জীবনের রেলগাড়ি

জসীম উদ্দীন মণ্ডল:

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

স্বদেশি আন্দোলন আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন বাবার এক সহকর্মী বন্ধু। ভদ্রলোক ছিলেন স্বদেশী। বাবার অনুরোধে একদিন তিনি আমাদের পড়াতে শুরু করলেন। স্বদেশী ভদ্রলোকের কাছে গল্প শুনতাম। সেসব গল্প শুনতে শুনতে আমারও মনে হতো—হায়, আমার কোমরেও যদি এমন একটা পিস্তল থাকত, আমিও যদি স্বদেশী হতে পারতাম! মোটামুটি তখন থেকেই স্বদেশীদের ওপর আমার একটা মোহ জন্মে গিয়েছিল। শ্রমিক অন্দোলন আমার বাবা শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত না থাকলেও ব্রিটিশবিরোধী একটা মনোভাব তাঁর মধ্যে আমি সক্রিয় দেখেছি। শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে আমার জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে বাবার মৌন সমর্থন সম্ভবত ছিল। কারণ, কোনোদিনই তিনি আমার আন্দোলন-সংগ্রামের পথে কোনো রকম বাধার সৃষ্টি করেননি। একদিন বাবা নিজেই বদলি হলেন কোলকাতায়। তখন ইংরেজ খেদাবার জন্য সমস্ত শহরের মানুষ যেন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন মিছিল দেখে দেখে আর স্লোগান শুনে শুনে আমার মনে হতো এই ডাল-ভাত-কাপড় আর থাকার জায়গা হলে আর চাই কী! এরাই খাঁটি লোক, এরাই আমাদের কথা বলে। আমাকে এদের সঙ্গেই থাকতে হবে। কী অবাক ব্যাপার একদিন সত্যি সত্যি সম্মোহিতের মতো আমরা দল বেঁধে যোগ দিলাম লাল ঝান্ডার মিছিলে। প্ল্যাকার্ড তুলে নিলাম দৃঢ় দুই হাতে। উঁচিয়ে ধরলাম লাল ঝান্ডা। কৈশোর কালের সাময়িক উচ্ছ্বাসে সেদিন যে মিছিলে যোগ দিয়েছিলাম, আজও জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও হাঁটছি সেই একই মিছিলে। মিছিল আমাকে ছাড়েনি। আমিও ছাড়তে পারিনি মিছিলকে। এটাই তো আমার জীবনের সবচাইতে বড় গর্ব। সবচাইতে বড় পাওয়া। হাতছানি : যৌবনের সব সময়ই দেখা যায় রাজনৈতিক আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তাকে বিপথগামী করতে শাসকশ্রেণি তৎপর হয়ে ওঠে। দমননীতি ছাড়াও এক শ্রেণির দালাল সৃষ্টি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে তারা। সেইকালের ব্রিটিশ শাসকরাও এ উদ্দেশ থেকেই সূচনা করেছিল ব্রতচারী আন্দোলনের। ব্রতচারী আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল তরুণ-যুবকদের সংগঠিত করার ভেতর দিয়ে খেলাধুলো আর শরীরচর্চা ইত্যাদি বিনোদনমূলক কাজে ব্যস্ত রেখে রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে তাদের দূরে সরিয়ে রাখা। ১৯৩৯ সাল। দুনিয়াজুড়ে শুরু হয়ে গেছে তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাঢোল। আমাদের সংসারের অবস্থাও তখন শোচনীয়। চাল আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা। রেলে যোগ আর্মিতে নাম লিখিয়ে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে এলেও চাকরি খোঁজার তাগিদ কিন্তু আমার শেষ হলো না। কারণ সেই দুর্মূল্যের বাজারে আমার একটা চাকরির একান্ত দরকার ছিল। বাবা একা আর সংসার সামাল দিতে পারছিলেন না। ঠিক এই রকম অবস্থায় রাস্তায় আবার একদিন ঢোল পেটানোর শব্দ শুনলাম। তবে এবার আর আর্মিতে নয়, রেলে লোক নেবার ঘোষণা। পরদিন সকাল দশটায় শিয়ালদহ স্টেশনে গিয়ে হাজির। হাজির হয়েই সবার মতো দাঁড়ালাম লাইনে গিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ডাক পড়ল। এভাবেই শুরু হলো আমার রুটিনবাঁধা জীবন। মাস শেষে মাইনে পেলাম পনেরো টাকা। দুদিনের বেতন কাটা গেল গরহাজিরার কারণে। আমাদের বেতন পাওয়ার খবর শুনে চাঁদার বই হাতে এরই মধ্যে এসে হাজির লাল ঝান্ডা আর সবুজ ঝান্ডার দল। লাল ঝান্ডা অর্থাৎ আমাদের পার্টিকে চাঁদা দিলাম চার আনা। এরপর যখন পুরোপুরি লাল ঝান্ডার কর্মী বনে গেলাম তখন চাঁদা দিতে লাগলাম এক টাকা করে। এভাবেই লাল ঝান্ডার সুবাদে পার্টি অফিসেও শুরু হলো আমার একটু-আধটু করে যাওয়া-আসা। পার্টিতে যোগ একদিন, ঝাঁকড়া চুলো বাউন্ডুলে টাইপের একজন লোককে কমরেড মুজফ্ফর সাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে আলাপ-আলোচনা করতে দেখলাম। লোকটাকে আমার মোটেও পছন্দ হলো না। কারণে-অকারণে হা-হা করে হাসছে কেবল। কেমন যেন বাঁচাল বাঁচাল ভাব। অথচ নেতৃস্থানীয় সবাই তাঁর সঙ্গে সমীহ করে কথা বলছে। অবশেষে কৌতূহল দমন করতে না পেরে, ইসমাইল ভাইকে জিজ্ঞেস করেই বসলাম, “ভাই, এই বাঁচাল লোকটা কে?” ইসমাইল ভাই তো আমার প্রশ্ন শুনে হতবাক! বললেন, “বলিস কী রে? ও তো কবি নজরুল!” শুনে আমিও সেদিন অবাক হয়েছিলাম। এই সেই নজরুল? যাঁর অত নামডাক! সেই কবি এমন দিল খোলা? এমন হাসিখুশি। ভেবেছিলাম, ‘বিদ্রোহী’ কবি কতই না গুরুগম্ভীর মানুষ! ক্রমে ক্রমে লাল ঝান্ডার একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে আমার বেশ পরিচিতি এসে গেল। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে এসে গেলাম একদিন। একদিন কবি সুকান্ত এলেন পার্টি অফিসে। লাজুক লাজুক ভাবের রোগাক্লিষ্ট চেহারার একজন কিশোর। মুখে সবে গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে। সে সময় সুকান্তকে দেখেছি পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে সারাদিনই প্রায় খাটাখাটুনি করতে। ১৯৪০ সালে এসে সদস্য হলাম ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির। গর্বে সেদিন আমার বুক ভরে উঠেছিল শোষিত মানুষের পার্টি, সর্বহারা শ্রেণির সংগঠন, তার আমি একজন সক্রিয় সদস্য হয়েছি—এই কথা ভেবে। ভোট ডাকাতি ’৪২-এর আগস্ট মাসে শুরু হলো ঐতিহাসিক ‘ভারত ছাড় আন্দোলন’। এ বছরই হঠাৎ করে অসুখে পড়ে মারা গেলেন বাবা। সে সময় লাল ঝান্ডার রেল শাখার নাম ছিল “রেল রোড ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন”। সভাপতি ছিলেন বীরেন দাশগুপ্ত, আর সেক্রেটারি পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু। কোলকাতায় ছিল এর কেন্দ্রীয় অফিস। মনে পড়ে, আমাদের পার্বতীপুর শাখার অফিসে জ্যোতি বসু প্রায়ই আসতেন। সংগঠনের কাজে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিয়মনিষ্ঠ। এক সময় এসব নেতার সঙ্গে হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছি। নেতাদের কথায় তখন জীবনপাত করতেও কুণ্ঠিত হতাম না। সেসব নেতার নাম আজ ইতিহাসের পাতায় স্থান পেলেও, যে হাজার হাজার কর্মী সেদিন সমস্ত সংগঠনের চালিকাশক্তি ছিল, তাদের নাম সবার অলক্ষ্যেই যেন ইতিহাসের পাতা থেকে ঝরে পড়েছে। ১৯৪৬-এর নির্বাচন-কালের একটি ঘটনা আমার মনের পাতায় এখনও গেঁথে আছে। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছিল। আমাদের নেতা জ্যোতি বসু বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেন নির্বাচনে। আজকের দিনে তো নির্বাচন মানেই ভোট-ডাকাতি। পাকিস্তান হবার পর ১৯৪৭ সালে ভারতকে কীভাবে কাটাছেঁড়া করে ভাগ করে নিলেন লীগ-কংগ্রেসের নেতারা, সে ইতিহাস সবারই জানা। ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে কখনই যে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না—এটা আমরা, কমিউনিস্টরা সেদিন ভালোভাবেই বুঝেছিলাম। কারাজীবন সে সময় জেলে এমন সব খাবার দেয়া হতো, যা খেলে সুস্থ মানুষও রোগী বনে যেত। তার ওপর ছিল তেঁতুল আর টক বেগুনের অম্বল। রক্ত পানি করার মহৌষধ। ব্রিটিশরা জেলে এ নিয়মগুলো চালু করেছিল, বন্দীদের বিশেষ করে রাজবন্দীদের তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেবার জন্যই। পাকিস্তানওলারা ব্রিটিশের কাছ থেকে নিয়মগুলো পেয়েছিল উত্তরাধিকার সূত্রে। সে সময় দেখেছি, দীর্ঘদিন ধরে জেলখাটা আসামিরা অমানুষিক পরিশ্রম আর খাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে টিবি বাধিয়ে বসত। জেল থেকে মুক্তি পেলেও এই কালব্যাধির হাত থেকে কারও মুক্তি ছিল না। মানুষকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার মতো শাস্তি বোধ হয় আর হয় না। বিশেষ করে সে মানুষটি যদি হয় সমাজসচেতন। দীর্ঘদিন ধরে জেলে পচে মরছি। সময় তো আর কম নয়। ঊনপঞ্চাশ থেকে এখন বায়ান্নোয়। কত লোক এলো-গেল এই জেলে। বিভিন্ন চরিত্রের, বিভিন্ন অপরাধের সব আসামি। তবে একটা জিনিস লক্ষ্য করতাম সে সময়। রাজনৈতিক বন্দী ছাড়া বিভিন্ন অপরাধে শাস্তি পাওয়া আসামিরা জেলে এসে যেন কেমন নিস্তেজ হয়ে যেত। অধিকাংশের মনেই ধর্মভাব জেগে উঠত। মনে হতো বাইরে গিয়ে বোধ হয় তারা সমস্ত অপকর্ম ছেড়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটত না। অনেককেই দেখেছি খালাস পেয়ে একই অপরাধের কারণে আবার জেলে ফিরে আসতে। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো ঈশ্বরদীতে তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। আমাদের ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীরা ট্রেনিং নিতে আগ্রহী দেখে আমি ঈশ্বরদী পে-অফিসের নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাতটি থ্রি-নট থ্রি রাইফেল সংগ্রহ করে দিলাম ওদের। ওদিকে তখন সারা মাড়োয়ারি হাইস্কুলে ছাত্রলীগ কর্মীদেরও ট্রেনিং চলছে। তো এই রাইফেল নিয়েই শুরু হলো ছাত্রলীগ কর্মী-নেতাদের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন কর্মীদের রেষারেষি। ছাত্রলীগ মনে করছে, প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তোলার অধিকার একমাত্র তাদেরই আছে। ওরা কয়েকদিন হুমকি দিয়ে গেল এই বলে, রাইফেলগুলো তাদের কাছে জমা দিতে হবে, নইলে অসুবিধা আছে। আমাদের ছেলেরা ওদের কথা কানেই তুলল না। একদিন দুপুরবেলা ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী কালাম ছুটতে ছুটতে এলো আমার বাড়িতে। ঘর থেকে বাইরে এসে দেখি কালাম হাঁফাতে হাঁফাতে এসে উঠল উঠোনে। পেছন পেছন এলো আরও দুজন ছেলে। আমি ছেলে দুটোকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, “ওকে তাড়া করছ কেন? কী হয়েছে?” ওরা বলল, “ওদের কাছে যে রাইফেলগুলো আছে ওগুলো এখনই দিয়ে দিতে হবে। নইলে খুন করব ওকে।” বললাম, “রাইফেলগুলো ওদের কাছে থাকলে ক্ষতিটা কোথায়? ওরাও তো যুদ্ধ করবে। দেশ স্বাধীন করার ঠিকেদারি তো তোমরা একা নাওনি! আমরাও তো এ দেশের মানুষ। দেশ মুক্ত করার দায়িত্ব তো আমাদেরও আছে, নাকি বলো?” ছেলেরা তবুও নাছোড়। বলল, “ওসব বুঝি না। রাইফেলগুলো আমাদের চাই-ই।” বললাম, “রাইফেল তোমাদের দেয়া হবে না। আর জোর করে যদি নিতেই চাও, তবে গোলাগুলি করেই নিতে হবে। যাও, এখন চলে যাও এখান থেকে।” ছেলেগুলো ফুঁসতে ফুঁসতে বিদেয় হলো। যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে শুধু ঈশ্বরদীতেই নয়, বাংলাদেশের সর্বত্রই এই বিরোধ লেগেছিল আওয়ামী লীগ কর্মীদের সঙ্গে। (সংক্ষেপিত)

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..