অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাৎপর্য

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন : শোষণহীন, সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ঊনবিংশ শতাব্দীতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩), ফ্র্রেডারিখ এঙ্গেলস (১৮২০-১৮৯৫)। তাঁদের মতাদর্শকে ধারণ করে কমরেড ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের (১৮৭০-১৯২৪) নেতৃত্বে ১৯১৭ সালে (পুরনো জুলিয়ান বর্ষপঞ্জী অনুসারে ২৫ অক্টোবর, আর নতুন গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জী অনুসারে ৭ নভেম্বর) রাশিয়ায় প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বা রুশ বিপ্লব বলে পরিচিত এই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিকশ্রেণি। মানব-ইতিহাসে মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অবদান যুগান্তকারী। আর কোনো বিপ্লবই অক্টোবর বিপ্লবের মতো সুদূরপ্রসারি ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। পূর্ববর্তী বিপ্লবগুলো থেকে অক্টোবর বিপ্লবের মৌলিক পার্থক্য ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। পূর্ববর্তী বিপ্লবগুলোর মধ্য দিয়ে শোষক বদলালেও, শোষণের জাল ঠিকই থেকে গেছে। ফরাসি বিপ্লবে (১৭৮৯-১৭৯৯) সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার আওয়াজ তোলা হলেও, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। পূর্ববর্তী বিপ্লবগুলো ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব ছিল সুসংগঠিত। অক্টোবর বিপ্লব সমাজব্যবস্থার যে গুণগত উল্লম্ফন ঘটিয়েছে, তা পূর্ববর্তী কোনো বিপ্লবে সম্ভব হয়নি। অক্টোবর বিপ্লব সূচনা করে নতুন যুগের, নতুন সভ্যতার। পুঁজিবাদের ভিত্তিমূলে আঘাত হানে এবং দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয় বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষকে। মানুষের ওপর মানুষের শোষণ দূর হয়, মানুষ পায় মুক্তির স্বাদ। কায়েম হয় শোষিত শ্রমিক শ্রেণির রাজত্ব। এর আগে ১৮৭১ সালে শ্রমিক শ্রেণির প্রথম রাষ্ট্র ‘প্যারি কমিউন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এই রাষ্ট্র মাত্র ৭২ দিন টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছিল। অক্টোবর বিপ্লবের আগে জারশাসিত রাশিয়াকে বলা হতো ‘ইউরোপের পশ্চাৎভূমি’। জারের শাসনামলে ভয়ানক অনাহার, দারিদ্র্য ও অসহনীয় শোষণ ছিল জনগণের নিত্যসঙ্গী। উন্নত শিল্প দূরের কথা, সাধারণ মানের শিল্পও তখন রাশিয়ায় ছিল না। জারশাসিত রাশিয়ায় জনগণের সামান্যতম গণতান্ত্রিক অধিকারও ছিল না। জারের শাসনের ভিত্তি ছিল বৃহৎ জমিদারতন্ত্র। রাশিয়ার বিপ্লবী শক্তিগুলো বিশেষত বলশেভিক পার্টি তথা কমিউনিস্ট পার্টি জার-স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করে। এই গণঅভ্যুত্থান ধীরে ধীরে বিপ্লবে রূপ নেয়। ১৯০৫ সালে যে বিপ্লব গড়ে ওঠে, রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে সেই বিপ্লবকে ব্যর্থ করা হয়। কিন্তু ‘রক্তাক্ত রবিবারে’র অভিজ্ঞতায় বলশেভিক পার্টি জনগণকে নতুন করে সংগঠিত করে। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সংগঠিত বিপ্লবে জার স্বৈরতন্ত্র উৎখাত হয় এবং অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। বুর্জোয়া শ্রেণি নিয়ন্ত্রিত এই সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর সঙ্গে আপস করে বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার পথে অগ্রসর হয় এবং ক্রমশই গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অস্থায়ী সরকার শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখে পড়ে। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর শ্রমিক, কৃষক ও সৈনিকদের সোভিয়েত গড়ে ওঠে। সোভিয়েতগুলোর মধ্যে বলশেভিক পার্টির অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হতে থাকে। ‘সোভিয়েতগুলোর হাতে সমস্ত ক্ষমতা দাও’-এই আহ্বানে বলশেভিক পার্টি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে। ১৯১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত অবরোধে ১০ লাখ খনি, ধাতু আর রেল শ্রমিক অংশ নেয়। শ্রমিকরা বিভিন্ন কারখানায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ১০ অক্টোবর লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২৫ অক্টোবর (৭ নভেম্বর) লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবী রেড গার্ডস পেট্রোগ্রাডে (পরবর্তীকালে লেনিনগ্রাড) বিক্ষোভ শুরু করে। শ্রমিকদের সশস্ত্র অংশ (যা ‘লাল ফৌজ’ বলে পরিচিত) এবং বিপ্লবী সেনারা অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করতে প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে যুদ্ধ-জাহাজ ‘অরোরা’ থেকে ফাঁকা শেল নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে ‘উইন্টার প্যালেস’ (অস্থায়ী সরকার প্রধানের বাসভবন) অভিযান শুরু হয়। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই বিপ্লবীরা পেট্রোগ্রাডের ক্ষমতা দখল করে নেয়। পতন হয় ‘উইন্টার প্যালেসে’র। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে প্রতিবিপ্লবী সেনাদের প্রতিরোধ ভেঙে মস্কো, গোটা রাশিয়া এবং পুরনো জার সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে শ্রমিক শ্রেণি বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে নেয়। বিপ্লবের পরে লেনিনের নেতৃত্বে জনগণের কমিশনারদের পরিষদ নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়। জমি, শান্তি আর রুটির শ্লোগানে বলশেভিকরা জনগণকে সংগঠিত করে। বিপ্লবের পর সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্রুতই উন্নত দেশে পরিণত হয়। বিপ্লব-উত্তর অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে লেনিন ‘নয়া অর্থনৈতিক নীতিমালা’ (ঘবি ঊপড়হড়সরপ চড়ষরপু বা ঘঊচ) প্রবর্তন করেন। দেশের অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী হয়। পুঁজিপতি ও সামন্তপ্রভুদের সেবা করার বদলে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা হয় জনগণের সেবার উদ্দেশ্যে। নির্মম শোষণ থেকে মুক্তি পায় শোষিত-বঞ্চিত সব শ্রেণি। প্রত্যেক নাগরিকের জন্য নিশ্চিত করা হয় কাজ, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সাধারণ মৌলিক চাহিদা। এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য আসে। নতুন নতুন শিল্প গড়ে ওঠে। কিছু দিনের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয়। ১৯২৯-৩৩ সালের মহামন্দায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত পুঁজিবাদী দেশ আক্রান্ত হয়ে পড়লেও, এই মহামন্দা সোভিয়েত ইউনিয়নকে স্পর্শ করতে পারেনি। পশ্চাৎপদ সামন্তবাদী দেশ থেকে আধুনিক দেশে, ছোট শিল্পের দেশ থেকে বৃহৎ শিল্পের দেশে পরিণত হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। সমাজতন্ত্র সকলের জন্যই প্রয়োজনীয় পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দেয়, মানুষকে দীর্ঘ আয়ু দান করে, নারীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রমিকসহ মেহনতি মানুষকে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান এবং বঞ্চিত ও নিপীড়িত জাতিসমূহকে মুক্ত করে। সব ধরনের পশ্চাৎপদ-প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি যেমন গৌষ্ঠীবাদ, বর্ণবাদ, জাতীয়তাবাদ, সংকীর্ণতাবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা হয়। প্রতিক্রিয়াশীলতা, ভোগবাদ, কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে ব্যাপক সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটানো হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন সৃষ্টি করতে থাকে ‘নতুন মানুষ’। প্রলেতারিয়েতের মধ্যে নতুন চেতনা, মূল্যবোধ ও আত্মমর্যাদার উন্মেষ ঘটে। নিপীড়িত মানুষের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। শুধু শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেই নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রেও ঘটে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চাকে অগ্রসর করা হয়। মহাকাশকে স্পর্শ করে স্পুটনিক। ১৯৫৯ সালে মহাশূন্যে প্রথম পাড়ি দেয় সোভিয়েত নভোচর ইউরি গ্যাগারিন। সব মিলিয়ে সোভিয়েত ব্যবস্থা উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা দিতে এবং গোটা বিশ্বকে দারুণভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই সাফল্য ও অগ্রগতির পথ সহজ ছিল না। সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের কাজ শুরু করার আগেই অক্টোবর বিপ্লব প্রতিবিপ্লবী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে। আত্মপ্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই অন্তত ১৪টি সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী দেশের সামরিক বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নকে অবরুদ্ধ করে। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় দেশের অভ্যন্তরের ক্ষমতাচ্যূত শাসকশ্রেণির অনুগত শ্বেত সেনাবাহিনী। বেঁধে যায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। চার বছরের গৃহযুদ্ধের পর শেষ পর্যন্ত ‘লাল ফৌজ’ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ধ্বংস করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ‘লাল ফৌজে’র হাজার হাজার যোদ্ধাকে প্রাণ দিতে হয়। সোভিয়েত বিরোধী চক্রান্ত ঘৃণ্যরূপ ধারণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সময়। কিন্তু কমরেড জোসেফ স্তালিনের (১৮৭৮-১৯৫৩) নেতৃত্বে সোভিয়েত ‘লাল ফৌজে’র বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কাছে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল হিটলারের বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। তিন কোটি মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন রক্ষা করে বিশ্বকে, মানব সভ্যতাকে। মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব এবং তার সংগ্রামের জন্যই মানবজাতির মহাবিপদ ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করা সম্ভব হয়। মহান অক্টোবর বিপ্লব এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েতের বিজয়ের প্রভাব ছিল বিশ্বব্যাপী। অক্টোবর বিপ্লবের প্রভাবে দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম তীব্রতা লাভ করে। বেগবান হয় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই। ভারবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনকেও অক্টোবর বিপ্লব প্রভাবিত করে। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা অক্টোবর বিপ্লব দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। এঁদের অনেকেই নবগঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতায় এশিয়া, আফ্রিকার শতাধিক দেশ রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে। সদ্য স্বাধীন এসব দেশের জাতীয় অর্থনীতির পুনর্গঠনেও সোভিয়েত ইউনিয়ন আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় নয়া ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর পক্ষে দাঁড়িয়েছে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের উজ্জ্বল ও বলিষ্ঠ ভূমিকা, সহযোগিতা বিশেষভাবে স্মরণীয়। অক্টোবর বিপ্লবের সাফল্য দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পুঁজিবাদী দেশের সরকারগুলো অনেক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি চালু করতে বাধ্য হয়। অক্টোবর বিপ্লবের প্রেরণায় দেশে দেশে শ্রমিকশ্রেণির সঙ্গে কৃষকের মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় হয়। চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আত্মপ্রকাশ করে সমাজতান্ত্রিক শিবির। দুনিয়াকে চমকে দিয়েছিল মহান অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। পৃথিবীতে এমন কোনো চিন্তাশীল মানুষ পাওয়া যাবে না, যিনি অক্টোবর বিপ্লব দ্বারা কোনো-না-কোনো ভাবে প্রভাবিত হননি। আইনস্টাইন, রমাঁ রঁল্যা, বার্নাড শ, চার্লি চ্যাপলিন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত, জসীম উদ্দীন, জওহরলাল নেহেরু-মার্কসবাদী কিংবা অমার্কসবাদী সবাইকেই আলোড়িত করেছে অক্টোবর বিপ্লব। ১৯৩০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের পর ‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩১) গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) লেখেন : ‘আপাতত রাশিয়ায় এসেছি-না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত। ... যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা সমান করে জাগিয়ে তুলেছে।’ সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকে রবীন্দ্রনাথ ‘সব চেয়ে বড় ঐতিহাসিক যজ্ঞের অনুষ্ঠান’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন, ‘সর্বত্রই লক্ষ করেছি এদের চিত্তের জাগরণ এবং আত্মমর্যাদার আনন্দ।’ ১৯২০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য থিওরি এ্যান্ড প্র্যাকটিস অব বলশেভিজম’ গ্রন্থে বার্টাল্ড রাসেল (১৮৭২-১৯৭০) বলেন : ‘কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার যে মহৎ উদ্যোগ রাশিয়াতে নেয়া হয়েছে, তার জন্য মানবজাতির সকল অংশ চিরকাল কৃতজ্ঞ থাকবে।’ ইংল্যান্ডে ডিন অব ক্যানটারবারি-খ্রিস্টধর্মের প্রধান যাজক রেভারেন্ট হিউলেট জনসন স্তালিনের মৃত্যুতে গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘যিশুখ্রিস্ট যা করার কথা বলেছিলেন, সোভিয়েত জনগণ স্তালিনের নেতৃত্বে ঠিক তা-ই করেছে।’ লেখক শিবরাম চক্রবর্তী বলেছেন, ‘শ্রীকৃষ্ণের গীতার চেয়ে কার্ল মার্কসের গীতা বড়, কেননা এই গীতা আজকের জীবনে সত্য হয়ে উঠেছে। ...সব্যসাচীর জ্ঞাতিবিরোধের কুরুক্ষেত্রের চেয়ে লেনিনের শ্রেণিবিরোধের কুরুক্ষেত্র ঢের বড়-আদর্শের দিক দিয়ে, মহত্ত্বের দিক দিয়ে, সম্ভাবনার দিক দিয়ে। জগতের দুঃখে বুদ্ধদেব কেঁদে আকুল হয়ে কঠোর বাস্তবের হাত থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছিলেন, কিন্তু লেনিনকে আমি বুদ্ধের চেয়েও বড় বলব এই জন্য যে, তিনি তাঁর কঠোরতম বাহুর দ্বারা এই কঠিন বাস্তবকে ভেঙে নতুন করে গড়তে পেরেছেন।’ অক্টোবর বিপ্লব হচ্ছে বর্তমান বৈপ্লবিক রাজনীতির জ্ঞান, চেতনা ও বোধের ভিত্তি। এই বিপ্লবের বহুমাত্রিক প্রভাব মানব সভ্যতাকে নতুন এক উন্নত পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অক্টোবর বিপ্লবের সাফল্য আন্তর্জাতিকতাবাদকে শক্তিশালী করেছে। সমস্ত বিপ্লবী ও প্রগতিশীল শক্তির কাছে অক্টোবর বিপ্লব অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। অক্টোবর বিপ্লব মানবসমাজকে দেখিয়েছে যে, পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অক্টোবর বিপ্লবের মহান আদর্শ, সমাজতন্ত্রের মহান নীতিগুলো আজও অম্লান। পুঁজিবাদের বিকল্প পথকে আলোকিত করে চলেছে অক্টোবর বিপ্লব। সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ষড়যন্ত্র ও নানা বিচ্যুতির কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় ঘটেছে। এই বিপর্যয়ের পর অক্টোবর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে উঠে এসেছে। যেখানে চলছে সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া দাপট, সেখানে অক্টোবর বিপ্লব নতুন শক্তি নিয়ে খুবই প্রাসঙ্গিক, অনেক বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সোভিয়েত-উত্তর এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য বেড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ আধিপত্যের জন্য আগ্রাসী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ধংসাত্মক সংঘর্ষ চাপিয়ে দিয়েছে। বিশ্বপুঁজিবাদী ব্যবস্থা এখন গভীর সংকটে। একবিংশ শতাব্দীতে নয়া উদারনীতি গোটা পৃথিবীতে বৈষম্য বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ৬৬টি ধনী পরিবারের কাছে যে সম্পদ আছে, তা ৩৫০ কোটি মানুষের মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। পুঁজিবাদী দেশগুলোতে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ মুভমেন্ট, ‘ধনী ১ শতাংশের বিরুদ্ধে ৯৯ শতাংশের’ লড়াই ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। দেশে দেশে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই তীব্রতর হচ্ছে। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ভেতর থেকেই শক্তিশালী লড়াই গড়ে উঠছে। সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য এখন হুমকির মুখে। পুরো পশ্চিমা বিশ্বে সমাজতন্ত্র ধীরে ধীরে জায়গা দখল করতে শুরু করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তরুণদের মধ্যে সমাজতন্ত্র এখন ভীষণ জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্যালাপে’র করা সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ১৮-১৯ বছর বয়সী মার্কিনদের মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ সমাজতন্ত্রকে সমর্থন করেন এবং পুঁজিবাদকে সঠিক পন্থা বলে তারা মনে করেন না। আমেরিকান চ্যানেল ‘ফক্স নিউজে’র এক জরিপে দেখা গেছে-প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানদের ৩৬ শতাংশ মনে করেন, আমেরিকার এখন পুঁজিবাদ থেকে সরে এসে সমাজতন্ত্রের পথে যাওয়া উচিত। শ্রমিক শ্রেণির মননে, চিন্তায়, প্রতিদিনের লড়াইয়ে অক্টোবর বিপ্লব এখনও জীবন্ত। যতই দিন যাচ্ছে অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তাৎপর্য ততই বাড়ছে। অক্টোবর বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু অক্টোবর বিপ্লব যে স্বপ্ন দেখিয়েছে এবং দেখিয়ে চলেছে, তা বেঁচে থাকবে চিরকাল। অক্টোবর বিপ্লবের শিক্ষা ও প্রেরণা আমাদের চলার পথের পাথেয়। ‘সময় যত পেরোবে, তত স্পষ্ট হবে অক্টোবর বিপ্লবের গুরুত্ব ও তাৎপর্য’-লেনিনের এই কথাটা এখন অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। লেখক : প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..