উন্নয়নের বলিহারি-দুনিয়ার তৃতীয় নিকৃষ্টতমের তিলক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ডা. সাজেদুল হক রুবেল: উন্নয়ন আর উন্নয়ন। ইলেক্ট্রনিক, প্রিন্ট আর সোশ্যাল মিডিয়া– সর্বত্রই আওয়ামী লীগ সরকারের প্রচারের ঢোল-বাজনা। প্রজেক্ট আর মেগা প্রজেক্টের ভারে বাংলাদেশ আর জনগণ রীতিমত ক্লান্ত-শ্রান্ত। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা কী? কতটা উন্নয়ন আর কতটা লুটপাট? আমাদের প্রিয় শহর ঢাকাকে নিয়ে গত ৩০ আগস্ট ২০১৯, দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছে। সে প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়, বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। বসবাস যোগ্যতার দিক দিয়ে ১৪০টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৩৮তম। ঢাকার চেয়ে খারাপ অবস্থা কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর সিরিয়ার দামেস্ক ও নাইজেরিয়ার শহর লাগোস। যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত বাণিজ্য বিষয়ক প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এর গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমি ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) এই তালিকা প্রকাশ করে। গণতন্ত্রহীন, কর্তৃত্ববাদী শাসকশ্রেণি উন্নয়নের এহেন স্বীকৃতি হয়তো খুব সহজে হজম করবে। এ প্রতিবেদন বেমালুম অস্বীকার করে ভিন্ন কোনো বাগাড়াম্বরে ব্যস্ত থাকবেন। আওয়ামী লীগ সরকার ও ঢাকার দুই মেয়র কোনো চাপই হয়তো এতে বোধ করবেন না। কারণ জনগণের ম্যান্ডেট তাদের দরকার নেই। তাই জবাবদিহিতাও তাদের দরকার নেই, ভোটেরও দরকার নেই। নির্বাচিত হওয়ার জন্য আছে তো রাতের বেলার ভোট ডাকাতির ডিজিটাল পদ্ধতি। কিন্তু আমরা যারা ঢাকার সাধারণ গণমানুষ আমাদের তো বাঁচতে হবে পৃথিবীর বসবাসের জন্য নিকৃষ্টতম এই শহরেই। ঢাকার গণমানুষ সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত, কর্মজীবী, শ্রমজীবী মানুষেরা। যাদের জীবন-জীবিকা এই ঢাকা, যাদের স্বপ্ন, ঐতিহ্য, গৌরব এই ঢাকা, তাদের আর কোথাও যাবার নেই। সমস্যা থেকে বের হতে প্রথমেই চাই সমস্যার প্রকটতাকে নির্মোহভাবে উপলব্ধি করা। আর এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার, সিটি কর্পোরেশন উভয়ই নির্বিকার, ইংরেজিতে ‘ড্যাম কেয়ার’। ঢাকার সমস্যা এবং নাগরিক জীবনের অসহনীয় যন্ত্রণার পরিস্থিতি বহুবার ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদপত্রে কলাম লেখা হয়েছে। টিভি টক শোতে আলোচনা হয়েছে। সেমিনার সিম্মোজিয়াম হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তন হয় নাই, কিংবা পরিবর্তন করা যায় নাই। সমাধান বা পরিবর্তনে মূল বাধাগুলোকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। কঠিন হলেও সমাধানের জন্য জোড় লড়াই প্রয়োজন। ঢাকার ২টি সিটি কর্পোরেশন ব্যর্থ। ঢাকার উন্নয়নের ৭/৮টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৫৫/৫৬টি সংস্থা যুক্ত। সিটি কর্পোরেশন আর এই সরকারি সংস্থাগুলো এদের মধ্যেই ঢাকা সমস্যার সমাধানের মূল প্রতিবন্ধকতা বিরাজ করছে। সিটি কর্পোরেশনের মেয়র-কাউন্সিলররা যেমন দায়িত্ব নিয়েছেন অবৈধ পথে, তেমনই সমগ্র কর্পোরেশনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে চলে অবৈধ আয়ের কার্যক্রম। দুর্নীতিগ্রস্ত সিটি কর্পোরেশন অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। ঢাকাকে তিলোওমা নগরে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় এবং এর নামে লুটপাটে সিটি কর্পোরেশনের পাশাপাশি জড়িত রয়েছে সরকারের নানা প্রতিষ্ঠান। সরকারের দুর্নীতি, লুটপাট পরিবর্তনের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক। সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বা পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশন বরাবরই ব্যর্থ। এ বছর সময়মতো মশক নিধন কর্মসূচি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হওয়াতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ এডিস মশার কারণে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছে। ডেঙ্গুর কারণে মৃত্যু পূর্বের সকল রেকর্ড ভেঙে ফেলেছে। ঢাকাকে বাসযোগ্য গড়ে তোলার প্রেক্ষিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তরায়। যানজট, গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি, বাড়ি ভাড়া, আইন কার্যকর না হওয়া, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অপহরণ, গুম, খুন, ধর্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা, ভাঙা রাস্তাঘাট, শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ– এ সকল সমস্যা অতীতে কিংবা নিকট অতীতে যেমন বিদ্যমান ছিলো, তেমনই বর্তমানেও রয়েছে। বরং সমস্যাসমূহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে হাসিনা সরকারের মেগা উন্নয়নের প্রসব বেদনা। মেট্রোরেল র্যাপিড ট্রানজিট, ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে ঢাকা সড়ক ব্যবস্থা রীতিমত ভেঙে পড়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্দেশ দিয়েছেন, মহাসড়কে টোল বসানোর। জনগণ অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্য দিয়ে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর অতিক্রম করছে, ঢাকার মেগা প্রজেক্টসমূহে নির্মাণের কারণে। জনগণ শঙ্কিত মেট্রোরেল তৈরি হবার পর এর ভাড়া তাদের আওতার মধ্যে থাকবে কিনা। নতুন নতুন যে ফ্লাইওভার তৈরি হচ্ছে তার ওপর আবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে টোল বসানো হয় কিনা? সংকট মোকাবিলায়, উত্তরণে সরকারের যে রাজনৈতিক দর্শন, পরিকল্পনার যে দর্শন, তাই যথেষ্ট- ঢাকাকে বসবাসে নিকৃষ্ট এক শহরে রূপান্তরিত করার জন্য। সারাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি, গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতির ভঙ্গুর পরিণতি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ না করা, পর্যাপ্ত গুরুত্ব, পরিকল্পনা, সুবিধা দিয়ে অন্য শহরগুলো গড়ে না তোলা, নদীভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের অভাব অব্যাহত থাকলে ঢাকায় মানুষের স্রোত আসবেই। ঢাকার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে জনসংখ্যা দুই কোটিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ দেশের আট ভাগের এক ভাগ মানুষ এখন ঢাকায় থাকেন। সারাদেশের গরিব মানুষের তিন ভাগের এক ভাগ ঢাকায় বসবাস করছেন। এহেন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকার দুই মেয়র দুই সিটি কর্পোরেশন পুরোপুরি অক্ষম। একদিক দিয়ে সিটি কর্পোরেশন দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পনায় অদক্ষতা রয়েছে, লোকবলের ঘাটতি রয়েছে, অপরদিকে রয়েছে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা। ঢাকা মহানগরে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, সড়ক ও পরিবহন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এসব কিছুর নিয়ন্ত্রণ এই সিটি কর্পোরেশনগুলোর আওতার বাইরে। আবর্জনা ময়লা পরিষ্কার, পয়ঃনিষ্কাশন, মশক নিধন বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, এরূপ হাতে গোনা কয়েকটি কাজ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বে। নির্বাচনের সময়ে শাসক শ্রেণির মেয়র প্রার্থী অথবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা- ‘মানবিক ঢাকা গড়বেন’, ‘সবুজ ঢাকা গড়বেন’, ‘বাসযোগ্য ঢাকা গড়বেন’ যেই শ্লোগানই তুলেন না কেন, নির্বাচিত হবার পর ঢাকাকে পরিবর্তন করার কোনো মৌলিক ক্ষমতাই তাদের থাকে না কিংবা থাকবে না। অর্থাৎ দুই সিটি কর্পোরেশন, আর সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা সংকট সৃষ্টির প্রধান কারণ। সমাধান একটাই, তা হলো– নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করা। আজকের ঢাকার হর্তা-কর্তাদের মনোভাব, প্রবণতা, সিদ্ধান্ত ও কাজ দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট যে তাদের উন্নয়ন নীতি বা দর্শনে খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের ঠাঁই নাই। যাদের শ্রমে-ঘামে এ শহর চলে, এদেশের অর্থনীতির চাকা চলে, তারাই যেন এ শহরে অছ্যুত। তাই দেখি আগুন দিয়ে বস্তি উচ্ছেদ, হকার উচ্ছেদ, চলতেই থাকে। চোখে পড়ার মতো উন্নতি দেখা যায় গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরায় মডেল টাউনে। এই বৈষম্যমূলক নীতি ও নীতি নির্ধারকরা যতদিন নগরের ক্ষমতা দণ্ডে থাকবেন, ততদিন ঢাকা ‘সবার জন্য’ বাসযোগ্য হবে না। পৃথিবীর নিকৃষ্টতম শহরের দুর্নাম হতে আমাদের প্রিয় শহর ঢাকাকে মুুক্ত করতে সবার জন্য বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে চাই– সিটি গভর্মেন্ট। অবশ্যই এটা নির্বাচিত হতে হবে জনগণের ভোটের মাধ্যমে। আগের রাতের অন্ধকারে ডিজিটাল কায়দায় নয়। সেই নেতৃত্ব, কর্তৃপক্ষ গণমুখী সিদ্ধান্ত নিবেন, যারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন বা থাকবেন। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণই জনগণের জন্য কাজ করবেন। অবৈধ পথে নির্বাচিত হলে, যাদের সহায়তায় নির্বাচিত হবেন তাদের পক্ষেই তাদের স্বার্থেই প্রশাসন পরিচালিত হবে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মেয়র-কাউন্সিলরাই দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন করতে পারে, নিশ্চিত করতে পারে নাগরিক অধিকার। ‘সবার জন্য বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে’ চাই গণমানুষের আন্দোলন। নগর সরকারের দাবিতে, ভোটের অধিকারের দাবিতে, বাঁচার মত বাঁচতে চাওয়ার দাবিতে গণমানুষের আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..