লাতিন ফিরছে চেনা ছন্দে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মীর মোশাররফ হোসেন : তিন বছরে তিনবার লাতিন আমেরিকা সফরে করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি- উদ্দেশ্য ছিল হরেক। এদের মধ্যে মূল উদ্দেশ্য ছিল ভেনেজুয়েলার সোশালিস্ট সরকারের ‘ডানা কেটে দেওয়া’। না কোনো রাখঢাক করেননি, প্রতিবারই গণমাধ্যমকে তার আসল উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন। বলেছেন, কেন নিকোলাস মাদুরো এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা মার্কিনের জন্য হুমকি, সেসব কথা। একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় কারাকাসের অবস্থা এমনিতেই বেহাল। মুদ্রাস্ফীতি প্রবল, ব্যবসা বাণিজ্য সঙ্গীন। তার ওপর সাম্প্রতিক সময়ে পেন্টাগন দেশটিতে তুমুল অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পুতুল বিরোধীদলীয় নেতাকে দিয়ে সামরিক বাহিনীকে বারবার উস্কে দেওয়া হচ্ছে; একের পর এক সাইবার অ্যাটাক হচ্ছে দেশটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, সোশালিস্ট সরকার যেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা ভেনেজুয়েলার রিজার্ভ সোনা ফেরত নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা করা হয়েছে; আশপাশের ডানপন্থি সরকারগুলোকে দিয়ে একের পর এক স্যাবোটাজ চালানো হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী মিথ্যা প্রচার হয়েছে, কারাকাসের তেল বিক্রিতে সর্বোচ্চ বাধা দেওয়া হচ্ছে; মাদুরোকে হত্যায় একের পর এক চেষ্টা চলছে। কিন্তু এতসব চেষ্টা যেন ঠেকিয়ে দেয়ার পণ করে বসে আছে ভেনেজুয়েলার জনগণ। তারা মাদুরোর সঙ্গে আছে, ঠিক যেমনটা ছিল তার পূর্বসূরী হুগো শ্যাভেজের সঙ্গে। শ্যাভেজকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গিয়েছিল মার্কিন মদদপুষ্ট ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর একটা অংশ। জনগণ যেন তা না জানে, তার ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু শ্রমজীবী, মেহনতি সাধারণ মানুষের হার না মানা জেদে সেই ষড়যন্ত্র উবে গিয়েছিল। জনগণ রাস্তায় নেমে শ্যাভেজের প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেছিল। মাদুরোর ডাকেও গত দুই বছর আমরা কারাকাসের রাস্তায় রাস্তায় বেশ কয়েকবারই এমন লাখো মানুষের উৎসব দেখেছি। বিরোধীদের কয়েক হাজার জমায়েতের ছবি পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোতে ‘ম্যাসিভ ফোকাস’ পেলেও তার চেয়ে ১০-১২ গুণ বড় বড় জমায়েত হয়েছিল মাদুরোর আহ্বানে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে সেইসব ছবি ও ভিডিও দুনিয়াজোড়া লোক দেখেছে; বুঝেছে- জাতিসংঘসহ নানান বৈশ্বিক তাঁবেদারি সংস্থা থাকলেও, তাদের এত এত নিয়ম-নীতিকথার ফুলঝুড়ি থাকলেও কি নির্লজ্জভাবে একটা সার্বভৌম দেশের সরকারকে উৎখাতে মার্কিনিরা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে, তার স্বরূপ। মাইক পেন্সের সেই ‘ডানা কেটে দেওয়া’র উদ্দেশ্য অবশ্য এমনি এমনি তৈরি হয়নি। সোভিয়েত বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে মার্কিন পুঁজিবাদ এক দশকও বগল বাজাতে পারেনি; তার আগেই লাতিনের বাম ঝড় ‘লাল ঝাণ্ডার’ পুনরুত্থানের এলান জারি করে দেয়। আগের কয়েক দশক ধরে কিউবাকে অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় দাবিয়ে রাখার শতচেষ্টা করেও ওয়াশিংটন ব্যর্থ হয়েছে; ৯০-র পর যেই না তারা ক্যাস্ট্রো ভ্রাতৃদ্বয়ের টুঁটি চেপে ধরতে নামবে, তার আগেই লাতিনের রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টাতে শুরু করলো। এসবের পেছনে হাভানার ‘বিনিয়োগও’ ছিল দীর্ঘদিনের। বছরের পর বছর তারা তাদের সীমিত সম্পদ দিয়েই লাতিনের দারিদ্র্য ঘোচাতে একের পর এক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে গেছে। বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে। লাতিনের দেশগুলোর অগণিত সাধারণ মানুষকে সত্যিকারের শিক্ষার আলোতে দীক্ষিত করেছে; যারাই মার্কিন দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেয়েছে, কিউবা তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারই প্রতিদান মিলেছিল চলতি শতকের প্রথম দশকে। ভেনেজুয়েলায় শ্যাভেজ, বলিভিয়ায় ইভো মোরালেস, ইকুয়েডরে রাফায়েল কোরেয়া, নিকারাগুয়ায় ডেনিয়েল ওর্তেগা, ব্রাজিলে লুলা দ্য সিলভা। এরা তো মার্কিন নীতি ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কট্টর বক্তা। এর বাইরেও আর্জেন্টিনার নেস্টর ক্রিচনার, উরুগুয়ের তাবারে ভাজকেজের মতো নেতারা একে একে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে থাকলেন। লাতিন আমেরিকা ওই সময়ে বিশ্বব্যাংক আইএমএফের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিল, ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে একত্রিত হয়ে একসঙ্গে মহাদেশের উন্নয়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। নানান অর্থনৈতিক জোট হয়েছিল। ব্রাজিল এমনকি রাশিয়া, চীন ও ভারতকে নিয়ে গড়ে তুলেছিল নতুন একটি অর্থনৈতিক জোট ‘ব্রিক’; পরে অবশ্য ওই জোটে দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্ত হলে এর নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘ব্রিকস’ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাকইয়ার্ডে বসে পুঁজিবাদকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এ চেষ্টা ওয়াশিংটন সহজভাবে নেয়নি। তাইতো নানান কৌশলে, স্যাবোটাজ আর ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে লাতিনের দিক খানিকটা ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। মিথ্যা দুর্নীতির অভিযোগে, অনেকটা জোর করেই লুলাকে জেলে ঢোকানো হলো, একইরকম করে আটকে ফেলা হল দিলমা রৌসেফকে। আর্জেন্টিনা, ইকুয়েডরে ক্ষমতার পালাবদল হলো; সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি চলা সবগুলো দেশের অর্থনীতিকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে নেওয়া হলো নিষেধাজ্ঞা, অবরোধের কৌশল। শ্যাভেজের মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যে লাতিন যেন সত্যিই উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করলো। ডানপন্থি সরকারগুলো বিশ্বব্যাংক আইএমএফের নীতি নিয়ে সরকারি খাতে কৃচ্ছ্রতার কর্মসূচি নিল, লাতিন আর ক্যারিবীয় রাষ্ট্রগুলোর জোট অকার্যকর হয়ে উঠলো, অনেক দেশই ফের পদলেহন শুরু করলো ওয়াল স্ট্রিটের। এসবের খেসারতও দিতে হচ্ছিল তাদের। আর্জেন্টিনার মৌরিসিও মাক্রি সরকারের কর্মসূচির কারণে দেশটি দেউলিয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। সেখান থেকে উদ্ধার পেতে আইএমএফ তাদের জন্য রেকর্ড ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেইলআউট কর্মসূচি নেয়। বিশ্বব্যাংক আইএমএফের শেকলে বাঁধা পড়ে ইকুয়েডর, শুরু হয় কৃচ্ছ্রতার কর্মসূচি। ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনেরো তো আরও এককাঠি সরেস। কেবল উদারবাদী কর্মসূচিই নয়, লাভের বখরা নিশ্চিতে তিনি এমনকি পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজন চোরাকারবারিদের কাছে উন্মুক্ত করতেও পিছপা নন। এমন মোক্ষম সময়েই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সোশালিস্ট খুঁটি উপড়ে ফেলতে একের পর এক ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেলতে শুরু করে। তাদের চাপে পড়ে হিমশিম খেলেও দিশা হারায়নি মাদুরো সরকার। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। বৈশ্বিক রাজনীতির মেরুকরণে শক্তিধর অনেক দেশও তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। সংকট মেটাতে সোশালিস্ট সরকার বেশকিছু সংস্কার কার্যক্রমও নিয়েছে, যার ফলও পাওয়া শুরু করেছে ভেনেজুয়েলার সাধারণ জনগণ। আর এদিকে পেন্সের দেখা ভেনেজুয়েলার ‘ডানা কাটার স্বপ্ন’ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। মাদুরোকে উৎখাতে ভেনেজুয়েলার যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর পেন্টাগন সবচেয়ে বেশি ভর করেছিল, সেগুলোতেই উল্টো সরকারপতনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। কলম্বিয়ায় সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছে। ইকুয়েডরে আদিবাসীরা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়ায় প্রেসিডেন্ট লেনিন মোরেনো বাধ্য হয়ে সরকারি দপ্তরকেই রাজধানীর বাইরে সরিয়ে নিয়েছেন। পালাবদলের এই হাওয়া কেবল এখানেই আটকে থাকেনি। আর্জেন্টিনার নির্বাচনে ডানপন্থি প্রার্থীকে হারিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন বাম হিসেবে পরিচিত আলবার্তো ফার্নান্দেজ। বলিভিয়ার নির্বাচনে ফের জিতেছেন ইভো মোরালেস। কলম্বিয়ায় স্থানীয় নির্বাচনে গো-হারা হেরেছে উগ্র দক্ষিণপন্থিরা। ক্ষমতার পরিবর্তনই নয়, লাতিন যেন এবার আরও তীক্ষ্ণ নজর নিয়ে হাজির হচ্ছে। তার তীর কেবল ডানপন্থি সরকারগুলোর দিকেই নয়, সে একই সঙ্গে ব্যবস্থারও বদল চায়। যার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন এখন চিলি। অসমতার মূল উৎপাটনের দাবিতে দেশটির রাজধানী সান্তিয়াগোতে গত ২৫ অক্টোবর, কেবল একদিনেই ২০ লাখ মানুষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে একত্রিত হয়েছিল। তারা চায়- সেবা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সবার সমান সুযোগ নিশ্চিতে ব্যবস্থা। বিক্ষোভের শুরুটা হয়েছিল তারও সপ্তাহখানেক আগে। মেট্রোর ভাড়াবৃদ্ধির প্রতিবাদে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। সহিংসতা, বিক্ষোভ, ধর্মঘটের তোড়ে সরকার পিছু হটলেও আন্দোলনকারীরা ঘরে ফিরে যায়নি। তাদের লক্ষ্য এবার নয়া-উদারীকরণ উৎখাত। বলছেও সেই কথা। তাদের বিক্ষোভে বাজছে ভিক্টর হারার গান, হাতে হাতে ঘুরছে সালভাদর আলেন্দের ছবি। সাড়ে চার দশক আগে যে আলেন্দে তার শেষ ভাষণে শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ জনগণকে চিলির ভাগ্যনির্মাতা হয়ে উঠতে আহ্বান জানিয়েছিলেন, মৃত্যুর এতগুলো বছর পর সান্তিয়াগোর রাস্তায় রাস্তায় তার সেসব উদ্ধৃতি মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। চিলির সরকার কোনোকিছু দিয়েই বিক্ষোভকারীদের মানাতে পারছে না। মন্ত্রিসভার রদবদল, নতুন অর্থনৈতিক কর্মসূচি, কিছুই না। জনগণ যেন মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছে। অক্টোবরের এই ঢেউ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে গত শতকের দ্বিতীয় দশকের আরেক সুনামিকে। সেই অজেয় হাওয়া, যতদিন পৃথিবীতে সমতা আসবে না, যতদিন শ্রেণিবৈষম্য ঘুচবে না, যতদিন শোষণ বলবৎ থাকবে- এই হাওয়া ফিরে ফিরেই আসবে। সেই হাওয়ায় দুলে লাতিনও যেন ফিরছে তার চেনা ছন্দে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..