মানবদরদী কমরেড শান্তি দত্ত

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা ফিচার : কমরেড শান্তি দত্ত। পারিবারিক নাম শান্তি ভট্টাচার্য। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ থানার মান্দারকান্দি গ্রাম। ব্রিটিশ আমলে এই মান্দারকান্দি গ্রামে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির গোপন শক্তিশালী ঘাঁটি। মান্দারকান্দি গ্রামকে বলা হতো কমিউনিস্ট পার্টির গ্রাম। কমরেডের গ্রাম বলা হতো। মান্দারকান্দি গ্রামকে ১২০ জন কমরেডের গ্রাম বা ছয় কুড়ি কমরেডের গ্রাম বলা হতো। মান্দারকান্দি গ্রামে এত কমরেড ছিলো, কোনও মহকুমায় এত কমরেড ছিল না। ব্রিটিশের পুলিশ সব সময় নজর রাখতো মান্দারকান্দি গ্রামের দিকে। ১৯২৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর শান্তি দত্ত মান্দারকান্দি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হলেন পোস্টমাস্টার কুমারানন্দ ভট্টাচার্য। শান্তি লেখাপড়া করেন সিলেট কিশোরীমোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। শান্তি দত্তের বড় ভাই অপুর্ব কুমার ভট্টাচার্য ছিলেন মান্দারকান্দি গ্রামের কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুগান্তর, অনুশীলন পার্টি, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা হতো মান্দারকান্দি গ্রাম থেকে। শান্তি দত্ত মান্দারকান্দি গ্রামে গঠন করেন বিশাল কিশোর বাহিনী। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ সেখান থেকে দেয়া হতো। গণনাট্য সংঘের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন শান্তি। ১৯৩৯ সালে শান্তি দত্ত সিলেট কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী থাকাবস্থায় ব্রিটিশবিরোধী মিছিলের নেতৃত্ব দেন। বহু কাজ করার পর মাত্র তের বছর বয়সে শান্তি দত্তকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রাথমিক সদস্য পদ দেয়া হয়। ১৯৪২ সালে সিলেট কিশোরী মোহন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে মেট্টিক পাস করেন। ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ সরকরের সিআইডি পুলিশ শান্তি দত্ত ও তার ছোট বোন লক্ষ্মীকে গ্রেফতার করে সিলেট কারাগারে দু’মাস বন্দি করে রাখেন। ১৯৪৪ সালে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ১৯৪৫ সালে শান্তি শিলচর গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৪৬ সালে শিলচর কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৪৯ সালে তাকে সিলেট জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ দেয়া হয়। ১৯৫০ সালে শান্তি দত্ত বিয়ে করেন হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার স্বজনগ্রামের ঐতিহাসিক দত্ত বংশের সন্তান রায় বাহাদুর অ্যাডভোকেট সতীশ চন্দ্র দত্তের ছেলে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা কমরেড বারীন দত্তকে। কমরেড বারীন দত্তকে বিয়ে করার পর থেকেই তিনি শান্তি ভট্টাচার্য থেকে শান্তি দত্ত হয়ে যান। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ওই বছরই স্বামীর সাথে সিলেট থেকে ঢাকায় চলে যান। কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে স্বামী-স্ত্রী দুজন সক্রিয় হন। ঢাকার আসার পর পাকিস্তান সরকার দুজনের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করেন। ঢাকা শহরে শান্তি দত্তকে থাকতে হয়েছে অনেক কষ্টে। অনেক সময় বস্তিতে রাতযাপন করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে মহিলাদের নিয়ে ঢাকায় গোপন মিটিং করেন শান্তি দত্ত। এই বৈঠকে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। ৬ এপ্রিল কমিউনিস্ট পার্টির ক’জন হুলিয়াদারি কমরেডসহ ভারতের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। এর পর স্বাধীনতাযুদ্ধের অন্যতম সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী ক্যাম্পে খাবার ও বস্ত্র বিতরণ করেন। রাশিয়া ও সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে আসা খাবার ও বস্ত্র ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে নিজ হাতে বিতরণ করে প্রশংসনীয় হন। তিনি নিজের হাতে রান্না করে শরণার্থী শিবিরে খাবার নিয়ে যেতেন। ১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর কমরেড শান্তি দত্ত ঢাকা শহরের মগবাজারে বস্তিবাসী ছিন্নমূল ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় খুলেন। সেই সময় ইস্কাটনের ইস্পাহানি কলোনির উল্টো দিকে অবস্থিত একটি অবাঙালির বাড়ি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কমরেড শান্তি দত্তকে দান করেন। শান্তি দত্ত বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে বিদ্যালয় দাঁড় করানোর কাজে আদাজল খেয়ে নামেন। সাংবাদিক লায়লা সামাদ বিদ্যালয় করার জন্য অনেক আর্থিক সহযোগিতা করেন। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর কমরেড শান্তি দত্ত আত্মগোপনে চলে যান। শান্তি দত্তের পক্ষে সে সময় প্রকাশ্য থাকা সম্ভব ছিল না। তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য সামরিক সরকার অনেক চেষ্টা চালায়। মগবাজারে শান্তি দত্তের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তাঁর নিজের হাতে গড়া বিদ্যালয়টি বেহাত হয়ে যায়। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিদ্যালয়ের পরিবেশের টানাপোড়নে ছাত্রছাত্রীরাও একে একে ঝরে পড়তে শুরু করে। ফলে বিদ্যালয়টি এক পর্যায়ে নষ্ট হয়ে যায়। কমরেড শান্তি দত্ত সব সময় শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতেন। অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন। নিজস্ব উদ্যেগে মগবাজারে মহিলা পরিষদের একটি শাখা গঠন করেন। দরিদ্র নারীদের সংগঠিত করে একটি সমবায় সমিতি করে তাদের হাতের কাজ শেখানো শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে তাঁর একমাত্র পুত্র কিশোর কুমার দত্ত ভারতের কলকাতায় থাকায় সেখানে চলে যান শান্তি দত্ত। কলকাতায় গিয়েও কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই) এর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ২০০১ সালের ২২ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন আজীবন সমাজতন্ত্রী এই বিপ্লবী নারী। একমাত্র ছেলে কলকাতা প্রবাসী কিশোর দত্ত বাবুল এবং একমাত্র মেয়ে মালয়েশিয়া প্রবাসী ড. কুমকুম দত্ত লিলি সহ অনেক আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন তিনি। কমরেড শান্তি দত্ত ছিলেন সরলপ্রাণ, উদার, বিশ্বাসে স্থির এক নির্ভীক অসাধারণ মানবদরদী ব্যক্তিত্ব। এই কমিউনিস্ট নেত্রীকে আমরা হারালাম। তাঁকে লাল সালাম।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..