শহরে চড়ুই পাখির সুরক্ষায় অসাধারণ উদ্যোগ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রকৃতি ডেস্ক : কাক-চড়ুই শহুরে জীবনের অঙ্গ। কিন্তু নগরসভ্যতার চাপে পাখি উধাও হয়ে যাচ্ছে। ভারতে এক ব্যক্তি নিজস্ব উদ্যোগে কৃত্রিম বাসা তৈরি করে চড়ুই পাখির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াচ্ছেন তিনি। এককালে যে চড়ুই পাখি সর্বত্র দেখা যেত, এখন অস্তিত্ব লোপ পাওয়ার কারণে তার কদর বেড়ে গেছে। এমন পাখি হারিয়ে যাওয়ার জন্য মানুষ ও পাখির মধ্যে আবেগের সম্পর্কের অভাবকেই দায়ী করা হয়। অথচ পাখিই মানুষের সবচেয়ে পুরানো বন্ধুদের মধ্যে পড়ে। খোলামেলা ঘরে ভরা আধুনিক ভবনগুলিতে পাখি কোথাও বাসা বাঁধতে পারে না। সেখানে ফাটল, কোণা বা তাক নেই। শুধু বসতবাড়ির অবস্থা এরকম নয়। ইকো রুটস ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা রাকেশ ক্ষত্রী মনে করেন, ‘যেখানে সবুজের সমারোহ ছিল, নগর পরিকল্পনার আওতায় সে সব জায়গা কংক্রিটের কাঠামোয় ভরে গেছে। তাহলে পাখিরা কোথায় চলে গেছে? আমরা তাদের বাড়িতে স্থান দেই না, হৃদয় থেকেও সরিয়ে দিয়েছি। আজ তাদের কাছেই ঘেঁষতে দেওয়া হয় না।’ রাকেশ ক্ষত্রী পেশায় তথ্যচিত্র পরিচালক। কাকতালীয়ভাবে তিনি চড়ুই পাখির সংরক্ষণকারী হয়ে উঠেছেন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দিল্লির দক্ষিণে আমার দপ্তর ছিল। সেখানে যাবার পথে ঝাঁকঝাঁক পাখি দেখে আমার মন ভালো হয়ে যেত। একদিন দেখলাম, যে পাইপের মধ্যে পাখি বাসা বাঁধতো লোকে তা ভরাট করে দিচ্ছে। প্রশ্ন করতে তারা বললো, নোংরা ছড়িয়ে পড়া এড়াতেই তারা এই কাজ করছে। আমি তাদের বললাম, এই পাখির সংখ্যা এমনিতেই কমে আসছে এবং তারা সমস্যাটিকে আরও প্রকট করে তুলছে। তারা বললো, তারা শুধু নির্দেশ পালন করছে। তখন আমি কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে বললাম, যে পরিবেশ ট্রাইব্যুনালে গিয়ে নালিশ করতে পারি। ভারতের জাতীয় পরিবেশ ট্রাইব্যুনালের কাছে নালিশ করার হুমকি দিতে কাজ হলো। তারপর রাকেশ ক্ষত্রী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাস্তার ধারে ১০০টি কৃত্রিম পাখির বাসা তৈরি করেন। ফলে চড়ুই পাখি আবার ঘর বাঁধতে পারলো। এমনকি এতে আশ্বস্ত হয়ে তারা আবার ডিম পাড়তেও শুরু করলো। ফাউন্ডেশন গড়ে সার্বিক উদ্যোগ : এই সাফল্যে অভিভূত হয়ে পাখি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে রাকেশ ইকো-রুটস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি সারা দেশে স্কুল পড়ুয়াদের জন্য ওয়ার্কশপ আয়োজন করেন। যে কেউ শহরে পাখি বাঁচাতে চাইলেই তিনি সেই ডাকে সাড়া দেন। কৃত্রিম বাসা তৈরির পদ্ধতি শিখতে মাত্র ৪০ মিনিট সময় লাগে। নারিকেলের তন্তু, পাট ও বাঁশ দিয়ে পাখির বাসার নকল তৈরির চেষ্টা করা হয়। এই উদ্যোগের গুরুত্ব সম্পর্কে রাকেশ ক্ষত্রী বলেন, ‘আমাদের ইকোসিস্টেমের জন্য এই পাখি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাখি আসলে ইকোসিস্টেমের স্বাস্থ্যের নির্দেশক। পাখি আমাদের জন্য ক্ষতিকর পোকামাকড় খায়।’ পাখি সংরক্ষণের গুরুত্ব : প্রোফেসর সুদীপ্ত চ্যাটার্জি ২০ বছর ধরে জঙ্গল সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করেন। তিনি মনে করেন, ইকোলজিকাল বা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে চড়ুই পাখি সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ‘এই প্রজাতি অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের। বিজ্ঞানের সংজ্ঞা অনুযায়ী এই প্রজাতি ‘ডোমেস্টিকাস’। অর্থাৎ মানুষের বসতির কাছাকাছি এদের দেখা মেলে। তবে এই সংজ্ঞা আসলে সার্থক নয়। গোটা দেশে, গোটা বিশ্বে চড়ুই ছড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পাখির সংখ্যা কমে এলেও এই প্রজাতির অস্তিত্ব নিয়ে প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সংগঠনের মাথাব্যথা নেই। ‘লিস্ট কনসার্ন’ বা সবচেয়ে কম উদ্বেগজনক তালিকায় তাদের রাখা হয়েছে।’ ওয়ার্কশপ চালু করার পর থেকে রাকেশ ক্ষত্রী এক লক্ষেরও বেশি পাখির বাসা তৈরি করেছেন। তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার স্কুলে গিয়ে নিজের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। সংরক্ষণবাদী হিসেবে তাঁর দাবি, কৃত্রিম পাখির বাসার সাফল্যের হার প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে শহরাঞ্চলে পাখির সংখ্যা আবার বাড়তে শুরু করেছে। আগামী দুই থেকে তিন বছরে তিনি আরও আড়াই লাখ পাখির বাসা তৈরি করতে চান।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..