শিকাগো বয়েজ এবং চিলির উদারনীতিবাদের গোড়াপত্তন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

তাহসীন মল্লিক : লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি ও বেড়ে চলা আর্থিক বৈষম্যের প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন চিলির সাধারণ মানুষ। পুলিশ আর সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ যায় ১৭ জনের। ২০১৭ সালে মধ্য বামপন্থি জোট সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেবাস্তিয়ান পিনিয়েরা। সম্প্রতি মেট্রো ভাড়া অত্যধিক হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় পিনিয়েরা সরকার। তার প্রতিবাদেই রাস্তায় নামেন দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশের লাখো মানুষ। লুটতরাজ আর বিক্ষোভ সামলাতে সেনা নামাতে হয় পিনিয়েরাকে। চিলির বিক্ষোভ আসলে পিনিয়েরার নয়া উদারনীতির বিরুদ্ধে। প্রায় ৩০ বছর ধরে যা দিন দিন বিষিয়ে তুলেছে চিলির নাগরিকদের। যার গোড়াপত্তন হয় আজ থেকে ৪৭ বছর আগে। ৪৭ বছর আগে চিলির সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়। অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেনা কর্মকর্তা আগাস্তো পিনোশে। ক্ষমতা দখল করেই চিলির বাম ঘরানার ওপরে উৎকট দমন নিপীড়ন চালান পিনোশে। অথচ ১৯৭৩ সালে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দে ছিলেন পৃথিবীর সর্বপ্রথম নির্বাচিত সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রেসিডেন্ট। আলেন্দেকে হত্যার আগে আতাকামা মরুভূমিতে বন্দী করে রাখে পিনোশে। যেখানে আলেন্দের সঙ্গী ছিল স্যোশালিস্ট পার্টির কয়েক হাজার কর্মী ও সমর্থক। তাদের নিপীড়নে গঠিত হয়েছিল সিক্রেট পুলিশবাহিনী ‘দিনা’। পিনোশে চিলির অর্থনীতি ছেড়ে দেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গ্র্যাজুয়েটের হাতে। ইতিহাস যাদের শিকাগো বয়েজ নামে পরিচিত করেছে। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেল জয়ী অধ্যাপক মিল্টন ফ্রিডম্যানের অধীনে ১৯৭০-৮০ পর্যন্ত পিএইচডি ডিগ্রিসহ উচ্চশিক্ষা নেয় তারা। মিল্টন ফ্রিডম্যানের হাত ধরে একেক জন হয়ে ওঠেন মুক্তবাজার অর্থনীতি আর বেসরকারিকরণের তল্পিবাহক। ফ্রিডম্যানের তত্ত্বের জন্য চিলিকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করেন তারা। ১৯৫০-এর দশকেই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর সারা বিশ্বে মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং নয়া উদারবাদের প্রসারে এক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৫৭ সাল নাগাদ ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও রকফেলার ফাউন্ডেশনের যৌথ অর্থায়নে চিলির এক দল শিক্ষার্থী নিয়ে সেই কার্যক্রম শুরু হয়। কার্যক্রমের অধীনে শতাধিক শিক্ষার্থী প্রথমে চিলির একটি শিক্ষানবিশ প্রোগ্রামে এবং পরে শিকাগোতে স্নাতকোত্তর করে। প্রকল্প থেকে গ্র্যাজুয়েট শিকাগো বয়েজদের মধ্যে প্রায় ২৬ জন চিলির বিভিন্ন অর্থনৈতিক দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ থেকে শুরু করে ২০১১ পর্যন্ত শিকাগো বয়েজদের আধিপত্য বিরাজ করে চিলির মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে সকল রাষ্ট্রীয় দপ্তরে। পিনোশের মন্ত্রীসভায় শিকাগো বয়েজদের মধ্যে জর্জ কাওয়াস প্রথম অর্থমন্ত্রী হন। মন্ত্রীসভায় আরোহন করেই তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি আত্মীকরণ আর সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণে লিপ্ত হন। তার হাত ধরেই চিলি প্রবেশ করে মার্কিন নব্য সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পে। এরপর ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ মেয়াদে চিলির অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট কুখ্যাত অর্থনীতিবিদ সার্জিও ডিকাস্ত্রো স্পিকুলা। তার সময়ে সংগঠিত হয় ঐতিহাসিক ‘ক্রাইসিস অব ১৯৮২’। পিনোশের সামরিক স্বৈরশাসনের সময় গ্রহণ করা নব্য উদারনৈতিক সংস্কারের ফলে বড় অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয়। ১৯৩০ দশকের মহামন্দার পরে যা চিলির সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকট ছিল। মন্দার সময় চিলির জিডিপি কমে দাড়ায় ১৪.৩%, এবং বেকারত্ব বেড়ে হয় ২৩.৭%। এর পর একে একে অর্থমন্ত্রী হন পাবলো বারানোয়া, হারনান বুচির মত কুখ্যাত সব অর্থনীতিবিদ। যাদের মধ্যে হারনান বুচির আমলে চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণের আওতায় আনা হয়। এবং স্বাস্থ্য বীমা বেসরকারিকরণের মতো ভয়াবহ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এর পর চিলিতে বাড়তে থাকে বেকারত্ব, ধনী-গরিব বিভেদ। এত সব অসন্তোষ বাড়লেও পিনোশে সহজে ক্ষমতা ছাড়েননি। এরপর ১৯৮৭ সালে চিলি জুড়ে এক গণভোট হয়। বেশির ভাগ মানুষ পিনোশেকে প্রত্যাখ্যান করলে তিনি ১৯৯০ সাল নাগাদ ক্ষমতা ত্যাগ করেন তিনি। তবে এরপরও চিলির সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে আরো ৮ বছর তিনি সক্রিয় ছিলেন। গণতান্ত্রিক চিলিতে পিনোশের প্রভাব তখনো ছিল অপরিসীম। একই সাথে অপরিসীম প্রভাব ছিল শিকাগো বয়েজদেরও। এরপর ২০১১ সাল পর্যন্ত পালাক্রমে আলভারো বার্দেন, হুয়ান কার্লোস মান্দেজ, এমিলিও সানফুয়েন্টেস, রল্ফ লেডার, ফ্রান্সিসকো রোজান্ডে, মিগুয়েল কাস্ট, জুয়ান আরিজাতিয়াম্যাট, মারিয়া তেরেসাইন ফান্তে, ক্যামিলো ক্যারাসকো আলফোনসো, জোয়া কানলাভান, ক্রিশ্চিয়ান ল্যারোলেট উইগানউ, জুয়ান আন্দ্রেস ফন্টেইনের মত প্রভাবশালী শিকাগো গ্র্যাজুয়েটরা চিলির অর্থমন্ত্রণালয়সহ সকল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রসমূহে অধিষ্ঠিত ছিলেন। কুখ্যাত এসব অর্থনীতিবিদ চিলির অর্থনীতিকে এমন অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছেন যে চিলির অর্থনৈতিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র আলাদা। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-র হিসেব বলছে, পৃথিবীর ৩০টি ধনী রাষ্ট্রের মধ্যে চিলিতেই আর্থিক বৈষম্যের হার সব থেকে বেশি এবং গত কয়েক বছরে এই বৈষম্য আরও বেড়েছে। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে এই বিপুল ফারাকের পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস ও পরিসেবার খরচ ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে সাধারণ মানুষের মনে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..