সান্ত্বনা পুরস্কারে নদীর কোনো লাভ হবে না

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

নেলসন : নদীকে জীবন্ত সত্তা আখ্যায়িত করে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। যদিও হাইকোর্টের এমন ঐতিহাসিক রায় এই প্রথম নয়। অতীতেও নদীরক্ষায় হাইকোর্টের এমন উদ্যোগ সাধারণ জনগণ দেখেছে। কিন্তু সেই রায়কে সংশ্লিষ্টরা খুব একটা সম্মান দিয়েছে এমন নমুনা জাতির সামনে নেই। নেই যে, তার প্রমাণ বহন শুধু বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু বা তুরাগ নয়, বহন করছে দেশের সব নদ-নদীই। কর্ণফুলীর কথাই ধরা যাক। এই কিছুদিন আগেই তেলবাহী জাহাজ থেকে ছড়িয়ে পড়া তেলে শ্বাস বন্ধ হয়েছিল নদীটির। ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়ে মুমূর্ষুপ্রায় সুরমা। ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ কিংবা কীর্তনখোলার অবস্থাও ভয়াবহ। সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি খবরে পাওয়া যাচ্ছে সুরমার সঙ্গীন চিত্র। বলা হচ্ছে, পচা সবজি ও গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা স্তূপ হয়ে আছে নদীর পাড়ে। স্তূপে প্লাস্টিকের খালি বোতল থেকে শুরু করে পলিথিন, কলার কাঁদিসহ পরিত্যক্ত নানা সামগ্রী পড়ে আছে। ময়লার স্তূপের পাশেই ঘাট। সেখানে আবর্জনার দুর্গন্ধের মধ্যেই গোসল করছেন স্থানীয়রা। সিলেট নগরের বুকে প্রবহমান সুরমা নদীর মেন্দিবাগ এলাকার মাছিমপুর ঘাটে গিয়ে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। শুধু মাছিমপুরই নয়, নগরের নয়টি ঘাট ঘুরে একই রকম চিত্র পাওয়া গেছে। সুরমার ঘাটে ঘাটে ময়লা-আবর্জনা সয়লাব হয়ে রয়েছে। নদীর শ্বাসরোধ করে বসা যে ভাগাড়ের চিত্র পাওয়া গেল, তার পুরোটাই কিন্তু মানবসৃষ্ট। নির্মল হাওয়ার আশ্বাস দিয়ে যে নদী ডাকত একদা, তা-ই এখন দুর্গন্ধে দম বন্ধ করে দিচ্ছে। সে দুর্ভোগ আবার এসে পড়ছে মানুষের ওপরই। কিন্তু কোথাও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সুরমার এসব ঘাটসংলগ্ন মানুষেরা এ পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায়ীদেরই দায়ী করছেন। দায়ী করছেন সিটি করপোরেশনকে। তাদের বক্তব্য, কর্তৃপক্ষের নাকের ডগা দিয়েই এ বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এমনকি ঘাটের শৌচাগারের সরাসরি সংযোগও দেওয়া হয়েছে নদীতেই। অথচ কর্তৃপক্ষ একেবারে নীরব। তাদের যেন কিছুই করণীয় নেই। বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের থাকলেও তরা তা পালন করছে না। এমনকি ঘাট ঘিরে তৈরি হওয়া বাজারের বর্জ্য ফেলার জন্য কোনো ডাস্টবিনের ব্যবস্থাও করেনি তারা। স্থানীয়রা যখন এসব অভিযোগ তুলছেন, তখন সিলেট সিটি করপোরেশন বাজিয়ে চলেছে সেই একই ভাঙা রেকর্ড। তারা বলছে, যেখানে সেখানে ময়লা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সত্য হচ্ছে, কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিজেদের ন্যূনতম কাজটিও তারা করে না। ময়লা ফেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই যদি কাজ হতো, তাহলে তো সুরমা পার নির্মলই থাকত। মানুষকে এ ঘাটগুলোর পাশ দিয়ে নাকে আঙুল চেপে পার হতে হতো না। আর কীর্তনখোলা। বরিশালের এ নদী দখল, দূষণে জেরবার হয়ে আছে। পরিবেশবাদীরা নানা সময়ে এ দখল-দূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানালেও তা যারা শোনার, শোনেনি। স্রোতস্বিনী উন্মুক্ত এই নদীর তীর এমনকি নদীর বিশাল অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে বহু অবৈধ স্থাপনা। শিল্প ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে ক্রমাগত দূষণ করা হচ্ছে নদীর পানি। পরিকল্পিত খননের অভাবে এখন নৌ-যোগাযোগ মারাত্মক সংকটে পড়েছে। প্রায়ই ঢাকা-বরিশাল পথে চলাচলকারী লঞ্চগুলো চরায় আটকে থাকছে। শীতের সময় এ ঘটনা বেশি ঘটে। নদীর সংযোগ খালগুলো মরে যাচ্ছে। এতে পানিসংকটে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। ‘ধান-নদী-খাল’ এই তিনে বরিশাল।’ বরিশালের প্রকৃত পরিচয় তো এটিই। কিন্তু এই তিনই এখন সংকটে। নদী না বাঁচলে, খাল বাঁচে না, আর খাল না বাঁচলে সেচ বিঘিœত হয়ে কৃষিও মরণাপন্ন হয়। ফলে আক্ষরিক অর্থেই আজ বরিশাল পরিচয় ও অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। মজার বিষয় হলো দখল-দূষণের কথা উঠলেই এ ক্ষেত্রে শোনা যায় চিরাচরিত দাওয়াইয়ের কথাটি। বলা হয়, নদীকে দখলমুক্ত করা হবে। দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এমন বক্তব্য দেয়ার পরপর কিছুদিন সেই মতো কিছু তৎপরতাও দেখা যায়। কিন্তু খুব দ্রুতই এ উৎসাহে ভাটা পড়ে। দখলকারীরা কিছুদিন চুপ থাকে। তারপর আবার ফিরে আসে। এটা একটা চক্রের মতো। কিছুদিন আগে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদী দখল করে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলো। হলো তার সরাসরি সম্প্রচারও। কিন্তু এই উচ্ছেদ যখন এক দিক থেকে এগোতে এগোতে অন্যদিকে যায়, তখনই অন্যদিকে গড়ে ওঠে নতুন স্থাপনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ উচ্ছেদ অভিযান দখলবাজের নাম পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই দিতে পারে না। আসা যাক কর্ণফুলী প্রসঙ্গে। চট্টগ্রামের এ নদী দীর্ঘদিন ধরেই সংকটগ্রস্ত। সুরমার মতোই এর পারে গড়ে ওঠা বাজার ও সেখান থেকে আসা বর্জ্যে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে নদীটি। সর্বশেষ কিছুদিন আগে দুটি জাহাজের সংঘর্ষের পর নদীতে ১০ টন জ্বালানি তেল পড়ে, একে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। এতে এর জলজ প্রাণী এবং নদীর পরিবেশ ও প্রতিবেশ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। সর্বশেষ এ ঘটনায় লাইটার জাহাজ দেশ-১-কে ৩ কোটি টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে না হয় বোঝা গেল যে, একটা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দিনে পাঁচ হাজার টন পয়ো ও গৃহস্থালির বর্জ্য পড়ার বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো? কিংবা শিল্প ও চিকিৎসা বর্জ্যের বেলায়ই বা কী হলো? এর বাইরে নদীতে চলাচলকারী নৌযানগুলোর পোড়া তেলে কর্ণফুলীর যে দূষণ, তার সংলগ্ন খালগুলোর যে মরণদশা, তার বিষয়ে কী হলো বা কী হচ্ছে? দূষণের কারণে স্বাস্থ্যগত, জলজ, অর্থনৈতিকসহ নানা ক্ষতির কথা ‘চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দূষণ রোধ, নাব্যতা বৃদ্ধি এবং অবৈধ দখল রোধকল্পে প্রণীত খসড়া মহাপরিকল্পনা’য় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এসব মহাপরিকল্পনা কী করতে পারে, যখন কর্ণফুলী পেপার মিল (কেপিএম), সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, সিইউএফএলের মতো সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানই কর্ণফুলী নদী দূষণের জন্য মূলত দায়ী। কর্ণফুলীর রাজাখালী খালের পানি যখন ভাসমান তেলের কালো ও বালুমিশ্রিত ঘোলাটে দুই ধারায় বিভক্ত, তখন পাশের চাক্তাই খালও একই রূপ নিচ্ছে বর্জ্যের কারণে। চাক্তাই খাল থেকে গৃহস্থালি ও পয়োবর্জ্য মিশ্রিত কালো পানি গিয়ে মিশছে নদীতে। সঙ্গে রয়েছে পলিথিন, প্লাস্টিক এবং নানা অপচনশীল সামগ্রী। সব মিলিয়ে সুরমার মতো সেই একই ভাগাড়ের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে কর্ণফুলীতেও। সরকারের তৈরি করা খসড়া মহাপরিকল্পনায় কর্ণফুলী দূষণের জন্য কেপিএম, পয়োবর্জ্য, গৃহস্থালির বর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, সার ও কীটনাশক, পোলট্রি বর্জ্য ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে মহানগরে ৫০ হাজার স্যানিটারি এবং ২৪ হাজার কাঁচা শৌচাগার রয়েছে। এ ছাড়া ১১টি উপজেলার গরু-ছাগল এবং হাঁস-মুরগির খামারের বর্জ্য নদীতে মেশে। ওয়াসার কোনো সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। এই যখন অবস্থা, তখন সুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ এখনো শুরুই হয়নি। বিষয়টি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়টি পার হয়নি। প্রায় ৭০ লাখ লোকের চট্টগ্রাম নগরে দিনে আড়াই হাজার টন গৃহস্থালি বর্জ্য তৈরি হয়। এত বিপুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নগর কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ খুবই সামান্য। বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহ করা হলেও, তার ডাম্পিং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন স্থানে হচ্ছে, যা নদীর দূষণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিভিন্ন খাল বেয়ে বর্জ্য সহজেই নদীর মুখ খুঁজে নিতে পারেছ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নদীগুলো যেন ভাগাড় হওয়ার জন্যই এসেছিল। যে জনপদকে জল ও নির্মল হাওয়া দিয়ে পুষ্ট করেছিল নদীগুলো, সেই জনপদই খড়গহস্ত হয়েছে তার ওপর। পরিণত করেছে ভাগাড়ে। শুধু ভাগাড়েই নয়, এর অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে সব ধরনের উদ্যোগই নিয়েছে মানুষ। পার দখল করেই আর সে ক্ষান্ত নয় এখন। নদীর উদর, তথা প্রাণটি নিয়েই টানাহেঁচড়া শুরু করেছে। এ অবস্থায় প্রশাসনের করার রয়েছে অনেক কিছুই। কিন্তু কিছু বাণী ও আশ্বাস দেওয়া ছাড়া তেমন কিছুই তারা করছে না। ওহ, না মাঝেমাঝে মহাপরিকল্পনা, উচ্ছেদ অভিযান ইত্যাদি অবশ্য করছে। কিন্তু এর কোনো দীর্ঘমেয়াদি সুপ্রভাব হাজির না থাকায় একে সান্ত্বনা পুরস্কারের বেশি কিছু ভাবাটা সম্ভব নয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..