বিকল্পের কোনো বিকল্প নেই

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আজ হু হু করে বেড়ে চলেছে। দ্রব্যমূল্য আজ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন। সম্প্রতি পেঁয়াজের দাম লাফিয়ে ডবল হয়ে গেছে। জনজীবনের এই দুঃসহ যন্ত্রণা সম্পর্কে সরকার অনেকটাই নির্বিকার। এসব ক্ষেত্রে সে শুধু চাহিদা-সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজার দর ও বাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকছে। সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেনি। শক্তিশালী, দক্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত গণবণ্টন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেনি। বরঞ্চ নিজেই সে বারবার বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করেছে। পেট্রোল, ডিজেল, পানি, গ্যাস ইত্যাদির দাম বাড়িয়েছে। অথচ গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষের আয় বাড়েনি বললেই চলে। অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষকে বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। সরকারের উঁচু মহলের যোগসাজসে এসব করা হচ্ছে। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, যুবক ও ডেসটিনির বাটপারি, হলমার্ক-সোনালী ব্যাংক কেলেঙ্কারি, ভূমি দস্যুতা, চোরাকারবারির রমরমা ব্যবসা, কমিশন বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বড় কেলেঙ্কারির খবর ইত্যাদি থেকেই লুটপাটের ব্যাপ্তি ও মাত্রা অনুমান করা যায়। দেশে বড় বড় লুটপাটের ঘটনার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যন্ত ঘুষ-দুর্নীতি, দলবাজি, তদবিরবাজি, বেপরোয়া দখলদারিত্ব, ভর্তি বাণিজ্য, সিট বাণিজ্য, জবরদস্তি ইত্যাদির বিস্তার ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বেড়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি। এসবকে ভিত্তি করে ছড়িয়ে পড়েছে হত্যা, খুন, কিডন্যাপিং, নারী-নির্যাতন, সশস্ত্র ক্যাডারবাহিনী লালন, গড ফাদারদের দৌরাত্ম, প্রভাব বিস্তার নিয়ে হানাহানিসহ অপরাধমূলক নানা কাজকর্ম। একই সাথে অব্যাহত আছে ক্রসফায়ার-হত্যা-গুমের লোমহর্ষক সব ঘটনাবলী। মানুষের জীবনে সামাজিক নিরাপত্তা বলতে আজ আর কিছু নেই। বেডরুম থেকে খোলা মাঠ, কোথাও মানুষ আজ নিরাপদ নয়। এদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জনসেবা– সবকিছুকেই পণ্যে পরিণত করার মাধ্যমে সমাজের বাণিজ্যিকীকরণকে সর্বগ্রাসী করে তোলা হয়েছে। পুঁজিবাদী লুটপাটের প্রয়োজনে পরিবেশ, প্রকৃতি, প্রাণী-উদ্ভিদ জগত– সবকিছুকেই ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। নগদ লাভের লোভে বিনষ্ট করা হচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব। এসবের প্রভাবে সামষ্ঠিক অর্থনীতিতে তারল্য সংকট, বিনিয়োগ সমস্যা, সুদের হারের অস্থিরতাসহ নানা রকমের অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হচ্ছে। শোষকদের নিজেদের হাতে সৃষ্টি করা ক্ষমতার ভারসাম্য ও ‘প্রশান্তির কাঠামো’ ভেতর থেকেই আজ অস্থিরতা নৈরাজ্য ও ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে। অর্থনীতি, সমাজ, রাজনীতি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ এখন কালো টাকার মালিক লুটেরা ধনীকদের হাতে চলে গেছে। ‘রাজনীতি’ দখল করে নিয়ে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে, তারাই এখন দেশের মালিক বনে গেছে। দেশে এখন একটি ‘ক্রিমিনাল সিন্ডিকেটের’ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অপরাধ চক্রের ‘মূল সর্দারের’ আসনটি ‘রাজনীতি ও ‘অর্থশক্তিকে’ পেছনে ফেলে ‘রাষ্ট্রযন্ত্রের’ হাতে চলে গেছে। এর দ্বারা রাষ্ট্রের চরিত্রে নতুন মাত্রিকতা যুক্ত হয়েছে। ৩০ লাখ মানুষ বুকের রক্ত দিয়ে এদেশকে স্বাধীন করেছে। সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ–এই চার মূলনীতির ধারায় দেশকে পরিচালিত করার যে স্বপ্ন সেদিন তারা দেখেছিল, তা আজ ছিনতাই হয়ে গেছে। শোষণ, দারিদ্র্য, বৈষম্য, অন্যায়-অনাচারে দেশ আজ ডুবতে বসেছে। একদিকে দারিদ্র্যের সাগর ও অন্যদিকে অল্প কিছু মানুষের হাতে কল্পনাতীত বিত্ত-ভৈবব। দেশে এখন পৃথক দুই অর্থনীতি, দুই সমাজ, দুই দেশ তৈরি হয়ে গেছে। দেশের এই পরিণতির জন্য দায়ী হল দীর্ঘ দিনের সামরিক শাসন, স্বৈরশাসন এবং দীর্ঘতর সময়ের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দু’টি বুর্জোয়া দলের শাসন। এসব প্রতিটি সরকারই সাম্রাজ্যবাদ-নির্ভর লুটেরা ধনবাদী পথে দেশ শাসন করেছে ও করছে। তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো এসব সমস্যা-সংকটের ক্রমবর্ধমান বোঝা। নানা বাধা-বিপত্তি ও জটিলতার মাঝ দিয়েই এগিয়ে যাওয়ার পথ করে নিতে হবে জাতিকে। কাজটি সহজসাধ্য নয় একারণে যে, এখনই হাতের কাছে সৎ, দেশপ্রেমিক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল, বামপন্থিদের একটি ‘বিকল্প’ রাজনৈতিক শক্তির অস্তিত্ব পর্যাপ্ত পরিমাণে দৃশ্যমান না। কিন্তু দেশ ও সমাজকে অব্যাহত পচন থেকে বাঁচাতে হলে এটির প্রয়োজন একান্তভাবে জরুরি ও আবশ্যক। দেশকে আজ যে পচনের মুখে এনে দাঁড় করানো হয়েছে তাতে ‘বিকল্পের’ কোনো বিকল্প নেই।‘বিকল্প’ গড়ে তোলার কাজটি কঠিন হলেও তা অসম্ভব নয়। কারণ তার উপাদানগুলো দেশে বিদ্যমান আছে। তবে সেগুলো এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ‘বিকল্পের’ সব সম্ভাব্য উপাদান ও শক্তিগুলোকে একত্রিত করতে পারলে তা জনগণের মাঝে করে তোলা সহজ হবে। জনগণ শক্তিশালী ‘বিকল্পের’ জন্য অধীর হয়ে আছে। তাই, এক্ষেত্রে যা প্রয়োজন তা হলো ‘বিকল্পের’ সম্ভাব্য শক্তির মধ্যে একাগ্রতা ও একতা।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..