আসামে এনআরসি, বিপাকে ১৯ লাখ মানুষ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : আসামের প্রকৃত নাগরিকদের নামের তালিকা (এনআরসি) প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে নানা ঘটনা-অঘটনের মধ্যে দিয়ে বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা। বিতাড়ণ আতঙ্কে এখন পর্যন্ত তিন নাগরিক আত্মহত্যা করেছেন। ক্ষমতাসীন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ আসাম রাজ্য সরকারের বিভিন্ন হর্তা-কর্তা হুমকি দিচ্ছেন বাদ পড়া নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রেরণ করা হবে। এনআরসির তুমুল বিরোধিতা করেছে কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিআই, সিপিএমসহ ভারতের সকল রাজনৈতিকদল। যদিও আসাম কংগ্রেসের মুখে দেখা গেছে ভিন্ন সুর। গত ৩১ আগস্ট ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের প্রকৃত নাগরিকদের নামের তালিকা (এনআরসি) প্রকাশিত হয়েছে। প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ লোকের ওই তালিকায় চূড়ান্তভাবে ঠাঁই হয়েছে। তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ১৯ লাখ ৬ হাজার মানুষ। দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছিল আসামের এনআরসি নিয়ে। ১৯৮৫ সালের আসাম চুক্তি অনুযায়ী রাজ্যটিতে জাতীয় এনআরসি তৈরির কথা বলা ছিল। এনআরসি তৈরির ভিত্তিবর্ষ হিসাবে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ তারিখ নির্বাচন করা হয়। ২০১৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এনআরসি তৈরির কাজ হাতে নেওয়া হয়। এনআরসি তৈরিতে রাজ্যে ২ হাজার ৫০০টি সেবাকেন্দ্র খোলা হয়। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজে ৫২ হাজার সরকারি কর্মী নিযুক্ত হয়। এনআরসি তৈরিতে খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ২২০ কোটি রুপি। এনআরসিতে নাম তোলার জন্য মোট আবেদন জমা পড়ে ৩ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৪। তালিকা প্রকাশের পর ১৯ লাখ ৬ হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। সরকারের তরফ থেকে জানানো হয় যাদের নাম তালিকায় থাকবে না, তাদের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে (এফটি) আবেদন জানাতে হবে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বলেন, তালিকা থেকে বাদ পড়লে আতঙ্কগ্রস্থ হওয়ার প্রয়োজন নেই। নাগরিকত্ব প্রমাণে সরকার প্রত্যেককে সব রকমের সহায়তা দেবে। একই রকম তথ্য জানিয়েছে আসাম রাজ্য পুলিশও। এনআরসিতে নাম না ওঠার মানে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া নয়। যাঁদের নাম উঠবে না, তাঁরা এফটিতে আবেদনের জন্য ১২০ দিন সময় পাবেন। সরকার প্রত্যেককে আইনি সহায়তা দেবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাজ্যে অতিরিক্ত আরও এক হাজার এফটি খোলা হবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনালেও ব্যর্থ হওয়ার অর্থ বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া নয়। ব্যর্থ নাগরিকেরা প্রথমে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারবেন, তারপর সুপ্রিম কোর্টের। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হলে কাউকেই ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে না। এদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের এনআরসি (এনআরসি) প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যের নাগরিক এবং গোর্খা ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, যদি পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এনআরসি চালু হয় তবে পশ্চিমবঙ্গে এর তীব্র প্রভাব পড়বে। কারণ তাদের রাজ্যে এনআরসি চালু হলে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ নাগরিকত্ব হারাবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ ঘোষণা দিয়েছেন, আসামের ন্যায় ভারতের অন্য রাজ্যেও চালু করা হবে এনআরসি। এরই প্রেক্ষিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে গোর্খা ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে। তবে মোদি ও অমিত শাহের ঘোষণার পর একটুও দমেননি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনিও পাল্টা ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাজ্য বিজেপি চাইলেও পশ্চিমবঙ্গে চালু করতে দেয়া হবে না এনআরসি। আসামের জাতীয় এনআরসির বিরুদ্ধে কলকাতায় বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। কলকাতার শেক্সপিয়ার সরণির আসাম ভবনের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে এনআরসিবিরোধী যুক্ত সংগ্রাম কমিটি এবং ভাষা ও চেতনা সমিতির কর্মী ও সমর্থকেরা। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে এই প্রতিবাদ সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে দাবি জানানো হয়, ২০১৪ সালের আসামের ভোটার তালিকা অনুযায়ী এনআরসিতে নাম তুলতে হবে। ভারতে যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তাদের সবাইকে ভারতের নাগরিকত্ব দিতে হবে। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের ১৮টি বাম দলের জোট দাবি জানিয়েছে, জাতীয় এনআরসির (এনআরসি) নামে ভারত থেকে কাউকে তাড়ানো যাবে না। বিশ্ব শান্তি দিবস উপলক্ষে বাম দলের জোটের শান্তি মিছিল শেষে এই দাবি জানানো হয়। কলকাতায় বিশাল শান্তি মিছিল বের করে বাম দলের জোট। মিছিলে অংশ নেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র, আরএসপি নেতা ক্ষিতি গোস্বামী ও মনোজ ভট্টাচার্য, সিপিআই নেতা মঞ্জু কুমার মজুমদার, ফরোয়ার্ড ব্লক নেতা নরেন চট্টোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার বাম পরিষদীয় দলনেতা বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী, সিপিএমের সাবেক সাংসদ মোহাম্মদ সেলিমসহ ১৮টি বাম দলের নেতারা। মিছিলে আরও যোগ দেন বামপন্থি দল এসইউসিআই ও সিপিআইয়ের (এমএল) নেতারা। সিপিএম পলিটব্যুরো এক বিবৃতিতে জানায় নতুন করে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি)’র তথ্য আর যাচাই করা যাবে না। এ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে দায়িত্ব নিতে হবে সুপ্রিম কোর্টকেই। পলিট ব্যুরো এর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের তরফে যে অনুরোধ করেছে, তাতে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ২০ শতাংশ, আর বাকি জেলাগুলিতে ১০ শতাংশ খসড়া ফের খতিয়ে দেখার প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। নতুন করে খতিয়ে দেখার বিরোধিতা করেছে সিপিআই(এম)। কারণ এটা একমাত্র হয়রানিকে আরও বাড়াবে, সেইসঙ্গেই লক্ষ লক্ষ নাগরিক, যারা ইতিমধ্যেই বারংবার শুনানিতে হাজির হয়েছেন এবং নথিপত্র জমা দেওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে সময় দিয়েছেন, তাঁদের আবারও পড়তে হবে কঠোর পরীক্ষার মুখে। স্থানীয় বিজেপি, যারা এই এনআরসির দাবিতে মুখর ছিল, তারাই এখন বিপাকে পড়েছে। কেননা, প্রথমবারের খসড়ার মতো এবারও বাদ পড়া বেশিরভাগই বাংলাভাষী হিন্দু বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যারা কিনা বিজেপির বিশ্বস্ত ভোটব্যাংক। প্রথম খসড়ার মতো এবারও যে চূড়ান্ত তালিকায় হিন্দুরা বেশি বাদ পড়েছেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই বিজেপির। আসামের বিজেপি দলীয় মন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা তো বলেই দিয়েছেন, এই এনআরসি দিয়ে বিদেশি তাড়ানো যাবে না। তিনি বলেন, ‘এই চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বর্তমান এনআরসির ওপর আমরা আস্থা পুরোপুরি হারিয়েছি। প্রচুর প্রকৃত ভারতীয় এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।’ মন্ত্রী আরও দাবি করেন, দক্ষিণ সালমারা ও ধুবরির মতো বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাসমূহে বাদ পড়ার হার সর্বনিম্ন। অপরদিকে ভূমিপত্র জেলায় অনেক বেশি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..