বিপর্যয়ের মুখে কৃষি : বিপন্ন কৃষক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আহমদ সিরাজ: ‘বাবু বলে যত পরিষদ তার শত’ এমন স্তুতি-বন্দনা-জমিদার রাজা বাদশাদের আমলে নিবেদিত হয়েছে। অধুনা নাগরিক সভ্যতায়ও স্তুতি বন্দনার কমতি দেখা যায় না, বরং গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আগড়ালে নয় একেবারে প্রকাশ্যে যেভাবে নেতানেত্রীর বন্দনা গীতিতে এক শ্রেণির অংশগ্রহণকারী নিয়োজিত থাকে, তা কেবল বিস্ময়করই নয়, ভীতিকরও বটে। স্তুতি বন্দনার তীব্রতার চুল্লি এমনই যে এর উত্তাপ সম্পর্কে সতর্ক না থাকলে আমজনতার অস্তিত্ব পর্যন্ত বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে। যে দেশে তেমন পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে সেই দেশে শাসকের চোখের কাছে অন্য কোনও চোখ থাকে না। এই একটি মাত্র চোখই নিশানা থাকে- এর বাইরে কোনও নিশানা থাকে না, তা যদি থাকে তাহলে সেই চোখ হয়ে উঠবে শত্রুর চোখ–তখন বুঝতে হবে যদি বলা হয়ে উঠে সূর্য্য পশ্চিম দিকে উঠে, পূর্ব দিকে অস্ত যায়, তখন বন্দনার মহাত্ম্য এমন হয়ে উঠে যে, হ্যাঁ সূর্য্য পশ্চিমে উঠে- পূর্বে অস্ত যায়। দেশের বন্দনাগীতির মহাত্ম্য দেশের যতসব অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে তার একটা চোখের দ্বারাই ঘটে চলেছে, তা বুঝে নিতে হবে। বাকি সকল চোখ নীরব, বন্দনার চোখগুলো সরব। চোখে চোখ রাখার দুঃসাহস থেকে নয়–সমস্ত বন্দনা ও স্তুতিতে সম্মান সম্মুখে রেখে কিছু নীরব চোখের ভাষা থেকে মানুষের দুঃখের সকালে ও বিবেলে ঘটে যাওয়া কিছু চালচিত্র তুলে ধরার প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে। কে না জানে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষক আদি-অনাদিকাল থেকে চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত থেকে ফসল উৎপাদন করে খাদ্যের সংস্থান করে। যুগে যুগে এই কৃষক জীবন বিপন্ন করে হলেও জমি চাষ করে ফসল ফলিয়ে মানুষের জীবন, রাজা বাদশাসহ সকলের জীবন রক্ষা করেছে। আহার যুগিয়েছে কিন্তু তাহার জীবনের দুর্দশার শেষ হয়নি, ফসল তাঁর ঘরে উঠেনি। এক সময় জমিদারদের দৌরাত্ম্যে কৃষি ও কৃষকের জীবন জুলুম নির্যাতনে কাটাতে হয়েছে। জমিদারের জুলুম নির্যাতনের সঙ্গে রাষ্ট্রের গাঁটছড়ায় যখন কৃষককে মরণপণ পরিস্থিতে পড়তে হয়, তখন স্থানে স্থানে কৃষকরা সংগঠিত হয়ে জমিদার বিরোধী, শাসক বিরোধী লড়াই সংগ্রাম করেছে, যা ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। যা স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বৃহত্তর কৃষক চেতনায়ও অন্তর্লীন হয়েছে। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধে হাড্ডিসার, নেংটিসার, লুঙ্গি পরিহিত কৃষক ও গ্রাম বাংলার কৃষকের সন্তানরাই ঝাঁকে ঝাঁকে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছে–তাদের সংখ্যা সত্তর শতাংশের উপরে হবে। লেখাপড়া না জানা, কম জানা এই কৃষকের সন্তানরাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাক সেনাদের মোকাবিলা করে লড়াই করে জীবন দিয়েছে। শহীদের তালিকায় কৃষকদের সন্তানদের সংখ্যা নিরঙ্কুশভাবে গরিষ্ঠ। কারো ভালো লাগা, মন্দ লাগা থেকে নয় মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ থেকে উৎসারিত গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপক্ষেতা ও সমাজতন্ত্র সংবিধানের অন্যতম উচ্চস্তম্ভ হিসাবে বিবেচ্য হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এগুলো দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চকিত করেছেন। তিনি এদেশের মানুষের মুক্তির নিশানা হিসাবে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রূপায়নে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন। তিনি নেই কিন্তু তিনি যে শোষণহীন, বৈষম্যহীন বাংলার মানুষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাংলার কৃষকের অবস্থা ব্রিটিশ পাকিস্তান আমলের চেয়েও কোনও অংশে কম নয়। এই কৃষক দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করলেও যাহারা মেহনত করে ফসল উৎপাদন করে তারা ফসলের মূল্য থেকে বঞ্চিত থাকে। প্রতিনিয়ত তারা ফসলের ন্যায্যপ্রাপ্তি থেকে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। কৃষকের নামে এক শ্রেণির ফড়িয়া, দালাল, লুটপাটকারী শক্তি কৃষকের নায্যমূল্য গ্রাস করে নিচ্ছে। দেশে এখন গরিব কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, বর্গা কৃষকের সংখ্যা বেশি। তাদের উৎপাদিত ফসল যখন বিক্রি করতে যায়, তখন ধানের দাম পায় না, কম দামে তারা হাটে বাজারে, আড়তে তা বিক্রি নিঃশেষিত হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন বোরো, আউশ, আমন ধানের চাষ হয়ে থাকে। স্থান ভেদে চাষাবাদের মাত্রার তারতম্য থাকে। বোরো ফসলের উৎপাদিত ধানের জমিতে আগুনসহ বঞ্চিত কৃষকের দুর্দশার চিত্র দেশবাসীর জানা আছে। ভয়াবহ বন্দনা ও শ্রুতির তান্ডবের কাছে কৃষকের জীবন ও জীবিকা যতই বিপন্ন হয়ে উঠুক, তা একটা ভয়াবহ ঝড়ের সংকেত নিয়ে নীরবেই পড়ে আছে। সম্প্রতি আউশ ফসলের উৎপাদিত ফসলের দাম নিয়ে আবার কৃষক কেবল বিড়ম্বনায় নয়, তার এ ধান মন প্রতি বিক্রি করতে গেলে ২৮০, ৩০০, ৩২০ টাকায় বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। উপরের ধান ব্যবসায়ীরা এমনভাবে সিল মেরে দাম স্থির করে রেখেছে যে, এর বাইরে কৃষকের যাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে মাঠ থেকে নেওয়া কতিপয় বর্গাচাষির উৎপাদিত ফসল ও খরচের একটা চিত্র দেয়া হল: - বিলাত আলী, কমলগঞ্জ, ৪৫ শতক জমি হালচাষ ১,৬০০/- চারা রোপন ও উঠানো ১,৫০০/- সার ও ওষুধ ৩,৩০০/- নিড়ানি ৫০০/- ধান কাটনো ১,৯০০/- নিজের শ্রম ১,২০০/- মোট ১০,০০০/- ধান প্রাপ্তি ২০ মণ, মালিকের ১০ মণ বাদে বর্গাচাষির ১০ মণ ৩২০ী১০=৩২০০, মোট খরচ ১০,০০০-৩২০০=৬৮০০ টাকা ঘাটতি। সালাম মিয়া, কমলগঞ্জ, ৩০ শতক জমি হালচাষ ১,০০০/- হালি চারা ৫০০/- চারা উঠানো ৪০০/- রোপন ১,০০০/- সার ১,০০০/- ধান কাটানো ১,২০০/- নিজের শ্রম ১,৫০০/- মোট ৭,০০০/- ধান প্রাপ্তি ১২ মণ, মালিকের ৬ মণ বাদে বর্গাচাষির ৬ মণ ৩২০ী৬=১৯২০, মোট খরচ ৭,০০০-১৯২০=৫০৮০ টাকা ঘাটতি। এভাবে বিলাত আলী ক্ষেত করেছে তিন বিঘা, সালাম মিয়া চার বিঘা, রওশন আলী ৫ বিঘা, মাখন মিয়া ৪ বিঘা, কবির মিয়া ৪ বিঘা, আহাদ মিয়া ২ বিঘা, মনা মিয়া ৫ বিঘা, নুর মিয়া ২ বিঘা, রাশিদ মিয়া ৩ বিঘা ইত্যাদি। উপরে মাঠ থেকে সরেজমিনে নেয়া হিসাব থেকে সকলের হিসাব বুঝে নেয়া যায়, যা একই চিত্র বহন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে এমন ভয়াবহ নাজুক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা এই পরিস্থিতির উত্তরণে দৃশ্যত রাষ্ট্র অসহায়। কোনও দেশের রাষ্ট্র যখন মানুষের ভরসার জায়গা হারায়, নীতি-নৈতিকতার ধস নামে, সামগ্রিকভাবে মানুষের একটা বিচ্ছিন্ন অবস্থানে দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। সর্বাঙ্গে ধস স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, মক্তব থেকে শুরু করে এমন কোনও জায়গা নেই, যে ধস নামেনি। রাষ্ট্রের শুদ্ধাচারের একেবারে উঁচু জায়গাও ধস, বুঝে নেয়া ভালো ক্ষমতার জানা অজানা সকল জায়গায়ই ধস বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। একটা দূরের উদাহরণ টেনে পরিস্থিতির ভয়াবহতার একটা সাযুজ্য বুঝে নেয়া যেতে পারে, একদিন হিটলারের বর্বর নৃসংশতার মুখে একেবারে নীরব সংখ্যঘরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি পাস্তুরনিমোনিয়ের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য- “ওরা প্রথম এসেছিল শিক্ষকের খোঁজে, আমি নিশ্চুপ থেকেছি শিক্ষক নই বলে– তারপর ওরা এসেছিল ট্রেড ইউনিয়ন কর্মীদের খোঁজে আমি ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী নই বলে নিশ্চুপ থেকেছি- পরে ওরা এসেছিল ইহুদিদের খোঁজে আমি প্রতিবাদ করিনি, আমি ইহুদি নই বলে- যখন ওরা আমার খোঁজে এসেছিল তখন আমার জন্য প্রতিবাদ করার কেউ ছিল না” আমরা এখন এমন একটা বর্তমানে আছি যে, বর্তমান কেবল বাণিজ্যিক উন্নয়ন বুঝে- যে উন্নয়ন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বহন করতে সক্ষম হয় না বলে উন্নয়ন হয়ে যায় নৈরাজ্যিক ও লুটপাটকেন্দ্রিক। যে বর্তমান মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাকে বহন করে একাত্তরকে সুমহান উচ্চে ধারণ করে সর্বগ্রাসী সংকট ও পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ঝড়ো হাওয়ার মতো একটা আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে চায়- দেশ জাতি এমন বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে। লেখক : সদস্য, মৌলভীবাজার জেলা কমিটি, সিপিবি

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..