রেবতী মোহন বর্মণ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শেখ রফিক : বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নির্মাতা ছিলেন আজন্ম বিপ্লবী রেবতী মোহন বর্মণ। তিনি ১৯৫২ সালের ৬ মে মারা যান। জন্মেছিলেন ১৯০৩ সালে। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪৭ বছর। রেবতী বর্মণ। যার পুরো নাম রেবতী মোহন বর্মণ। প্রায় অধিকাংশ মানুষ রেবতী বর্মণ নামেই জানে। তবে তার নিজ গ্রামের মানুষদের কাছে রেবতীবাবু বলে পরিচিত ছিলেন। আর আমাদের কাছে ‘সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ’ বইয়ের লেখক হিসেবে পরিচিত। রেবতী বর্মণ, যে নামটির সাথে জড়িত রয়েছে একটি বই ‘সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ’। বইটি আর নামটি যেন অবিচ্ছেদ্য। যে বইটি ১৯৫২ সাল থেকে এ উপমহাদেশের বামপন্থি রাজনীতিবিদ ও কর্মীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অত্যাবশ্যকীয় বই। সেই অমর গ্রন্থের নাম হল ‘সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ’। ব্রিটিশ-ভারতের জেলে থাকাকালীন সময়ে ব্রিটিশ সরকার রেবতী বর্মণের ওপর অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন করে। যে কারণে তিনি ঘাতকব্যাধি কুষ্ঠে আক্রান্ত হন। ১৯৪৯ সালে নিজ জন্মভূমি ভৈরবে বসে কুষ্ঠরোগাক্রান্ত পঁচন ধরা আঙুলে রশি দিয়ে হাতের সাথে কলম বেঁধে রচনা করেন ‘সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ’। সমাজ-ইতিহাসের গ্রন্থকার হিসেবে খ্যাত গর্ডন চাইল্ড সমাজ নির্মাণের ইতিহাস মেলে ধরার চেষ্টায় লিখেছিলেন, ‘ম্যান মেকস হিমসেল্ফ’ এবং নতুন আলোকে ইতিহাসের আকর্ষণীয় উপস্থাপনা ঘটান বহু তথ্য ও বিবরণের সম্পর্কসূত্র উন্মোচন করে, সেই একই কাজ বাংলায় করেছেন রেবতী বর্মণ। ‘রেবতী বর্মণ বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলন নির্মাতাদের একজন, প্রগতিশীল রাজনীতির চর্চায় পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন। নীহার রঞ্জন সরকারের ‘ছোটদের রাজনীতি’ এবং ‘ছোটদের অর্থনীতি’র পাশাপাশি রেবতী বর্মণের বইয়ের পাঠগ্রহণ একদা ছিল প্রগতি রাজনীতি-বরণের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সাহচর্য সত্ত্বেও রেবতী বর্মণ সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি কিছু জেনেছি বলে মনে পড়ে না। কোনো এক সময়ে কীভাবে যেন শুনেছিলাম তিনি ছিলেন ভৈরবের সন্তান, এর বাইরে আর কিছু জানতে পারিনি। তবে ‘সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ’ পাঠককে নিশ্চিতভাবে মুগ্ধ করে। সভ্যতার ইতিহাসের এমন প্রাঞ্জল উপস্থাপনা সমাজতন্ত্রকে ইতিহাসের অমোঘ রায় হিসেবে গণ্য করার প্রবণতাকে দৃঢ়বদ্ধ করে। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থ মার্কসবাদ চর্চায় যেমন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল তেমনি সমাজ-ইতিহাস অধ্যয়নে নিবিষ্ট ছাত্রদের কাছেও এর চাহিদা কখনো কমেনি। এমন গ্রন্থ রচনা নিছক রাজনৈতিক কর্মীর তাগিদ থেকে সম্পন্ন হতে পারে না, সেই সঙ্গে চাই সমাজ বিশ্লেষকের গভীর দৃষ্টি, ইতিহাসের সমগ্রচেতনা। রেবতী বর্মণ সেই বিরল গুণের অধিকারী ছিলেন বলে রাজনীতির অমন ক্লাসিক্যাল বই উপহার দিতে পেরেছিলেন এবং একটি বইয়ের সূত্রেই তিনি অমর হয়ে উঠতে পারলেন। তবে যতো যুগান্তকারী হোক তার গ্রন্থ, ইতিহাসের ব্যাখ্যা দিতে তিনি সচেষ্ট হয়েছেন, নতুন ইতিহাস-তত্ত্বের উদ্গাতা তিনি নন, তবু কেন সেই গ্রন্থ কিছুতেই সাবেকী হয়ে উঠলো না। তার একটি কারণ রেবতী বর্মণ কেবল ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকা পালন করেননি, তিনি ইতিহাসের বিপুল তথ্যভাণ্ডার ঘেঁটে সারসত্য উপস্থাপনে অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।’- মফিদুল হক। মানুষের ইতিহাস মূলত: শ্রেণি সংগ্রাম আর শ্রমের ইতিহাস। শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বই সমাজ বিবর্তনের মূলসূত্র-এ তত্ত্বে বিশ্বাসী, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আজীবন বিপ্লবী রেবতী মোহন বর্মণ কারাগারে বসে বি. এ পরীক্ষা দিয়ে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। রেবতী মোহন বর্মণের জন্ম ১৯০৩ সালে। বঙ্গভঙ্গের সেই ঐতিহাসিক ক্ষণে ভৈরব উপজেলার শিমুলকান্দি গ্রামের বর্মণ পরিবারে। তবে তার জন্ম সাল অনেকে ১৯০৪ বা ১৯০৫ বলেও উল্লেখ করেছেন। তার বাবা হরনাথ বর্মণ। তিনি ছিলেন একজন নামকরা আইনজীবী। ইংরেজদের প্রতি আনুগত্যের জন্য তিনি রায় উপাধি পেয়েছিলেন। শিমুলকান্দি গ্রামের নামকরা পরিবার ছিল এই বর্মণ পরিবার। শিক্ষা-দীক্ষা আর অর্থ-সম্পদের এক ঐতিহ্যবাহী পরিবার। রেবতী মোহন বর্মণের পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। বাবার কাছে। তারপর প্রাথমিক পড়াশুনা শেষে চুন্টা গ্রামের একটি স্কুলে তাকে ভর্তি করে দেয়া হয়। এখানে তিনি বেশি দিন পড়াশুনা করতে পারেননি। চুন্টা গ্রাম ছিল বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল উপজেলায়। রেবতী মোহন ছিলেন পাঁচ ভাইয়ের মাঝে চতুর্থ। শিমুলকান্দি গ্রামে জন্ম নেয়া রেবতী বর্মণ পড়াশোনা করেছিলেন ঢাকার পগোজ স্কুল এবং কুমিল্লার গভর্নমেন্ট হাই স্কুলে। স্কুল ছাত্রাবস্থায় ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অসহযোগ ও স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত হন। অসহযোগ ও স্বদেশি আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে ওই সময় অসংখ্য স্কুল ছাত্রদের উপর হুলিয়া জারি হয়। এই হুলিয়া থেকে রেবতী মোহন বাদ যাননি। হুলিয়ার কারণে তাকে কয়েকটি স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছিল। ১৯২২ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ আজিমুদ্দিন হাই স্কুলে ভর্তি হন। তখন আজিমুদ্দিন হাই স্কুল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। এই স্কুল থেকে (কলকাতার অধীনস্থ সমস্ত স্কুলের সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের মধ্যে) তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তারপর রেবতী বর্মণ পড়াশুনার জন্য কলকাতায় যান। এখানে মূলত ছাত্র পড়িয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাতেন। যে মেসবাড়ি ছিল তার ও সতীর্থদের আশ্রয় তা বিপ্লবীদের একরকম ঘাঁটি হয়ে উঠেছিল। তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আই.এ এবং সেন্ট পলস কলেজ থেকে বি.এ পাস করেন। বি.এ পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য পেলেন জগত্তারিণী পদক এবং পদক বিক্রির অর্থ দিয়ে সহপাঠীদের নিয়ে প্রকাশ শুরু করলেন কিশোরদের মাসিক পত্রিকা ‘বেণু’। এই সহপাঠীদের মধ্যে ছিল জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের দুই সদস্য শোভনলাল ও মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁদের সহযোগে বেণু’র প্রথম সংখ্যায় পত্রস্থ হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদের পরিচয়বহ রচনা, ‘মধ্যদিনে যবে গান/বন্ধ করে পাখি/হে রাখাল বেণু তব/বাজাও একাকী’। এরপর ১৯২৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ পরীক্ষায় অর্থনীতিতে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ‘রেবতী বর্মণ যে পঠন-পাঠন ও লেখালেখিতে নিবেদিত ছিলেন, সেই সঙ্গে চরমপন্থার বিপ্লববাদ থেকে সাম্যবাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিলেন তার প্রতিফলন পাওয়া যায় ১৯২৯ সালে তার প্রকাশিত ‘তরুণ রুশ’ গ্রন্থে।’- মফিদুল হক। রেবতী বর্মণের রাজনীতি শুরু স্কুল জীবন থেকেই। বিপ্লবী ত্রৈলোক্যনাথ মহারাজের জীবনাদর্শের প্রভাবে তিনি মার্কসীয় তত্ত্বে আকৃষ্ট হন। দেশমাতৃকার স্বাধীনতা ও মানুষের মুক্তির জন্য যুক্ত হন সশস্ত্র বিপ্লববাদী গ্রুপে। এ সময় তিনি ঢাকার শ্রী সংঘের সদস্য হন। এই শ্রী সংঘের সদস্য হিসেবে কলকাতা, বাঁকুড়া ও বীরভূমের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান। ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে কলকাতার ডালহৌসি স্কয়ারে পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের ওপর প্রকাশ্যে হামলা হয়েছিল। হামলার দিন বিকেলেই পুলিশ কুখ্যাত বঙ্গীয় ফৌজদারি দণ্ডবিধি (সংশোধিত) আইন, ১৯২৫-এর আওতায় রেবতী মোহন বর্মণ রায়কে আটক করে। ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর বিনা বিচারে ভারতের বিভিন্ন কারাগার ও বন্দি শিবিরে কেটে গেছে তার আটটি বছর। অবশেষে ১৯৩৮ সালের ২১ জুলাই তিনি নিঃশর্ত মুক্তি পান। জেলে থাকাকালীন সময়ে তিনি সমাজ বিবর্তনমূলক অসংখ্য গ্রন্থের পা-ুলিপি রচনা করেন। সেসব পা-ুলিপি থেকে পরে ১৭টিকে বই আকারে প্রকাশ করা হয়। যা বর্তমানে অত্যন্ত মূল্যবান গ্রন্থ হিসেবে বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে সারা বিশ্বে পঠিত হচ্ছে। ১৯৩৮ সালে তার পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকার শিশুদের শিক্ষিত করে তোলার লক্ষ্যকে সামনে রেখে স্থাপন করা হয় একটি প্রাথমিক স্কুল। যা পরবর্তীতে শিমুলকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে পরিগণিত হয়। কুষ্ঠ আক্রান্ত রেবতী মোহন ভৈরবে আসার পর শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে ঘরের বেড়ার (পার্টিশনের) আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখে অপর পাশ থেকে ছাত্র পড়াতেন। তিনি মার্কসবাদের ওপর ব্যাপক পড়াশোনা করেছেন বিভিন্ন জেলখানায়। তবে দেউলী বন্দি শিবিরের দিনগুলোতে তিনি বেশি বই পড়েছেন। মুক্তিলাভের পর সশস্ত্র বিপ্লববাদের পথ বাদ দিয়ে তিনি সাম্যবাদের দর্শন গ্রহণ করেন। এরপর থেকে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদ প্রচারের কাজে। ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনে। কারামুক্তির পর ভারতের চব্বিশ পরগনার বেলঘরিয়ায় বসবাসকালে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পুলিশ তার উপর হুলিয়া জারি করে। যে কারণে তাকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে হয়। চলে আসেন পৈতৃক শিমুলকান্দি গ্রামে। বেলঘরিয়ায় থাকাকালেই তার গায়ে কুষ্ঠরোগের লক্ষণ দেখা দেয়। ফলে তার পক্ষে দলীয় কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ১৯৫১ সালে দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি নিজ গ্রামের বাড়িতেই বসবাস করতেন। ১৯৪৭ সালে সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিভক্ত ভারতবর্ষের পাকিস্তান অংশের বিপ্লবী রেবতী বর্মনের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধগোষ্ঠী এলাকাবাসীকে খেপিয়ে তোলে। তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু হলে ১৯৫১ সালে তিনি তার প্রিয় জন্মভূমি ভৈরব ছেঁড়ে ভারতের আগরতলায় চলে যেতে বাধ্য হন। সেখানে ১৯৫২ সালের ৬ মে তিনি মারা যান। লেখক : সম্পাদক, বিপ্লবীদের কথা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..