বায়ান্নতে উদীচী: রক্তের সাক্ষরে বলিষ্ঠ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
কামাল লোহানী : বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এ পর্যন্ত ১৪ জন নেতাকর্মীকে হারিয়েছে জঙ্গি হামলায়, দুর্বৃত্তের আক্রমণে এবং প্রতিহিংসার শিকার হয়ে। সংগঠনের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী কী যে ঘৃণ্য প্রতিহিংসায় আর নৃশংস নিপীড়নে প্রাণ দিয়েছিল তা তো আমরা সবাই জানি। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পথিকৃৎ সাহিত্যিক, গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রাফিউর রাব্বীর সামাজিক অন্যায় প্রতিরোধে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা তাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্যই তার জ্যেষ্ঠপুত্র ত্বকীর মতো উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে অপহরণ করে নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত নিপীড়ক আজমিরী ওসমানের ‘টর্চার সেল’-এ নিয়ে যাওয়া হয় ৬ মার্চ। দু’দিন ধরে এই ক্ষীণাঙ্গ কিশোরের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছিল তার বিবরণ শুনলে মানুষ মাত্রেই শিউরে ওঠেন। নির্যাতিত কিশোর ত্বকীর ক্ষত-বিক্ষত দেহটি শীতলক্ষ্যার জলে ৮ মার্চ ভেসে ওঠে। সাহসী সংগঠক ও প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা রাফিউর রাব্বী আজও দৃঢ় প্রত্যয়ে সংগ্রামে সক্রিয়। তিনিই ‘সন্ত্রাসবিরোধী ত্বকী মঞ্চ’র আহ্বায়ক। নারায়ণগঞ্জের নাগরিক জীবনে যে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দাপটের সঙ্গে চলছিল তারই আরেক বীভৎস দৃষ্টান্ত বহুল আলোচিত ‘নারায়ণগঞ্জের সাত খুন’। এই ৭ জনের মধ্যে একজন হলেন নারায়ণগঞ্জ বারের প্রখ্যাত আইনজীবী ও উদীচীর জেলা কমিটির অন্যতম সাবেক সহ-সভাপতি চন্দন সরকার। ব্যবহারে অমায়িক, প্রগতি মনের অধিকারী ও সাহিত্যামোদী এই মানুষটি সন্ত্রাসী নূর হোসেন চক্রের চোখে অপরাধী, কারণ কোর্ট থেকে বাড়ি ফেরার পথে তিনি সন্ত্রাসী চক্রের ‘অপহরণ’ দৃশ্য দেখে ফেলেছিলেন। নূর হোসেনরা তাই তাদের কুকীর্তির কোনো প্রমাণ রাখতে চায় নি বলে ২৭ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে তাকেও তুলে নিয়ে গিয়েছিল সড়ক থেকে। তাঁরও লাশ পাওয়া গিয়েছিল অন্য ৬ জনের সঙ্গে শীতলক্ষ্যার জলে। ত্বকী হত্যার তদন্ত হয়েছিল এবং তা গণমাধ্যমেও প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু কিসের ইঙ্গিতে কেন যেন আজ পর্যন্ত ত্বকী হত্যার বিচার হয়নি। আর সাত খুন মামলার বিচারের কাজ শুরু হয়েছিল, রায়ও আপিলে আটকে আছে। ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর জঙ্গি সন্ত্রাসীরা নেত্রকোনায় উদীচী অফিসসংলগ্ন এলাকায় বোমা বিস্ফোরণে হত্যা করে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নেত্রকোনা জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক খাজা হায়দার হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক সুদীপ্তা পাল শেলীকে। সারা শহর চমকে ওঠে। প্রতিবাদে মুখর হয় সকল মানুষ। স্তব্ধ হয়ে যায় যানবাহন। আর তাই প্রতিবছর ঐ দিনে সমস্ত মানুষ সকল কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে অচল করে দেয় নেত্রকোনা শহরকে। অঙ্গিকার গ্রহণ করে জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলন। স্থান যশোর টাউন হল ময়দান। ৪, ৫ ও ৬ মার্চ ১৯৯৯। ৪ মার্চ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং সারাদিনের কর্মসূচি ও সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানমালা চমৎকার সফলতার সাথে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সংগঠনের প্রতিনিধি, পর্যবেক্ষক, অংশগ্রহণকারী লোক ও গণশিল্পী এবং উপস্থিত বিপুল দর্শক আনন্দিত এবং অভিনন্দিত। ৬ মার্চ সমাপনী দিন। সারাদিনে কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যায় আয়োজিত হয়েছিল লোকঐতিহ্যের বাউল গানের আসর। শিল্পীরা এসেছিলেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। যাঁরা অংশগ্রহণ করছিলেন তাঁরা বাদে সবাই দর্শক সারিতে ছিলেন বসে। কিন্তু আচমকা গ্রেনেড বিস্ফোরণে নান্দনিক মঞ্চটি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল আর অংশগ্রহণকারী শিল্পী, আয়োজক, উদীচী কর্মী ও দর্শকদের মধ্য থেকে ১০ জন এই গ্রেনেড বিস্ফোরণে প্রাণ দিলেন। আহত হলেন দুই শতাধিক। যাঁদের অনেকে আজও পঙ্গুত্বের ভারি বোঝা বহন করে দিনাতিপাত করছেন। যাঁরা সেদিন জঙ্গি সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা গ্রেনেড হামলায় প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁরা হলেন- ১। নূর ইসলাম, ২। নাজমুল হুদা তপন, ৩। সন্ধ্যা রানী ঘোষ, ৪। ইলিয়াস মুন্সী, ৫। শাহ আলম বাবুল, ৬। সৈয়দ বুলু, ৭। রতন রায়, ৮। বাবুল সূত্রধর, ৯। শাহ আলম, ও ১০। রামকৃষ্ণ। ১৯৯৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার বাদী হয়ে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এতে বিএনপির শীর্ষ নেতা তরিকুল ইসলামসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়। এরমধ্যে বিএনপি নেতা তরিকুল হাইকোর্টে আবেদনের মাধ্যমে আসামি তালিকা থেকে নিজের নাম খারিজ করিয়ে নেন। ফলে আসামি সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জনে। ২০০৬ সালের ৩০ মে বিশেষ ট্রাইব্যুন্যাল এই মামলার সকল আসামিকে বেকসুর খালাস দেয়। এরপর ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি হান্নান আদালতে উদীচীর যশোর হত্যার সাথে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে। তার স্বীকারোক্তির পর পুলিশ হরকাতুল জিহাদের আরও দুই সদস্যকে আটক করে। ২০০৯ সালে ১৪ দলীয় সরকার ২০০৬ সালের নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। ২০১১ সালের ৪ মে সরকারের দায়ের করা আপিলটি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ গ্রহণ করে ও খালাসপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পুনরায় আত্মসমর্পণের জন্য সমন জারির নির্দেশ দেয়। ২০১১ সালের ২০ জুন এ আদেশ যশোর বিচারিক হাকিম আদালতে পৌঁছালে, ২১ জুন মুখ্য হাকিম আদালত খালাসপ্রাপ্ত ২৩ আসামির বিরুদ্ধে সমন জারি করে। এরমধ্যে ৩ জন আসামি মারা যাওয়ায় ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন বিভিন্ন সময়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পায়। বাকি তিনজন আত্মসমর্পণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ২৪ জুলাই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। বর্তমানে সকল আসামি জামিনে মুক্ত। দুঃখ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ সরকার খালাসপ্রাপ্ত আসামিদের গ্রেফতারের সমন জারির জন্য হাইকোর্টে আপিল করেছিল। ১০ বছর পেরিয়ে আজ ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের বলতে হচ্ছে- উদীচী আজও কোনও বিচার পায় নি। অথচ আসামিরা সবাই জামিনে খালাস। তবে কি উদীচীর যশোর হত্যায় ১০ জনের প্রাণ বিসর্জনের কোনও মূল্য নেই? প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী শুধু যে প্রাণ দিয়েছে তাই নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সত্যেন-রণেশ প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের কর্মতৎপরতা বিস্তৃত। গড়ে উঠেছে ৩৫০টিরও বেশি শাখা। এত শাখা উপমহাদেশের কোনও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছিল বা আছে কিনা আমি জানি না। তবে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজদের শাসন-শোষণকে উপেক্ষা করে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক শোষণের বেড়াজাল ভেঙে সাম্যের পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকারে এগিয়ে চলা এই সংগঠনটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলার মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ‘স্বাধীনতার ইতিহাস প্রতিযোগিতা’র আয়োজন করেছে অতীতে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সকল মানুষের বাসযোগ্য করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলার লড়াইয়ে উদীচী মাঠে-ময়দানে, নগরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে নবজাগরণের গান গেয়ে চলেছে। ১৯৬৮ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলার প্রথিতযশা কৃষক নেতা ও কথাশিল্পী কমরেড সত্যেন সেন তাঁর তরুণ সহযোদ্ধাদের নিয়ে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গড়ে তোলেন। পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সংগ্রামে উদীচী মানুষকে শোষণের বিরুদ্ধে একত্রিত করে। তাই তো ৬৯’র গণঅভ্যূত্থানে নব প্রতিষ্ঠিত উদীচী সংগ্রামের তল্লাটজুড়ে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। সত্তরে গণমানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছে। আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে যখন বাংলার সকল মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তখন উদীচীর শিল্পীরা হারমোনিয়াম ছেড়ে অস্ত্র ধরেছেন এবং রণাঙ্গনে সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে নিঃসঙ্কচিত্তে লড়াই করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে উদীচীর শিল্পী-সংগঠকেরা আদর্শিক রাজনীতির আনুগত্যে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে যেমন আত্মনিয়োগ করেছেন তেমনি দাঁড়িয়েছেন গণসংস্কৃতিকে হাতিয়ার করে। তাই তো ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর যখন সারা দেশ স্তব্দ তখন ১৯৭৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর কেরানিগঞ্জের ইস্পাহানি কলেজ ময়দানে ‘ইতিহাস কথা কও’ গীতিআলেখ্য পরিবেশন করে সেই নিস্তব্ধতাকে ভেঙে দিয়েছিল। আবার ২০১১ সালের ১৭ জুন উদীচী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং বিভিন্ন বাম দলগুলোর যুব সংগঠনের প্রতিনিধি নিয়ে ‘৭২-এর সংবিধানের পুনঃপ্রতিষ্ঠা জাতীয় কমিটি’ গঠন করে। উদ্দেশ্য ছিল সংবিধানে সংযোজিত জেনারেল জিয়াউর রহমানের বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং জেনারেল এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম সম্পর্কিত সংশোধনী সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে এবং বাংলাদেশের ৫৪টি আদিবাসী গোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি আদায় করা। পরিতাপের বিষয় বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধুর দেয়া বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েও ঐ দুই সামরিক জেনারেলের সাম্প্রদায়িক সংশোধনী দুটি আজও বহাল রেখেছে। আর তারই ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সত্ত্বেও এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিভিন্ন রায়ে জামাতে ইসলামকে অপরাধী সংগঠন বলে উল্লেখ করা হলেও, সরকার আজও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অর্থাৎ গোলাম আজম, নিজামী, মুজাহিদ, কসাই কাদের মোল্লা, মীর কাশেম আলী প্রমুখের রায় কার্যকর হওয়ার পরেও যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন আজও সক্রিয় রয়েছে, প্রকাশ্যে ও গোপনে এবং অনুপ্রবেশে। শুধু কি তাই হেফাজতে ইসলামের মতো মাদ্রাসাভিত্তিক একটি সংগঠনও সরকারের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। আর তাদের চাহিদা মোতাবেক পাঠ্যপুস্তকগুলোয় যখন সাম্প্রদায়িকতাভিত্তিক লেখা সংযোজন করা হলো তখন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীও দেশবাসী সকলের সাথে প্রতিবাদে রাজপথে নেমেছিল। প্রকাশ করেছিল বরেণ্য লেখকদের যেসব লেখা বাদ দেয়া হয়েছে তাকে ভিত্তি করে একটি পুস্তিকাও। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ চত্বরে ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যুদ্ধাপরাধী কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসি না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া রায়ের প্রতিবাদে। উদীচী সেখানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং দিনরাতব্যাপী গণআন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সাথে একত্রিত হয়ে গণসঙ্গীত ও গণনাট্য পরিবেশন করে গণজাগরণে জমায়েত মানুষকে আরও বেগবান প্রতিবাদে যুক্ত করেছিল। তরুণ ব্লগারদের সাথে মিশে উদীচী শিল্পীরা শাহবাগ আন্দোলনকে ক্রমশ বলিষ্ঠ রূপ দেয় এবং যুদ্ধাপরাধীদের সব্বোর্চ শাস্তির বিধানে দাবি আদায়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। ২০১৬’র ১৯, ২০, ২১ ফেব্রুয়ারি উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীতশালায় তিনদিনব্যাপী ‘সাম্রাজ্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবাদবিরোধী’ দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক কনভেনশন আয়োজন করে। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়েছিল শিল্পকলার উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। কনভেনশন উদ্বোধন করেন দেশের লড়াকু তিন কমিউনিস্ট নেতা- কামাখ্যা রায় চৌধুরী, জসিমউদ্দীন মন্ডল ও যতীন সরকার। এতে অংশগ্রহণ করে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ এবং চীন ও জাপান। তিনদিনব্যাপী আলোচনা শেষে একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে কনভেনশনে যোগদানকারী সকল প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ নিবেদনের মাধ্যমে ভাষা সংগ্রামের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এই দিনই প্রকাশিত হয় ‘ঢাকা ঘোষণা’। ভাষা আন্দোলন আমাদের গর্ব। ১৯৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারি যে রক্ত দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিউর, সেই রক্তিম পথরেখা অতিক্রম করে আমরা পাকিস্তানি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে লড়েছিলাম। দেশ দখলদারমুক্ত হয়েছে বটে কিন্তু মন ও মানসিকতায় এখনও পরিবর্তন আসেনি। তাই বাংলা ভাষার প্রতি যে উপেক্ষা ও অবহেলা দেখিয়েছিল পাকিস্তানিরা তা থেকে আজ মুক্ত স্বদেশে মাতৃভাষার প্রতি আমাদের যে অনীহা এবং সর্বস্তরে বাংলা চালু করার ব্যর্থতা তা আমাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। তারই প্রতিবাদে অফিস-আদালতে, দোকানপাটে, রাস্তা-ঘাটে ও বাড়ি-ঘরে সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলনের জন্য উদীচী মাসব্যাপী ‘ভাষা অভিযাত্রা’ চালিয়েছিল ২০১৬ সালে। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এই ৫১ বছরে দেশের নানা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যেমন অংশগ্রহণ করেছে তেমনি দেশজ শিল্পের উপেক্ষিত গণশিল্পীদের তুলে এনেছে মঞ্চে। তাঁদের সংগঠিত করে দেশের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে সংরক্ষণ ও সম্প্রচারে তৎপর রয়েছে। কমরেড সত্যেন সেনের গ্রামের বাড়ি সোনারঙ-এ সেখানকার পাইলট স্কুলের সহযোগিতায় কয়েকবছর ধরে ‘সত্যেন মেলা’রও আয়োজন করেছিল। প্রকাশ করেছে সত্যেন সেন স্মারকগ্রন্থ। উদীচীর ৫০ বছরের কার্যক্রম নিয়ে আরেকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু তাই নয় ‘উদীচী বার্তা’ নামে একটি সাংগঠনিক সাময়িকীও প্রকাশ করে থাকে। আছে ‘শিল্পকলা বিদ্যালয়’, গ্রন্থাগার ও পাঠচক্রও। উদীচী এই সুদীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য নাটক, পথনাটক ও যাত্রা মঞ্চস্থ করেছে। কমরেড সত্যেন সেনের লেখা বেশ কিছু গান নিয়ে সিডি প্রকাশ করেছে। এছাড়াও সময়ের ডাকে দেশের যে কোনও সংকটে উদীচী সবসময় প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে আসছে। এবারের ২৯ অক্টোবর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। গ্রহণ করেছে নানা কর্মসূচি। রাজনৈতিক শূন্যতার এই পরিবেশে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যে ভূমিকা উদীচী সে সম্পর্কে সজাগ। তাই সময়ের আহ্বানে সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব দূর করার জন্য সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে উদীচী এগিয়ে যাবে–এটাই আমাদের কামনা। লেখক : সাবেক সভাপতি, কেন্দ্রীয় সংসদ, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..