উন্নয়ন বনাম আমাজন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মনির তালুকদার : ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ (ইনপে) জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৭৫ হাজারেরও বেশি অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ব্রাজিলে ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ খ্যাত আমাজন জঙ্গলে। আর এসব অগ্নিকাণ্ডের একটা বড় অংশই পরিকল্পিত। অবশ্য অভিযোগের তীর ব্রাজিলের উগ্র-ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর দিকে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, আমাজনকে বাণিজ্যের জন্যে উন্মুক্ত করার সরকারি নীতির কারণেই আগুন লাগানোর ‘সংঘবদ্ধ মহোৎসব’ শুরু হয়েছে। আমাজনকেন্দ্রিক গবেষণা সংস্থা বলছে, উন্নয়ন এবং অধিক প্রবৃদ্ধির জন্যে জঙ্গল ধ্বংস করে কৃষি ও পশু পালনের বিস্তৃতি, বৈধ ও অবৈধ খনি, আর যথেচ্ছভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্যেই ‘পৃথিবীর ফুসফুস’-কে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। বছরের শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়মিত ও প্রাকৃতিক হলেও, পশু চারণভূমি কৃষি অঞ্চল তৈরি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের জন্যেই জঙ্গল পরিষ্কার করতে ভূমিদস্যুদের আগুন দেওয়ার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে যাওয়ার জন্যে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে দায়ী করেছেন বিশ্বের পরিবেশবাদীরা। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারোর জনবিরোধী নীতিতে উৎসাহিত হয়ে সম্প্রতিকালে কৃষি জমির জন্যে বনাঞ্চল পোড়াতে সমন্বিতভাবে ‘আগুন দিবস’ পালন করছে ব্রাজিলের ভূমিদস্যুরা। আমাজন ওয়াচের পরিচালক ক্রিস্টিয়ান পাইরিয়ার মমো বলেন, ‘ওইসব আগুনের বড় অংশই মানুষের লাগানো। আর্দ্র আমাজনে শুষ্ক মৌসুমেও ক্যালিফোর্নিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার শুকনো ঝোপের মতো দ্রুত আগুন জ্বলে উঠে না। তবে দীর্ঘদিন ধরেই জঙ্গল পরিষ্কার করতে ব্রাজিলের কৃষি ও কাঠ ব্যবসায়ীরা আগুন ব্যবহার করছে। তাই আজকের অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ দাবানলের নেপথ্যেও তাদের পরিকল্পিত ভূমিকা রয়েছে।’ ক্লার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক বলেছেন, সোনার খনি, তেল ও গ্যাস উত্তোলনে অনেক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আমাজন অঞ্চল। তাছাড়া আগামী ২০ বছরের মধ্যে এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডার কর্পোরেট কোম্পানিসমূহ বড় ধরনের অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে–ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থী সরকার ও বিনিয়োগকারীরা আমাজন অঞ্চলে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করেছে। আর ওইসকল প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে–রাস্তা নির্মাণ, রেলপথ স্থাপন, বন্দর ও নৌপথ নির্মাণ। এসব প্রকল্পের লক্ষ্যে হলো গভীর জঙ্গল থেকে সোনা, তেল, কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদ উত্তোলন করা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা জাইর বলসোনারো বারবার একটা বলতে চেষ্টা করেছেন, সেটা হলো দেশের স্বার্থে ব্রাজিলের উচিত আমাজনকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। এতে করে খনন, কৃষি ও কাঠ ব্যবসায়ীরা তাদের সম্পদকে কাজে লাগাতে পারে। এ বছরের ২০ আগস্ট ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলসোনারো বলেন, যেসব বেসরকারি সংগঠনের (এনজিও) তহবিলে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই সকল বেসরকারি সংগঠনের লোকেরা আমাদের ‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে’ আমাজনে আগুন দিচ্ছে। তবে বলসোনারোর ওই বিবৃতির পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। আবার আমাজনের আগুনকে যখন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ, ‘আন্তর্জাতিক সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস, ‘অতি ভয়াবহ পরিস্থিতি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন, জাতিসংঘের মহাসচিক আন্তোনিও গুতেরেস ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন, তখন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো খুব খোশমেজাজে বলেছেন, এটা আমাদের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’। তবে নির্বাচনের আগে আদিবাসীদের জন্যে সংরক্ষিত এলাকায় খনি খনন কাজকে ব্রাজিলের উগ্র ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট বলসোনারো বৈধ করার কথা বলেছিলেন। তাছাড়া তিনি ভূমি আইন সংস্কারের মাধ্যমে খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ আদিবাসীদের জমি খনি খনন ও কৃষি উৎপাদনের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, আশির দশকে বলসোনারো একটি অবৈধ সোনার খনিতে নিজেও কাজ করেছেন। সেক্ষেত্রে অবৈধ খনি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল এটাই তো স্বাভাবিক। তাছাড়া তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, ওই সকল অবৈধ খনি ব্যবসায়ীদের অবৈধ অর্থ এবং সমর্থন প্রেসিডেন্ট হতে তাকে সাহায্য করেছে। (সংক্ষেপিত)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..