শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের দায় কে নেবে?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আল কাদেরী জয় : গত ৬ অক্টোবর রাতে ঘটে গেলো বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রহত্যার আরেকটা নৃশংস ঘটনা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের কর্মীরা সারারাত পিটিয়ে পিটিয়ে খুন করে আবরার ফাহাদ নামের এক সাধারণ শিক্ষার্থীকে। এই ঘটনায় সারাদেশের মানুষ যখন স্তম্ভিত, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররা প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ তখন বুয়েট প্রশাসন সেই ক্যাম্পাসে ছাত্রদের রাজনীতি বন্ধের ঘোষণা দিলো। কথা হলো, বুয়েটে এতোদিন যে ছাত্র নির্যাতন হতো তা নিয়ে প্রশাসন তো কিছু বলেনি। ৬১’র অধ্যাদেশ অনুযায়ী চলা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন রুমকে ‘টর্চার সেল’ বানিয়ে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে তা নিয়েও কোনো মুখ খোলেনি। এমনকি আবরার খুন হওয়ার দিন সকালে সিসি ফুটেজ গোপন করার অপরাধে প্রশাসনকেও কোনো দায় দেয়া হলো না- যেটা হলো, সবকিছুর দায় চাপানো হলো ছাত্র রাজনীতির উপর। আমরা যারা প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত আমরা দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাস-দখলদারিত্বের ভয়াবহতার কথা বলে আসছি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও মর্যাদার অধিকারী হওয়ার কথা ছিলো সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই আজ তারা অনিরাপদ, অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সরকারি মদদপুষ্ট হয়ে ছাত্রলীগের হলে হলে দখলদারি, জোর করে মিছিলে নিয়ে যাওয়া, সালাম না দিলে চড়থাপ্পড় লাগানো, র?্যাগিং, গণরুম-গেস্টরুমে নির্যাতন অহরহ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আবরারের হত্যার ঘটনায় এই ঘটনাগুলোর নিষ্ঠুরতা যেমন প্রকাশিত হয়েছে তেমনি এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের দাবিগুলোর প্রয়োজনীয়তাও আরো স্পষ্টভাবে ফটে উঠেছে। সারাদেশে গত ১০ বছরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৭ জন ছাত্রলীগ কর্মী খুন হয়। ভিন্ন সংগঠনসহ সাধারণ ছাত্র খুন হয় ১৫ জন। গত ৪৫ বছরে শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ১৪৯ জন শিক্ষার্থী খুন হয়- আজ পর্যন্ত যার একটারও বিচার হয়নি। অপরাধ ঘটনার পর ক্ষমতাসীনদের যোগসাজশে অপরাধীরা ঠিকই পার পেয়ে যায়। ফলে ছাত্রলীগের এই অপরাধের তালিকায় হাফিজুর মোল্লা, আবু বকর, বিশ্বজিতের লাশের মিছিলে নতুন যুক্ত হলো আবরার ফাহাদের নাম। বুয়েটসহ বিভিন্ন জায়গায় ৫৭টি টর্চার সেলের খোঁজ পাওয়া গেছে। কিন্তু এর দায় কেবল ছাত্রলীগ নয়, প্রশাসন ও সরকার কেউ এড়াতে পারে না। কারণ তাদেরই ইশারাতে কিংবা জ্ঞাতসারেই ঘটে চলে এই সকল নৃশংস-বর্বরতা। এই পরিস্থিতি কতদিন চলবে? কিংবা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হলেই কি এর সমাধান হবে? অথবা ছাত্র রাজনীতি আর সন্ত্রাস কি এক? এই ধরনের আরো অনেক প্রশ্ন উঠে এসেছে। আমরা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাম-প্রগতিশীল সংগঠন এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে মোকাবিলা করছি। আমরা স্পষ্টভাবেই বলতে চাই ছাত্র রাজনীতি ও সন্ত্রাস কখনোই এক নয়; অতীতেও ছিলো না, বর্তমানেও এক নেই। বর্তমানে শাসক আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগ এবং বিগত সময়ে ছাত্রদল-শিবির বাস্তবে ক্ষমতাসীনদের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করছে। পাকিস্তানি আমলে মুসলিম লীগ ও আইয়ুব খানের এনএসএফ বাহিনীরই নব্য সংস্করণ এই সংগঠনগুলো। একদিকে শাসকদল ছাত্রদের নিজেদের কাজে লাগিয়ে সন্ত্রাসীদের জন্ম দেয় আবার তারাই নিয়ন্ত্রণের ছলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের হুমকি দিয়ে থাকে। তাই এদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে দেখিয়ে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার অপচেষ্টা জনগণের অধিকার সংকোচন ও তারুণ্যের প্রতিবাদকে স্তব্ধ করার ক্ষমতাসীনদের আরেকটা কৌশলমাত্র। শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ, সাম্প্রদায়িকীকরণের যে ধারা বর্তমানে চালু রয়েছে তারই পরিপূরক হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্রমাগত গবেষণাশূণ্য করে সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব কায়েম রয়েছে। তাই শিক্ষার গণতান্ত্রিক ও মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না করে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দিলে এই সন্ত্রাসী উৎপাদন বন্ধ হবে না। আবরারের হত্যার ঘটনায় তিনটা বিষয় উঠে এসেছে। এক. ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগের আধিপত্য-সন্ত্রাস, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি আজ এক ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের চাঁদা আদায়ের ঘটনায় কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে পদচ্যুত করার ঘটনা কিছুদিন আগেই তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেই। দুই. গেস্টরুম-গণরুমে ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা প্রশাসন ও সরকারের অজানা কিছু নয়, বরং টর্চার সেলের আবিষ্কার তারই একটা ফলাফল মাত্র। মধ্যযুগীয় বর্বরতার এক নয়া চেহারা আমরা দেখি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলতে। তিন. বর্তমান শাসকদল মত প্রকাশের সমস্ত অধিকার সংকুচিত করে, বিরুদ্ধ মতকে দমন করে স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। এই বিষয়গুলোকে আরো অনেক বিস্তৃত ব্যাখ্যা করা যাবে কিন্তু এই মুহুর্তে যেটা করণীয় এই সন্ত্রাস -দখলদারির অবসান ঘটাতে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আমরা দাবি তুলেছি- ১ম বর্ষ হতেই প্রতিটি ছাত্রের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগে বৈধ সিটের ব্যবস্থা করা, যা খুবই বাস্তবায়নযোগ্য। এর জন্য কোনো মন্ত্রী কিংবা ভিসি পাল্টাতে হয় না। হয়তো এই দাবি পূরণের জন্য লড়াই করতে হবে আরো অনেকদিন। তাই আদর্শবাদী ছাত্র রাজনীতিকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই। সন্ত্রাস-দখলদারিত্ব, গণরুম-গেস্টরুমের টর্চারের অবসানে বামপন্থি ছাত্র সংগঠন ও তাদের জোটকে শক্তিশালী হয়ে উঠতে হবে। আন্দোলন ও সংগঠন– এই দুইয়ের সমন্বয়ে সাধারণ ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজটাই আগামী দিনের প্রধান কর্তব্য। সকল অবক্ষয়, লুটপাট, দুর্নীতি-দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এটাই সময়। লেখক : সভাপতি, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ও সমন্বয়ক, কেন্দ্রীয় প্রগতিশীল ছাত্র জোট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..