গণতন্ত্রহীনতা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জন্ম দেয়

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মোহাম্মদ শাহ আলম : তিন মাস পর সরকারের এক বছর পূর্ণ হবে। নির্বাচন বা ভোট কি ধরনের হয়েছে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা জনগণ জানে। জনগণকে তা বলার বা বুঝানোর প্রয়োজন নেই। জনগণ জানতে চায় কেন তাদের ভোটাধিকার বারবার ছিনতাই হয়ে যায়? এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? এই সময়কালের মধ্যে আমরা দেখেছি, কৃষক ধানের দামে চরমভাবে মার খেয়েছে। তার উৎপাদন খরচও উঠেনি। এরপর মানুষের ঘরবাড়ি ডুবেছে বন্যায়, পুকুরের মাছ গেছে ভেসে, ফসলের হয়েছে ক্ষতি। জুন মাসে সরকার বাজেট দিয়েছে। ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর সুদের হার কমিয়ে তাদের জীবন করেছে দুর্বিষহ। ধনীদের উপর প্রত্যক্ষ কর না বাড়িয়ে বহুমাত্রিক অপ্রত্যক্ষ কর বাড়িয়েছে। যার সিংহভাগ বোঝা বহন করতে হবে নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত মানুষকে। গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। রান্না ঘরের চুলা, বিদ্যুৎ, সার, শিল্প, চা বাগান, হোটেল, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের আয় বাড়েনি, বেড়েছে খরচ। ফলে দারিদ্র্য বৈষম্য আরেক ধাপ বেড়েছে। ব্যাংক মালিকদের ঋণ দেয়ার সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার, খোদ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু ব্যাংক মালিকরা সে নির্দেশ মানেনি। শেয়ার মার্কেটে ধ্বস অব্যাহত আছে। লিজিং কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকে তারল্য সংকট দেখা যাচ্ছে। ঋণখেলাপির সংখ্যা ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ঠিকভাবে হচ্ছে না। বিদেশে শ্রমিক যাওয়ার প্রবাহ ও হার স্থবির অবস্থায় আছে-কমে গিয়েছে। উন্নয়ন হচ্ছে Jobless উন্নয়ন। সমগ্র আর্থিক খাতে চলছে নৈরাজ্য। শিক্ষা-স্বাস্থ্য নিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা। ডেঙ্গু রোগ মহামারীর ন্যায় ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও এখন একটু কমেছে। কিন্তু যেকোনো সময়ই তা বাড়তে পারে। এই ঘটনায় স্বাস্থ্য বিভাগের সীমাবদ্ধতা, ঘাটতি, সিটি কর্পোরেশনের যোগ্যতা, দক্ষতা, পরিকল্পনা ও দেউলিয়াত্ব দিবালোকের ন্যায় মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠে। সামাজিক নৈরাজ্য থামছে না, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্ষণ, খুন, রাহাজানি, শিশু পাচার, নারী পাচার অব্যাহত আছে। লাঞ্ছনার কারণে নারীদের আত্মহত্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মাদক ব্যবসা অব্যাহত আছে, আবার গতি পেয়েছে। এর সাথে মাফিয়া রাজনীতিবিদ, সামাজিক দুর্বৃত্ত ও প্রশাসনের একাংশ জড়িত। পরিবহনে চলছে চাঁদাবাজি, সড়কে মৃত্যুর মিছিল অব্যাহত আছে। আইনের শাসন নেই। ত্বকী হত্যা, সাগর-রুনি হত্যাা, তনু হত্যার বিচার এখনও হয়নি। বন্ধ হয়ে আছে, থমকে আছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বিত। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি বিপর্যস্ত। রাষ্ট্র-প্রশাসন-বিচার বিভাগ এমনকি সংসদের উপরও কর্তৃত্ব করছে নির্বাহী বিভাগ। সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাস্তবায়নের নির্দেশদাতা হয়ে গেছেন নির্বাহী বিভাগের প্রধান– প্রধানমন্ত্রী। সবকিছুই প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রীক। মানুষ সব সমস্যার সমাধান প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা করে। এটি একটি রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড হতে পারে না। রাষ্ট্র প্রচণ্ড নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের কাছে সরকারি দলও নতজানু, পুরোপুরি নির্ভরশীল। বিশেষ করে গত নির্বাচনের পর জনবিচ্ছিন্নতার কারণে আরও প্রশাসননির্ভর হয়ে পড়েছে সরকারি দল। গণতন্ত্রহীনতার কারণে রাষ্ট্র আরও গণবিরোধী deep state এ পরিণত হয়েছে। লুটেরা ব্যবসায়ী, লুটেরা আমলা, ক্যাডার নির্ভর লুটেরা রাজনীতিবিদের এক পাপচক্র রাষ্ট্র-প্রশাসন-রাজনীতি-অর্থনীতি-সংসদ সবকিছু দখল করে নিয়েছে। ২০১৪-২০১৮ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে বর্তমান শাসকদল নির্ভর করেছে রাষ্ট্রযন্ত্র ও পাশের দেশ ভারতের উপর। যা এদেশের জনগণ দেখেছে। তাই রাষ্ট্রের উপর এবং জাতীয় স্বার্থ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সরকারি দলের হাতে নিরঙ্কুশ আছে বলে মনে হয়। তাই আমরা দেখি আসামের এনআরসি বা নাগরিকপঞ্জি, তিস্তার পানি, সীমান্ত হত্যা নিয়ে সরকার নিশ্চুপ। কাশ্মীরের জনগণের মানবাধিকার নিয়ে সরকারের কণ্ঠ ‘ডিপ্লোমেটিক’। বর্তমান সরকার দলের শক্তি যদি জনগণ হতো এরকম হতো বলে মনে হয় না। কণ্ঠ হতো দৃঢ়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ইন্ধিরা গান্ধীকে বলেছিলেন- ‘মিসেস গান্ধী আপনার সেনাবাহিনী আপনি কখন আমার দেশ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন?’ এই কথা উনি বলতে পেরেছিলেন কারণ উনার পায়ের তলায় মাটি ছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিদেশনীতির এই অবস্থার জন্য বিরোধী দলের দেউলিয়াত্ব ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতিও কম দায়ী নয়। আমরা দেখেছি শাসকশ্রেণির দুই দলের দ্বন্দ্বের রাজনীতিকে বিদেশি শক্তিগুলি ব্যবহার করে। এর ফলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে একটু বলে রাখা উচিৎ মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় জনগণের ও সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ও আত্মত্যাগ আমাদের দেশের মানুষ কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে। আসামের এনআরসি-রোহিঙ্গা বিষয় আমাদের জন্য অশনি সংকেত ও বোঝা। রোহিঙ্গা বিষয় ইতিমধ্যে জটিল রূপ ধারণ করেছে। আমেরিকা এতে নাক গলানো শুরু করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আমেরিকান তৎপরতা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানের জন্য নাকি তার ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য? আমেরিকা আমাদের দেশে সামরিক ঘাঁটি করতে চায়। শোনা যায়, চীনকে ঘেরাও করার জন্য। আমাদের দেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির এই দশা কেন? মানুষের গণতান্ত্রিক ও ভোটাধিকার কেন বারবার ছিনতাই হয়ে যায়। কারণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারের সাথে তথাকথিত বাজার অর্থনীতির পতাকাবাহী লুটেরা শাসকশ্রেণির শ্রেণিস্বার্থ সাংঘর্ষিক। ড. মঈনুল ইসলামের প্রবন্ধের একটি উদ্ধৃতি এই বক্তব্যের সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। খ্যাতনামা ব্রিটিশ পত্রিকা ‘দি ইকনমিস্ট’ বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থাকে ‘চৌর্যতন্ত্র’ (kleptocracy) নামে অভিহিত করেছে। “আমি এই শাসনকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজাম (crony capitalism) বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ’-এর ক্লাসিক নজির হিসেবে অভিহিত করে চলেছি। জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলের তিন সরকারপ্রধান এরশাদ, বেগম জিয়া এবং শেখ হাসিনা এই ক্রোনি ক্যাপিটালিজমকে লালন করে চলেছেন, যার ফলে তাঁদের আত্মীয়-স্বজন, ক্ষমতাসীন দল বা জোটের নেতাকর্মী এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, সামরিক অফিসার এবং আমলারা পুঁজি লুণ্ঠনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ধন-সম্পদ আহরণ করতে সমর্থ হয়েছেন। ক্ষমতাসীন সরকারগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতিরেকে এদেশে সৎভাবে ধন-সম্পদের মালিক হওয়া প্রায় অসম্ভব বিবেচিত হয়ে থাকে।” এই কারণে গণতন্ত্র বারবার নির্বাসনে যায়। “আজকের বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে সন্ত্রাসী-মাস্তান-কালো টাকার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে তার পেছনে রাজনীতির বৈশ্যকরণ (commercialisation) ও দুর্বৃত্তায়ন (criminalisation) প্রক্রিয়া প্রধান ভূমিকা পালন করছে এবং রাষ্ট্রচরিত্রই নিঃসন্দেহে তার জন্যে সংঘটক উপাদান।” (বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আর বৈষম্য: সমাধান কোন্ পথে, পৃষ্ঠা-৩৩)। গণতন্ত্রহীনতা ষড়যন্ত্র, চক্রান্তের রাজনীতির সহায়ক। নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও হঠকারী রাজনীতি জন্ম দেয়। গত ২০১৪, ২০১৮ সালের নির্বাচনও গণবিরোধী ও ষড়যন্ত্রকারী শক্তির জন্য পরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করেছে। গণতন্ত্র, ভোটাধিকার স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ক্ষমতার পরিবর্তন করলে হবে না, তার জন্য চাই ব্যবস্থা ও নীতির পরিবর্তন। ব্যবস্থা ও নীতির পরিবর্তনের জন্য গড়ে তুলতে হবে জনগণের সংগ্রামী ঐক্য। গড়ে তুলতে হবে জোট-মহাজোটের বাইরে বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প। সমস্ত ঝুঁকি নিয়ে নামতে হবে কলে-কারখানায়, গ্রামে-গঞ্জে, স্কুল কলেজে। গড়ে তুলতে হবে গণআন্দোলন-শ্রেণি আন্দোলন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..