সুবিধা হারাবেন বলে দাবি করেছেন তারা। ভর্তুকির টাকা পায় না কৃষকরা টেকসই ও পরিবেশসম্মত পদ্ধতিতে কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রতিবছর এই খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিচ্ছে ইউরোপ, যার পরিমাণ এখন ৬৮ বিলিয়য়ন ডলার। এর মধ্যে জার্মানি পায় ছয় দশমিক তিন বিলিয়ন ডলার। ভর্তুকির টাকার বড় অংশটিই বৃহৎ ফার্মগুলো পকেটে যায় বলে অভিযোগ করে আসছে কৃষকদের। আন্দোলনকারীদের দাবি প্রতি বছর জার্মানির ৩,৩০০ টি বৃহৎ খামার ১১৪ কোটি ডলার ভর্তুকি নিচ্ছে। যেখানে পরিবারভিত্তিক ২ লাখ কৃষি খামার পাচ্ছে ৭৯ কোটি ডলার। এই ভর্তুকির কারণে বড় কোম্পানিগুলো লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। প্রাণী রক্ষা নাকি কৃষক বনে মুন্সটার প্লাটজের মূল চত্বরে যখন কৃষকদের সমাবেশ চলছে তখন পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছিল আরেকটি গ্রুপ। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন ছবি সম্বলিত প্ল্যাকার্ড। এই আন্দোলনকারীরা মনে করেন সরকার নতুন কৃষি পরিকল্পনা যথাযথ হয়েছে। তাদের মতে, শুধু কৃষক আর মানুষ নিয়ে চিন্তা করলেই হবে না, ভাবতে হবে প্রাণীদের কথা, দিতে তাদের বাঁচার অধিকার। আন্দোলনের মুখপাত্র হাইকো বলেন, ‘‘যাদের কণ্ঠস্বর নেই সেইসব প্রাণীদের জন্য আমাদের কণ্ঠস্বর জাগ্রত করতে হবে। শুধু প্রাণী না, মানুষ, পরিবেশ, জলবায়ু সবকিছুর জন্যই আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে। প্রাণী কিংবা মানুষে দু’পক্ষের উপরই শোষণের ইতি ঘটাতে হবে।” তাঁর মতে বর্তমান যে কৃষি ব্যবস্থা টিকে আছে সেখানে কৃষকরাও উপকৃত হতে পারেন না। মূলত সরকারই লাভবান হয়। এজন্য তাঁর পরামর্শ কৃষকরা নিজেরাও যাতে নিরামিষভোজী হয় এবং প্রাণী খামার গড়ে না তুলে সবজি চাষ করে। তাতে সবাই লাভবান হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..