নোনাপানির ঝুঁকিতে ৪ কোটি মানুষ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা পরিবেশ ডেস্ক : বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও এর জন্য সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্ব ঝুঁকিতে রয়েছে। অঞ্চলভেদে এ ঝুঁকির মাত্রা একেক রকম। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়সহ বিশ্বের বরফের আধারগুলো গলতে শুরু করেছে অনেক আগেই। এ কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত ঝুঁকিও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এ ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশের মতো ব-দ্বীপগুলোতে। বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এই শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জলবায়ুবিজ্ঞানী ও গবেষকেরা দীর্ঘ দিন ধরে এ সতর্কতা দিয়ে আসছেন। সময়ের সঙ্গে এ ঝুঁকি আরও বাড়ছে। ঘনিয়ে আসছে সময়। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিপদ আরও আগেই আসবে। ২০৫০ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের চার কোটি মানুষ সমুদ্রের নোনাপানির ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। আর এই শতাব্দী শেষে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা সাত কোটিতে পৌঁছাবে। বিশ্বের প্রভাবশালী বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে ভয়াবহ এই আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’ থেকে বৈশ্বিক পরিসরে পরিচালিত এ গবেষণার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে সম্প্রতি। ‘ক্লাইমেট সেন্ট্রাল’-এর দুই গবেষক শট কে কাল্প এবং বেনজামিন এইচ স্ট্রাউস যৌথভাবে গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা থেকে নেওয়া স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে বাংলাদেশের বেশকিছু অঞ্চলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষত দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এটি এখনই শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার পর দেশের বরগুনা, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার আবাদি জমি নোনা পানির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আইলার প্রভাবটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে এর মাত্রা ঠিক কেমন, তা নিরূপণে দেশের অভ্যন্তরে তেমন কোনো গবেষণা পরিচালিত হয়নি। একইভাবে উপকূলীয় অন্যান্য এলাকার ক্ষেত্রেও নোনাপানির নেতিবাচক প্রভাব নিরূপণে কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়নি। অথচ এ ধরনের বিশ্লেষণ সমস্যা মোকাবিলার জন্য খুবই জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে কী প্রভাব ফেলবে এবং তা কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে, এ নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা হওয়া দরকার। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেল আইপিসিসি থেকে বিশ্বের সমুদ্র নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তাতেও আশঙ্কার চেয়ে দ্রুত হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়। সেখানেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিপদে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের উপকূলের বেশিরভাগ এলাকায় বেড়িবাঁধ রয়েছে। ওই বাঁধগুলোর গড় উচ্চতা ১২ থেকে ১৫ ফুট। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় এসব বাঁধ যথেষ্ট উঁচু নয়। এসব বাঁধ তিন থেকে পাঁচ ফুট উঁচু করার কাজ চলছে এখন। তবে এসব বাঁধ খুব বেশি কিছু করতে পারবে না। এগুলো অনেকটা ঠেকনা দিয়ে রাখার মতো। তাই এগুলো সত্যিকার অর্থে মূল সংকট, অর্থাৎ জলবায়ু উদ্বাস্তুর স্রোত থামাতে তেমন কার্যকর হবে না। এ কারণে সংকট মোকাবিলার জন্য চাই বনাঞ্চল রক্ষাসহ বিভিন্ন পরিসরে বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা। একই সঙ্গে উষ্ণায়ন রোধে নিজেদের কিছু উদ্যোগ গ্রহণও জরুরি। সবকিছুর জন্য উন্ন বিশ্বের ওপর দায় না চাপিয়ে নিজের কাজটা করা চাই। একই সঙ্গে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে, যে ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বিস্তর কথা হলেও অগ্রগতি সামান্যই। নেচার কমিউনিকেশনে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন বলা হয়, শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো এখনো অঙ্গীকার অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ কমাচ্ছে না। ফলে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। এত দিন ধারণা ছিল, এই শতাব্দীর মধ্যে, অর্থাৎ ২১০০ সালের মধ্যে বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দুই মিটার বাড়বে। নতুন তথ্য বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যেই একই পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে। এত দিন ধারণা ছিল, বিশ্বের ২৫ কোটি মানুষ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে বিপদে পড়বে। কিন্তু নতুন হিসাব বলছে, বিপদে পড়া মানুষের সংখ্যা ৬৪ কোটিতে দাঁড়াবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়তে যাচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো। নেচারে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশ থাকে সাতটি দেশে। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও জাপান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার কারণে এসব দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বিপদাপন্ন হবে। এমন নয় যে, সমুদ্র ঢুকে পড়বে জনপদে। সে শঙ্কা হয়তো বেড়িবাঁধের মতো ঠেকনা দিয়ে আটকানো যাবে। কিন্তু লবণাক্ততা নদীতে বিস্তার পেলে, তা ঠেকানোর কোনো বুদ্ধি কিন্তু নেই। বাংলাদেশের নদী অববাহিকা লবণাক্ততায় আক্রান্ত হওয়াটা কিন্তু এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। এখনো তা বড় আকার না নেয়ায় কারও টনক নড়ছে না। কিন্তু এর বিস্তার সমগ্র কৃষি অর্থনীতিকেই সংকটে ফেলে দেবে। বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ অবস্থায় দ্রুত প্রতিরোধ ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..