বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
শেখ অলিউর রহমান : বিশ্ব শিক্ষক দিবস শিক্ষকদের অধিকার-মর্যাদা-দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের স্মারক দিবস। একটি বিশেষ অঙ্গীকার নিয়ে সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। শিক্ষক সমাজের অধিকার, মর্যাদা, কাজের নিরাপত্তা, অঙ্গীকার, শিক্ষকদের দায়বদ্ধতা, সরকার ও রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা, বেতন-সম্মানী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, পাঠদান পদ্ধতি, পাঠ্যউপকরণ, শিক্ষানীতি, কারিকুলাম, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অবসরকালীন সুবিধা এবং গবেষণা এর কোনো কিছুই শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার থেকে বাদ যায় না। প্রতি বছর একটি বিশেষ প্রতিপাদ্যকে নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ও তার উপর বিশ্বব্যপী কার্যক্রম পরিচালনা করে ইউনেস্কো। এবছর শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে ঠিক করা হয়েছে– ‘তরুণ শিক্ষক : পেশার ভবিষ্যৎ’। জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সহযোগী সংগঠন ইউনেস্কো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ ৫ অক্টোবরকে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রেজুলেশনে স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে আর্ন্তজাতিকভাবে পালিত হতে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের ২০০টি দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়ে থাকে। “শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষকদের অধিকার, মর্যাদা এবং মানোন্নয়ন নিয়ে ইউনেস্কো প্রথম থেকে অদ্যাবধি কাজ করে যাচ্ছে।” ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের প্রতিপাদ্য ছিলো, ‘শিক্ষার অধিকারের অর্থই হচ্ছে যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অধিকার সংরক্ষণ।’ প্রতি বছর একটি করে শ্লোগান বা প্রতিপাদ্য থাকে যেমন ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো: ‘শিক্ষাদানের স্বাধীনতা ও তা প্রয়োগের অধিকার।’ এখন কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে প্রকৃত শিক্ষকের অধিকার বা মর্যাদা কতটুকু সংরক্ষিত হচ্ছে বা হয়েছে! বাংলাদেশে শিক্ষক বলতে যা বোঝায় তা হলো বেসরকারি শিক্ষক। এর যুক্তিসংগত কারণ– দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষকই বেসরকারি। বাকি ৩ শতকরা শিক্ষক সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। তাহলে বিচারে কী দাঁড়ালো? সব দেশে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবীদের মাঝে বৈষম্য আছে কিন্তু তার মাত্রা কতো, তা বিচার্য! ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ভাষায়, ‘সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ’। সারা পৃথিবীর উদহারণ না দিলেও আমাদের সার্কভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যদি বাংলাদেশের শিক্ষার ব্যয় ধরি তাহলে আমাদের অবাক করে দেয়– আসলে আমরা কোথায় আছি! আইএলও/ ইউনেস্কার সুপারিশের আলোকে র্সাকভুক্ত অন্তঃদেশীয় স্মারক চুক্তি অনুযায়ী শিক্ষাখাতে বরাদ্দের পরিমাণ ধরা হয়েছিলো ৬শতাংশ, ইউনেস্কা/আইএলও’র সুপারিশ ৭শতাংশ। কিন্ত আসলে বাংলাদেশে কি শিক্ষাখাতে ৬ বা ৭শতাংশ সরকার ব্যয় করছে? নিশ্চয় না! করছে মাত্র ২.৫০শতাংশ। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন! অথচ সার্কের সব চাইতে দরিদ্রতম দেশ আফগানিস্তানেও শিক্ষাখাতে তাদের বরাদ্দ আমাদের দেশের চাইতে বেশি! শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। আসলে কি তাই! এই দেশের বেসরকারি শিক্ষকরাই সব চাইতে অবহেলিত। বেসরকারি একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক অবসরে গেলে কমপক্ষে তাকে ৫ বছর অপেক্ষা করতে হয় তার পাওনা টাকা পেতে। তারপরেও সে পক্রিয়ার নানা ঘাটে ডানহাত বামহাতের কিছু ব্যপার আছে; এই ওপেন সিক্রেটের কথা কে-না জানে! অনেক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের পরিবার শিক্ষকের মৃত্যুর পর টাকা নামক সোনার হরিণ পায়! এই হচ্ছে বাস্তবতা। দেখার কেউ নেই। এখানে একটি কথা বলা দরকার– ‘শিক্ষা এবং শিক্ষক’ এই দুইটি শব্দ একে অন্যের পরিপূরক। ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘বিশ্ব শিক্ষা দিবসের’ প্রতিপাদ্যে বলা হয়েছে: ‘মতবিনিময়, উদ্বোধন, উত্তরাধিকার এবং প্রাণবন্ত আচরণই বিশ্ব শিক্ষা দিবসের সার কথা।’ এখন আমাদের এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ আবশ্যক। গণমুখী শিক্ষা ও শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে দীর্ঘদিন বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষক সমাজ আন্দোলন করে আসছে। সরকারি পেশাজীবীদের পরেই বেসরকারি শিক্ষকদের সংগঠনই সর্ববৃহৎ পেশাজীবী সংগঠন। এবং এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন সব চেয়ে বড়। তাদের সর্বশেষ দাবি (১) শিক্ষার মানোন্নয়নে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ দ্রুত বাস্তবায়ন এবং (২) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আদলে মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহকে জাতীয়করণ করা। এই দাবিতে শিক্ষক সমাজ রাজপথে এখনও সংগ্রামরত। শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষকের উন্নয়ন হোক এটাই আজকের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অঙ্গীকার। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, খুলনা জেলা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..