রাখাইন নৃশংসতায় জড়িত সেনাদের বিচার হবে সামরিক আদালতে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংসতার জন্য দায়ী সেনা কর্মকর্তাদের শাস্তি দেবে বলে জানিয়েছে। মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং রাখাইনে নতুন করে তদন্ত করার পর জড়িত সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে কোর্ট মার্শাল বা সামরিক আদালতে বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ২৯ আগস্ট অংয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সামরিক আদালতের কর্মকর্তারা ওই রাজ্যের উত্তরাঞ্চল সফরে গিয়েছিলেন। তারা দেখতে পেয়েছেন, সেনাদেরকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল তারা একটি গ্রামে সেই নির্দেশনার প্রতি দুর্বলতা দেখিয়েছে। ওই গ্রামে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা হয়েছিল বলে বলা হয়। ২০১৮ সালে বার্তা সংস্থা এপি খবর প্রকাশ করে যে, বুথিডাং শহরের গুতারপিন গ্রামে রোহিঙ্গাদের কমপক্ষে ৫টি গণকবরের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু তখন সরকারি কর্মকর্তারা বলেন যে, সেখানে ১৯ জন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে। তাদের মৃতদেহ সতর্কতার সঙ্গে সেখানে কবর দেয়া হয়েছে। তবে সর্বশেষ তদন্তের বিষয়ে সামরিক মুখপাত্র তুন তুন নাইই বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, তদন্তে যা পাওয়া গেছে তা গোপনীয়। এ বিষয়টি তার জানার অধিকার নেই বলে জানান তিনি। যখন তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যাবে তখন এ সংক্রান্ত আরেকটি বিবৃতি দেয়া হবে। নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের হাতে ব্যাপকহারে গণহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের বিষয়ে গত মার্চে মিয়ানমার একটি সামরিক আদালত গঠন করে। এতে রয়েছেন একজন মেজর জেনারেল ও দু’জন কর্নেল। এই আদালত জুলাই ও আগস্টে দু’বার রাখাইন সফর করেছে। বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে নিরাপত্তা চৌকিতে রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিদের হামলার পর সেনাবাহিনী রাখাইনে নৃশংসতা শুরু করে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে সেখানে ভয়াবহ এক তা-বলীলা চালায় সেনারা। এর ফলে কমপক্ষে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সেনাবাহিনীর ওই অভিযানকে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গণহত্যার উদ্দেশে অভিযান বলে আখ্যায়িত করে এবং মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয় ও শীর্ষ স্থানীয় অন্য ৫ জন জেনারেলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ভয়াবহ অপরাধের অভিযোগ আনার সুপারিশ করে। তবে মিয়ানমার এসব অভিযোগকে বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে। যদিও সেনা প্রধান মিন অং হ্লাইং গত মাসে বলেছেন, নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের কিছু সংখ্যক ওইসব ঘটনায় জড়িত থাকতে পারে। এর আগে ২০১৭ সালে সেনাবাহিনী তদন্ত করে। সেই তদন্তে বলা হয়, সেনাবাহিনী কোনো অপরাধই করেনি। কিন্তু রাখাইনে নৃশংসতার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তেই থাকে। এর মধ্যে সহিংসতার প্রাথমিক যাচাই বাছাই অনুমোদন করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ন্যায়বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যে ঘোষণা দিয়েছে তাতে তাদের মনোভাবের কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় না। তারা দু’বছর আগে চালানো ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’-এর সময় নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু তাদের নৃশংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে কমপক্ষে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, রোহিঙ্গা উগ্রপন্থিদের হামলার জবাব দেয়া হয়েছে- এমন কথা ব্যবহার করে সেনাবাহিনী রাখাইনে নৃশংসতা চালানোর পক্ষে সাফাই গাইছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সপ্তাহান্তে ঘোষণা দিয়েছে, তারা নৃশংসতার জবাবে তদন্ত করে নিশ্চিত হয়েছে যে, রাখাইনের ওই গ্রামে তাদের নির্দেশ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তবে কোনো তারিখে বা কি ধরনের অপরাধ সেখানে ঘটানো হয়েছিল তার বিস্তারিত জানায়নি তারা। তবে তারা বলেছে, সামরিক আইনের অধীনে গুটাবাইন গ্রামে সংঘটিত ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিচার করা হবে সামরিক আদালতে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক ফিল রবার্টসন বলেছেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হাতেগোনা দু’চারজন সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে সামরিক আদালতে বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটাই তাদের দিক থেকে অনেক বড় কিছু। তারা এটা করছে আমরা যখন হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগসহ নৃশংসতার বিষয়ে কথা বলছি। তাদের এসব নির্যাতনে তাদেরই লোকজন ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। এভাবে কিছু নিম্নস্তরের সেনা সদস্যকে বলির পাঁঠা বানানোর মাধ্যমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাদের এমন সামরিক আদালতে বিচার মনে হচ্ছে আরেকটি গেম। তিনি এক ই-মেইলে আহ্বান জানান, এমন বিচার করতে হলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের বিরুদ্ধে করতে হবে, যারা শাস্তির মুখোমুখি হবেন। ফিল রবার্টসন আরো বলেন, আপনি বলতে পারেন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এই বিচারের বিষয়ে সিরিয়াস নয়। কারণ, তারা পুরো অপারেশন রিভিউ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। রুদ্ধদ্বার ব্যবস্থায় তারা সামরিক আদালতের বিচারকে আড়াল করছে। ফলে জনগণ ও মিডিয়ার চোখ ফাঁকি দেয়া হবে এর মাধ্যমে। তাই তাদের এমন কর্মকাণ্ডের ভেতর দিয়ে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মনোভাবের পরিবর্তন হবে এমনটা ভেবে কারো বোকা হওয়া উচিত নয়। এখনো ওই সেনাবাহিনী দাবি করে, তারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অধিকার লঙ্ঘন করেনি। জঘন্য অপরাধে আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা থেকে তারা নিজেদের মুক্ত রাখার চেষ্টা করে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..