মুক্তির সংগ্রাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
ইকবালুল হক খান : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ বলেছিলেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি কিন্তু মুক্তি আমরা পাইনি। মুক্তিই যদি পেতাম তাহলে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও আবরার ফাহাদের মতো মেধাবী ছাত্রের এরকম নির্মম মৃত্যু হতো না। আবরারের মতো আরো লক্ষ প্রাণ অকালে ঝরে যেতো না। নুসরাত জাহান রাফি, সোহাগী জাহান তনু, তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী, অভিজিৎ রায়দের অকালে ঝরে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে তার দায়ভার বহন করতে হবে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বর্বর বোমা হামলায় আমাদের ১০ জন শিল্পীকর্মী প্রাণ হারায়। দু’শতাধিক মানুষ পঙ্গুত্বের অভিশাপ নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। হরেণ গোসাই, সুকান্ত, নাহিদ সমীরদের কৃত্তিম পা নষ্ট হয়ে গেছে, তাদেরও কৃত্তিম পা সংযোজন করতে পারছি না। ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর একই রকম নারকীয় কাণ্ডে সেখানেও আমাদের খাজা হায়দার হোসেন, সুদীপ্তা পাল শেলীসহ ৮ জনকে হারাই। যশোর হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য যিনি সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেছেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি ও যশোর জেলার সভাপতি জি এম শাহিদুজ্জাম তিনিও সম্প্রতি মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিও এ হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে একটি প্রহসনের বিচারের মাধ্যমে মামলা থেকে সবাই খালাস পায়। অবশেষে মুফতি হান্নান যশোর হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর উদীচী হত্যাকাণ্ডে পুনর্বিচারের দায়িত্ব নেন এবং সিআইডিকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়। দীর্ঘ ১১ বছর পার হয়ে গেলেও আমরা তার বিচার পাইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৪৮ বছরে ১২৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, শুধুমাত্র ১টি হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে এবং এদেশে বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তাইতো আজ মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারছে না। কয়েকদিন আগে বাড্ডায় গুজব ছড়িয়ে তাসলিমা বেগম নামের এক মাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের রুম থেকে তাকে বের করে পিটিয়ে হত্যা করেছে। প্রধান শিক্ষকও এর দায় এড়াতে পারে না। এভাবে একের পর এক খুন, ধর্ষণ, লুটপাট, সন্ত্রাস সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্প্রতি সরকারদলীয় ছাত্র ও যুব সংগঠনের নৈরাজ্যে ক্যাসিনোকাণ্ডসহ অসংখ্য বেআইনি কাজের চিত্র জনসমক্ষে এসেছে। সরকার এদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে, এ অভিযান অব্যাহত থাকলে দুরাবস্থার পরিবর্তন হতে পারে, অন্যথায় আবারো দুঃশাসন অব্যাহত থাকবে। স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয় নাই, শুরুতেই ভুল ছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে পা রাখার পর প্রথমেই উচিৎ ছিল তাঁর অবর্তমানে যারা মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩১ মিনিটে নিয়াজীর আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করে একটি লাল সবুজের পতাকা, একটি মানচিত্র, জাতীয় সঙ্গীত-রণসঙ্গীত অর্জন করেছিল যারা জাতীয় মুক্তির পরিকল্পনা করেছিল সেই তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলামদের কথা শুনে মুক্তির সংগ্রামের পরিকল্পনা গ্রহণ করা। কিন্তু তিনি তা না করে তৃতীয়পক্ষের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জেনেছেন। তাজউদ্দিন বলেছিলেন, ‘এখন আমাদের প্রথম প্রয়োজন স্বাধীনতার সত্যিকারের ইতিহাস লেখা, অন্যথায় এর খেসারত সমগ্র জাতিকে দিতে হবে।’ তাজউদ্দিনের আরেকটি পরিকল্পনা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মুক্তির আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সঠিক পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করা। সেই কাজটি এখনো পর্যন্ত শুরুই করা যায়নি। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দিনকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মুক্তিযুুদ্ধের সময় বিতর্কিত মন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক আহমদকে কাছে টেনে নেন। তাজউদ্দিন তার নেতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত্যশীল ছিলেন বলেই সেদিন তার নেতার সঙ্গে নেতিবাচক কোনও কিছু করেন নাই। তাজউদ্দিনের অনুপস্থিতে ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরত্রিতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। সেদিন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় তাঁরা বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধু যদি তাজউদ্দিনকে সরিয়ে মোস্তাককে কাছে টানার সেই চরম ভুলের খেসারত সমগ্র জাতি আজও দিয়ে যাচ্ছে। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে তাজউদ্দিনপত্নী জোহরা তাজউদ্দিন আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। আওয়ামী লীগ আবারো সংগঠিত হয়। কিন্তু সে ধারাও তিনি বেশি দিন টিকিয়ে রাখতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর ভুলের কারণে এবং এদেশের বাম রাজনীতিবিদরা চীন ও মস্কোপন্থিতে বিভক্ত হয়ে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এতে করে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকদের জন্য সুবিধা হয়। বামপন্থি প্রগতিশীলরা কার্ল মার্কসপন্থি–এটাই বড় পরিচয় হওয়া উচিৎ ছিল। তাহলে এদেশে বিএনপি-জাতীয় পার্টি, ফিডম পার্টির মতো সংগঠনের জন্ম হতো না। ’৭২ সংবিধান মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত, যার চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে স্বাধীনতা বিরোধীরা এবং ধর্মভিত্তিক রাজনীতি না করার কথা উল্লেখ ছিল। যা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ৫ম সংশোধনের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনঃবহাল করার হয়, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুমতি দেয়া হয়। আমরা আবারো পেছনে ফিরে যাই, অর্থাৎ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের মতো আমাদের বাংলাদেশ গড়ে উঠে। এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উত্থান হয়। এর ফলে গড়ে উঠে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান হয়। উদীচী ছিল তাদের প্রথম টার্গেট। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা তার ধ্বংস করে দেয়। অন্যদিকে সীমাহীন দুর্নীতি, সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ ও ক্যাসিনোর নগরী গড়ে উঠতে থাকে বাংলাদেশে। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় তারা এ অপকর্মগুলো সংগঠিত করে। মাদক কারবার ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কাছে প্রতিদিন লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান মাদক নির্মূলের জন্য এদেশের কিছু ভেষজ মাদক ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ নিষিদ্ধ করেন, যা কিনা রাষ্ট্রীয়ভাবে সারাদেশে বিক্রি হতো। এর পরিবর্তে দেশে প্রবেশ করানো হয় হেরোইন, ইয়াবাসহ বিদেশি মরণঘাতি মাদক। এসব মাদক সেবনের ফলে একদিকে যেমন দেশের যুবসমাজ অকালে ঝরে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিদিন লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যা কিনা আমাদের কয়েক অর্থবছরের বাজেটের টাকা সরকারের পক্ষে যোগান দেয়া সম্ভব হবে। আবরার, ত্বকী, নুসরাত, তনু, সাগর-রুনী, অভিজিৎ, রাজিবরা মৃত্যুর সময় সমগ্র দেশবাসীর কাছে প্রশ্ন রেখেছেন- এরকম একটি বাংলাদেশের জন্য আমাদের ৩০ লক্ষ মানুষ রক্ত দিয়েছেন, ২ লক্ষ ৫০ হাজার নারী তাদের শ্রেষ্ঠ সম্পদ সম্ভ্রম বিসর্জন দিয়েছেন? ভারতবর্ষে মুক্তির সংগ্রাম শুরুর অনেক আগে থেকে মঙ্গলপাণ্ডে, সূর্যসেন, প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম, সত্যেন সেন, রণেশ দাশ গুপ্তরা এদেশে মুক্তির আন্দোলন শুরু করেছেন। অবশেষে ১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীনতা পাই। তবে ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের পাকিস্তান ও হিন্দুদের হিন্দুস্থান বিভক্তি নিয়ে ২টি রাষ্ট্রের আবির্ভাব হয়। জাতি বলতে আমরা বুঝি বাঙালি, সাঁওতাল, গারো, চাকমা, ইত্যাদি। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান কোনও জাতি হতে পারে না। এখানেও শুভঙ্করের ফাঁকি। কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘এটা পাকিস্তান নয়, এটা হচ্ছে ফাঁকিস্তান’- অর্থাৎ তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সেই ফাঁকিটি সমগ্র ভারতবাদীকে দিয়েছেন। বাংলাদেশের জন্ম ১৯৭১ সালে, কিন্তু তারও অনেক আগে বাংলাদেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন রবীন্দ্র-নজরুল ও সুকান্তরা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে....’। নজরুল লিখেছেন- ‘নম নম বাংলাদেশ নম....’। সুকান্ত লিখেছেন- ‘হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ....’। সংস্কৃতির পথ তৈরি করতে রাজনীতিবিদরা সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করেন। বর্তমানে আমাদের সংস্কৃতি অঙ্গনে যারা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তারা রাজনীতিবিদদের পকেটে চলে যান। এটা আমার কাছে একটি হাস্যেকর বিষয় মনে হয়। কারণ সংস্কৃতি হচ্ছে একটি বিশাল বিষয়। উদাহরণস্বরূপ- প্রকৃতি হচ্ছে বিশাল একটি জায়গা, সংস্কৃতি হচ্ছে সেই বিশাল জায়গায় একটি বিশাল অট্টালিকা আর রাজনীতি হচ্ছে সংস্কৃতি নামক বিশাল অট্টালিকার কয়েকটি কক্ষ, সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ তাদের বিশাল অট্টালিকাকে রাজনৈতিক কয়েকটি কক্ষে ঢুকিয়ে দিতে চাচ্ছে, এটা অসম্ভব ব্যাপার। সুতরাং সংস্কৃতিকে এগিয়ে আসতে হবে, এদেশের রাজনীতির পথ তৈরি করতে হবে। আমাদের মুক্তি সংগ্রামের পরিকল্পনা হবে সূর্যসেন-প্রীতিলতা-ক্ষুদিরামদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন, বঙ্গবন্ধু-তাজউদ্দিন-সৈয়দ নজরুলদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা এবং সেইসঙ্গে বর্তমান সরকারের শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখা। আর যেন আবরার, নুসরাত, তনু, সাগর-রুনী, অভিজিৎ রায়দের এভাবে অকালে মরতে না হয়। এদেশে শামীম ওসমান, ওমর ফারুক, শেখ সেলিম, এরশাদ সিকদার, তাহের, বিপ্লব, সম্রাট, শামীম, খালেদ, জিসান, সুব্রত বাইন, কানা জাহাঙ্গীর, সৈয়দ আবুল হোসেনদের জন্ম যেন না হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমরা যেন এদেশে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারি এবং একটি শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে পারি, সেজন্য আমাদের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। উদীচী ও এ ধারার সংগঠনসমূহকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। একদিন আমাদের মুক্তি আসবেই। জয় উদীচী- জয় হোক বাংলার মেহনতি মানুষের। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা মহানগর, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..