লাতিন আমেরিকা জুড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থার পরাজয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : লাতিন আমেরিকা জুড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে জনগণ। ইতিমধ্যে আর্জেন্টিনায় শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে নয়া উদারবাদবিরোধী শক্তি। প্রতিবেশী দেশ উরুগুয়েতেও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে নাগরিকরা। উরুগুয়েতে প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে প্রাথমিক গণনায় ব্রড ফ্রন্টের জয় নিশ্চিত হয়েছে। ব্রড ফ্রন্ট ‘বামঘেঁষা’ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই পরিচিত। তবে ব্রড ফ্রন্টকে চূড়ান্ত রাউন্ডে পড়তে হবে কঠিন লড়াইয়ের মুখে। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বড় চমক ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেশ কলম্বিয়ার স্থানীয় নির্বাচনে উরিবের উগ্র দক্ষিণপন্থিদের পরাজয়। এমনকি রাজধানী বোগোতাসহ বড় শহরগুলির মেয়র পদে মধ্য-বামপন্থিদের জয় নিশ্চিত হয়েছে। উত্তরপশ্চিমের শহর তারবাকোতে নির্বাচিত হয়েছেন ক’দিন আগে রাজনীতির মূল স্রোতে আসা মার্কসবাদী গেরিলা গোষ্ঠী ফার্কের প্রাক্তন গেরিলা কমান্ডার জুলিয়ান কনরাদো। আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আসলে ছিল নয়া উদারবাদের বিরুদ্ধে এক গণভোট। প্রচার শেষে ‘মডারেট’ পেরনবাদী আলবার্তো ফার্নান্দেজের আবেদন ছিল, ‘চারবছর আগে যে কলঙ্কের পাতা লেখা শুরু হয়েছে, তার অবসানের জন্য এই নির্বাচন।’ দেওয়াল লিখনে ছিল ‘বিপর্যয়ের নাম মাকরি, ভোট দিন মাকরি-বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে।’ সাবেক রাষ্ট্রপতি মোরিসিও মাকরি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। চার বছরে যাঁর শাসন আমলে আর্জেন্টিনা বারবার দ্বারস্থ হয়েছে আইএমএফ’র কাছে। ৫,৭০০ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে মাকরির সরকার। এই সময়ে দারিদ্রের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৪ শতাংশ, গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধির হার ৮.১ শতাংশ। প্রতি চারটি পরিবারের মধ্যে একটি পরিবারের নিত্যদিনের খাবারটুকু কেনার পর্যন্ত সামর্থ্য নেই। বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ১০.৬ শতাংশ, তরুণদের মধ্যে আরও বেশি, ১৯.৩ শতাংশ। বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৫০ শতাংশের উপরে। প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে ৯৬ শতাংশ ভোট গণনার শেষে আইনজীবী ও প্রাক্তন মন্ত্রী আলবার্তো ফার্নান্দেজ পেয়েছেন ৪৮.০৩ শতাংশ ভোট। বিপরীতে মাকরির পক্ষে সমর্থনের হার ৪০ শতাংশ। আর্জেন্টিনার সংবিধান অনুযায়ী, কোনও প্রার্থী ৪৫ শতাংশ ভোট পেলে, অথবা ৪০ শতাংশ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় দশ শতাংশের ব্যবধান থাকলে, প্রথম রাউন্ডেই তাকে সরাসরি নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হবে। মাকরি তাই পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। ফল ঘোষণা হতেই বুয়েনস আয়ার্সের রাস্তায় নেমে পড়েন ফার্নান্দেজের সমর্থকরা। দলের সদর দপ্তর থেকে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মর্যাদার সঙ্গে আমরা বিশ্বের দরবারে প্রবেশ করতে চাই। সরকার ফিরেছে জনগণের হাতে!’ তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য, আমাদের অঙ্গীকার আরও সমতার আর্জেন্টিনা নির্মাণ। এদিকে ‘গঠনমূলক বিরোধিতার’ কথা জানিয়েছেন মাকরি। এদিকে ফল ঘোষণার পরেই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ডলার কেনার উপর কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করেছে। মাসে সর্বোচ্চ ২০০ ডলার পর্যন্ত কেনা যাবে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে, নগদে হলে ১০০ ডলার, যেখানে আগে ছিল ১০,০০০ ডলার। ব্যাঙ্কের দাবি, দেশের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখতেই এই পদক্ষেপ। লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কট নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফার্নান্দেজ ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে দেখা করেছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মাকরির সঙ্গে। ১৯৮৩’তে দেশে গণতন্ত্র ফেরার পর ফার্নান্দেজ হতে চলেছেন দেশের নবম রাষ্ট্রপতি। যিনি নিজেকে ‘একজন বামপন্থি-উদারবাদী, একজন প্রগতিশীল-উদারবাদী’ বলতে বেশি পছন্দ করেন। ‘আমি একজন পেরনবাদী এবং পেরনবাদী প্রগতিশীল উদারবাদের সূচনা করাই আমার কাজ।’ নির্বাচনী প্রচারের সময় জানিয়েছিলেন তাঁর সরকার হবে অনেকটা মেক্সিকো এবং উরুগুয়ের মতো। ফার্নান্দেজের সঙ্গেই উপরাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ, রাষ্ট্রপতি নেস্টর কির্চানারের জীবনাবসানের পর মাকরির আগে পর্যন্ত যিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি। এদিকে উরুগুয়েতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শাসক বামপন্থা-ঘেষা জোট ব্রড ফন্টের প্রার্থী দানিয়েল মার্তিনেজ জয়ের পথে রয়েছেন। ২৭ অক্টোবর প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার শেষে মার্তিনেজ পেয়েছেন ৪০ শতাংশ ভোট, যা সরাসরি জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। আগামী মাসে চূড়ান্ত রাউন্ডের নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে মার্তিনেজকে। এবং যা হবে বেশ কঠিন লড়াই। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ন্যাশনাল পার্টির প্রার্থী, প্রাক্তন সিনেট-সদস্য লুই লাকালে পউ পেয়েছেন ২৯.৬৮ শতাংশ ভোট। চূড়ান্ত রাউন্ডে মার্তিনেজের লড়তে হবে লাকালের সঙ্গে। তিন নম্বরে রয়েছেন কলোরাদো পার্টির আর্নেস্তো তালভি, সমর্থনের হার ১২.৭ শতাংশ। চার-নম্বরে নব্য দক্ষিণপন্থি দল ওপেন কাবিলদোর প্রার্থী গুইদো মানিনি, পেয়েছেন ১১.৩ শতাংশ ভোট। ২০০৫ থেকে উরুগুয়েতে ব্রড ফ্রন্টের সরকার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সঙ্গেই উরুগুয়েতে হয়েছে সংসদের দুই কক্ষ ৯০ সদস্যের প্রতিনিধিসভা এবং ৩০ সদস্যের সিনেটের নির্বাচন। সিনেটে কোনও দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ব্রড ফ্রন্ট পেয়েছে ১৩টি আসন, ন্যাশনাল পার্টি ১০, কলোরাদো ৪ এবং কাবিলদো ৩টি আসন। প্রতিনিধিসভায় আসন সংখ্যা যথাক্রমে ৪১, ৩১, ১৩ এবং ১। ক’দিন আগেই বলিভিয়ায় রাষ্ট্রপতি হিসাবে পুনর্র্নিবাচিত হয়েছেন ইভো মোরালেস। তাকে হটানোর জন্য ওয়াশিংটনের মদতে শুরু হয়েছে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র। এদিন আলবার্তো ফার্নান্দেজের জয়কে শুভেচ্ছা জানানোর সঙ্গেই বলিভিয়ার নির্বাচনে বাইরের হস্তক্ষেপ না করার কথা বলেছে চীন। ফার্নান্দেজকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মোরালেস। অভিনন্দন জানিয়েছেন ভেনেজুয়েলা, কিউবা থেকে এল সালভাদোরের রাষ্ট্রপ্রধানরা। কলম্বিয়াতে ১,১১০টি মেয়র পদের সঙ্গেই হয়েছে ৩২টি গভর্নর পদে নির্বাচন। প্রাথমিক ফল ঘোষণায় উগ্র দক্ষিণপন্থি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আলভারো উরিবের দল ডেমোক্রেটিক সেন্টার পার্টির প্রার্থীরা রাজধানী বোগোতাসহ কালি, বারানকুইলা, মেদেলিন, কুকুতার মতো শহরগুলির মেয়র পদে পরাস্ত হয়েছে। বোগোতায় ৩৫.২ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন মধ্য-বামপন্থি ৪৯ বছরের ক্লদিয়া লোপেজ। এই প্রথম রাজধানীর মেয়র হয়েছেন একজন নারী, যিনি নির্বাচিত হয়েছেন সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে। মধ্য-বামপন্থি প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন কালি, কুকুতার মতো শহরে। এমনকি উরিবের একসময়ের শক্ত ঘাঁটি মেদেলিনে পরাস্ত হয়েছেন তাঁর প্রার্থী।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..