‘গণতান্ত্রিক শ্রম আইন’ প্রসঙ্গে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জলি তালুকদার : একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন আমাদের দেশের শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। এদেশের প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠনসমূহ এ দাবিতে লড়াই সংগ্রাম করে আসছে বহুদিন ধরে। আমাদের সংবিধানের চতুর্দশ অনুচ্ছেদে ঘোষিত হয়েছে- মেহনতি মানুষকে তথা কৃষক ও শ্রমিককে এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ থেকে মুক্তি দেয়া হবে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। তা সত্ত্বেও স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরে আমাদের বলতে হচ্ছে চরমভাবে প্রতিক্রিয়াশীল, শ্রমিক স্বার্থবিরোধী এবং মালিকপক্ষের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট শ্রম আইনের পরিবর্তে একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন আমরা পাইনি। বর্তমানে প্রচলিত শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩), সর্বশেষ ২০১৮ সালে সংশোধন করা হয়। যেখানে শ্রমিকদের স্বার্থ পূর্বের তুলনায় আরো বেশি লঙ্ঘিত হয়েছে। এই অবস্থায় অতীত অভিজ্ঞতাসমূহের কারণে আমাদের দেশের শ্রমিক মেহনতি মানুষের মধ্যে আশঙ্কা, উদ্বেগ এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে। অতীতের একেকটি সংশোধনীর সময়, কিংবা যখন শ্রম বিধিমালা গৃহীত হয় তখন সংস্কারের নামে দেশের শ্রমিক শ্রেণির বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। সরকারের ওপর মালিকদের সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণের নগ্নরূপ এবং রাষ্ট্রের চরম শ্রমিকবিদ্বেষী চেহারা প্রতিবারই স্পষ্ট হয়েছে। ব্রিটিশ শাসকদের করা ১৮৮১ সালের ভারতীয় কারখানা আইন, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও গঠিত হবার পর ১৯৩৪ সালে সংশোধিত হয় সেটাই মূলত এদেশের শ্রম ও শিল্প আইনের মূল ভিত্তি। এ আইনটি পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫ সালের কারখানা আইন দ্বারা রহিত হয়। এছাড়াও ১৯২৩ সালের ক্ষতিপূরণ আইন, ১৯২৬ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইন, ১৯২৯ সালের শ্রম বিরোধ আইন, ১৯৩৬ সালের মজুরি প্রদান আইন, ১৯৩৯ সালের মাতৃত্ব সুবিধা আইন, ১৯৩৮ সালের শিশু নিয়োগ আইনসমূহ ব্রিটিশ শাসকদের করা। ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তানে এসব আইনের অধিকাংশই পরিমার্জন ও সংশোধন করে বহাল রাখা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও ১৯৭২ সালের শুরুতে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক এডাপটেশন অব বাংলাদেশ ল’জ অর্ডার জারির মাধ্যমে এসব আইনের অধিকাংশ বহাল রাখা হয়। ব্রিটিশ, পাকিস্তানি ও বাংলাদেশ আমলের ২৫টি আইন রহিত করে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ শ্রম আইন জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে কাউকে আলোচনার সুযোগ না দিয়েই মাত্র দুই মিনিটে এই আইনটি পাস হয়। চরমভাবে শ্রমিক স্বার্থবিদ্বেষী এই শ্রম আইন পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৮ সালে মহাজোট সরকারের দ্বারা সংশোধিত হয়েছে। বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে আইন প্রয়োগের জন্য শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন করেছে। এই ২০০৬ এবং তার পরবর্তী আইন প্রণয়ন, সংস্কার, সংশোধনগুলো প্রত্যেকটি পূর্বের তুলনায় অধিক শ্রমিক স্বার্থবিরোধী এবং আরো প্রতিক্রিয়াশীল। এমনকি শ্রম বিধিমালায় এমন অনেক বিধি সংযুক্ত হয়েছে যা খোদ শ্রম আইনেরই পরিপন্থি। এমতাবস্থায় আসন্ন শ্রম আইন সংশোধন নিয়ে শ্রমিকপক্ষের উদ্বেগ ও আশঙ্কা অত্যন্ত সঙ্গত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সংগঠন করার ও সমবেত হওয়ার অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জবরদস্তিমূলক সকল প্রকার শ্রমকে নিষিদ্ধ করেছে। কর্মের অধিকার; কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিচারে যুক্তিসঙ্গত মজুরির অধিকার; বিশ্রাম, বিনোদন, অবকাশের অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার ইত্যাদিকে সংবিধানে জনগণের মৌলিক প্রয়োজন বলা হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে এই সকল নিশ্চিত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। একই সাথে সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকারসমূহের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন বাতিলের বিধান আছে। প্রচলিত শ্রম আইন বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। দেশের সকল প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠন শুরু থেকেই সংবিধানের সাথে এ আইনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ধারাসমূহ বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় যে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়, তার ২৩ নং অনুচ্ছেদে কাজের অধিকার, সমকাজে সমমজুরির অধিকার, জীবনমান ও উপযুক্ত মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারের কথা ঘোষিত হয়েছে। প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠনসমূহ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা প্রতিপালন করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও’র গভর্নিং বডি যে আটটি কনভেনশনকে মৌলিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে তার মধ্যে সাতটিতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে। কর্মসংস্থানের জন্য নিম্নতম বয়স সম্পর্কিত কনভেনশন-১৩৮ বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেনি। সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও সংগঠনের স্বাধীনতা সম্পর্কিত কনভেনশন-৮৭ এবং সংগঠিত করার অধিকার ও যৌথ দরকাষাকষি সম্পর্কিত কনভেনশন-৯৮ এ বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে ১৯৭২ সালে। কিন্তু অদ্যাবধি আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করেনি। ২০১৭ এর জুন মাসে জেনেভায় অনুষ্ঠিত ১০৬তম আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনে কমিটি অন এপ্লিকেশন অব স্ট্যান্ডার্ড এর সভায় বাংলাদেশ সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনা হয়। সেই আলোচনার প্রেক্ষিতে কমিটি বাংলাদেশ সরকারের জন্য করণীয় সুপারিশ করে। বলা হয়, অবিলম্বে আইএলও কনভেনশন ৮৭ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ করে শ্রম আইন ও বিধিমালা সংশোধন করতে হবে, ইপিজেড-এ শ্রমিকদের প্রকৃত অর্থে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দিতে হবে। কালবিলম্ব না করে ২০১৬ সালের আশুলিয়া এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রমের ওপর বাধা, হামলা, শ্রমিকদের বেআইনি ছাঁটাই ইত্যাদি প্রত্যেকটি অভিযোগ তদন্ত করে নিষ্পন্ন করতে হবে। ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন আবেদন দ্রুত নিষ্পন্ন করা এবং আবেদনের ক্ষেত্রে আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও বাস্তব মানদণ্ডে ব্যর্থ না হলে আবেদন বাতিল করা যাবে না। একই সাথে, কমিটির নভেম্বর ২০১৭ তে অনুষ্ঠিতব্য সভায় বাংলাদেশ সরকারকে এসকল সুপারিশ বাস্তবায়নের রিপোর্ট করতে হয়েছে। যার চাপে সরকারের তরফ থেকে নভেম্বরের পূর্বেই শ্রম আইন সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। ত্রিপক্ষীয় কমিটি গঠন করে, কমিটির শ্রমিক পক্ষ ৩৮টি প্রস্তাব পেশ করেছিল। অবশ্য ২০১৮ সালে সরকার সংশোধনীর প্রস্তাব শ্রমিক পক্ষের কাছে উপস্থাপন না করেই চূড়ান্ত করেছিল। ফলে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সংক্রান্ত বিষয়সহ যে কোনো অসৎ শ্রম আচরণের ক্ষেত্রে মালিকদের দণ্ড লঘু করা হয় এবং শ্রমিকের ওপর অত্যাচারের সুযোগকে আরো অবারিত করা হয়। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন ও আইএলও-র চাপে কোনো প্রতিষ্ঠানে ইউনিয়ন গঠন করতে হলে পূর্বে ত্রিশ ভাগ সদস্য লাগতো, এখন ২০ ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে আইএলওকে এক ধরনের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছে সরকার, বাস্তবে ইউনিয়ন করতে গেলে অযৌক্তিকভাবে তা বাতিল করা হচ্ছে। সম্প্রতি উত্তরায় আমরা ১০ টি ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করলে সব কিছু ঠিক থাকা সত্ত্বেও তা রেজিস্টার্ড অফ ট্রেড ইউনিয়নস থেকে বাতিল করা হয়। অথচ একই সময়ে মালিকদের কিছু পকেট ইউনিয়নকে রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। মাতৃত্বকালীন সুবিধাপ্রাপ্তির ধারাতে সর্বসাকুল্যে সবেতন চার মাস ছুটির কথা বলা আছে, যেখানে সরকারি ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারীরা ছয় মাস ছুটি পান। সামনে শ্রমবিধি সংশোধন করা হবে। ২০১৫ সালে শ্রমবিধি সংশোধনীতে সবচেয়ে ক্ষতিকারক কয়েকটি ধারার মধ্যে একটি ছিল- কারাখানা স্থানান্তরের আইনটি। যেখানে পূর্বে ছিল আট কিলোমিটারের মধ্যে স্থানান্তর হলে শ্রমিকরা তেমন কোন সুবিধা পাবেন না। মালিকদের পরামর্শে পরে এটি ৪০ কিলোমিটার করা হয়। আরেকটি ধারা হচ্ছে- ঠিকাদার সংস্থা দ্বারা শ্রমিক নিয়োগ করা। যার দরুন শ্রমিকরা তাদের নিযোগ পত্র, চাকুরির স্থায়ীকরণ, নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ, ট্রেড ইউনিয়ন ও দর কষাকষি এইসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এই ধরনের মারাত্মক শ্রমিক স্বার্থবিরোধী সকল ধারা শ্রম আইন ও বিধি থেকে বাদ দিতে হবে। আমাদের আগামীর পথ দূর্গম। শ্রমিক স্বার্থপরিপন্থি সকল ধারা বাতিল করে একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন ও বিধিমালা আদায়ের লক্ষ্যে আমাদের কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে আমাদের সাফল্য নির্ভর করবে কত সংখ্যক শ্রমিককে সচেতন করে আমরা আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে পারবো তার ওপর। আজ দেশের প্রগতিশীল শ্রমিক সংগঠনগুলোকে যৌথভাবে এ কাজ এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..