“ডেঙ্গু জ্বরের বর্তমান অবস্থা : আতঙ্ক, সংকট, বাস্তবতা ও করণীয়”

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
[ডক্টরস ফর হেলথ এন্ড এনভায়রনমেন্ট এর পক্ষ থেকে ২ আগষ্ট সংবাদ সম্মেলনে পঠিত মূল বক্তব্য] আজ ঢাকাবাসীসহ সারাদেশে এক মহা দূর্যোগের বিষয়ে আলোচনা করতে এবং আলোচিত বিষয় আপনাদের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরার জন্য এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। ডেঙ্গুর সঙ্গে ঢাকাবাসীর প্রথম পরিচয় প্রাক-স্বাধীনতা কালে ১৯৬৭ সালে, তখন এর নাম দেওয়া হয়েছিল “ঢাকা জ্বর ” (Dhaka Fever)। জ্বরের মাত্রা ও শরীরের ব্যাথার বিশেষত: হাড়ের ব্যাথার কারণে একে বলা হতো হাড়ভাঙ্গা জ্বর (Break Bone Fever)। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এবং আমাদের নিকটস্থ দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতেও এ রোগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মাত্রায় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে বিশেষত: ঢাকাবাসীর এবং এদেশের চিকিৎসকদের এ রোগের সঙ্গে ব্যপক পরিচিতি ঘটে ২০০০-২০০২ সালে। ২০০০ সালে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য অনুযায়ী ডেঙ্গু জ্বরে সংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল সাড়ে পাঁচ হাজারের মত এবং সেবার একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও একজন ডেন্টাল সার্জনসহ ৯৩ জনের জীবন কেড়ে নেয় এই ঘাতক ব্যাধি। এর আগের বছর ঢাকার একটি হাসপাতালের চিকিৎসকবৃন্দ ১৯ জন জ্বরের রোগীর মধ্যে ডেঙ্গু জ্বর শনাক্ত করেছিলেন। ২০০০-২০১৯ সালের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা গ্রহণের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় ২০১৯ এর পূর্বে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হয়েছিল ২০১৮ সালে, যার সংখ্যা ছিলো ১০১৪৮। আর ২০১৯ সালে ২৭ জুলাই এর মধ্যেই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৫২৮ (সৌজন্যে: প্রথম আলো, ২৮ জুলাই ২০১৯ সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)। একই পত্রিকায় প্রকাশিত ১ আগষ্ট এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এ বছরের জুলাই মাসে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ১৪৯৯৬ জন যা ২০১৮ সালের সারা বছরের চেয়েও বেশি। আর এ বছর ডেঙ্গুরোগে ৩১ জুলাই পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৬৩ জনের। পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও প্রকৃত চিত্র বোঝার জন্য আমি এখন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ডেঙ্গু জ্বর সম্পর্কিত প্রতিবেদনের কিছু শিরোনাম আপনাদের নিকট তুলে ধরছি। ২৩ জুলাই, প্রথম আলো-‘ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ’; ‘জনগণের ওপর কাজ ছেড়ে দিয়েছেন কেন?’ -সিটি কর্পোরেশনকে হাইকোর্টের প্রশ্ন; ২৬ জুলাই, ২০১৯ প্রথম আলো- ‘রেকর্ড সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে’, ‘মশা নিয়ে মশকরা’; ২৭ জুলাই, বাংলাদেশ প্রতিদিন-‘সারা দেশই ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু’; ২৭ জুলাই, ২০১৯ দৈনিক ইত্তেফাক- ‘ডেঙ্গুর ঝুঁকি অক্টোবর পর্যন্ত’; ২৮ জুলাই, ২০১৯ প্রথম আলো- ‘হাসপাতালে ভর্তিরোগী ১০ হাজার ছাড়ালো’; ২৮ জুলাই ২০১৯ বাংলাদেশ প্রতিদিন- ‘ডেঙ্গু আক্রান্তের রেকর্ড ভঙ্গ’; ২৯ জুলাই, দৈনিক ইত্তেফাক-‘ডেঙ্গু ঝুঁকিতে গোটা রাজধানী’; ৩০ জুলাই, প্রথম আলো- ‘৫৯ জেলায় ডেঙ্গু রোগী’ ১ আগস্ট প্রথম আলো- ‘ জুলাইয়ে রোগী ভর্তির রেকর্ড’; ২৯ জুলাই কাংলাদেশ প্রতিদিন- ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: মেয়র সাঈদ খোকন’; ২৭ জুলাই প্রথম আলো- ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে জনগণ আতঙ্কে আছে: ওবায়দুল কাদের’; ২৯ জুলাই বাংলাদেশ প্রতিদিন- ‘জলে গেল মশা মারার ৫০ কোটি টাকা’; ৩১ জুলাই, প্রথম আলো- ‘মশার ওষুধ কেনায় যত অনিয়ম’। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার এ সকল তথ্যের/প্রতিবেদনের পর ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং এ সংকট সৃষ্টির ক্ষেত্রে মশক নিধনে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা জানি, ডেঙ্গু একটি মশাবাহিত সংক্রামক রোগ এবং যে কোন বয়সের মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। প্রাথমিকভাবে শনাক্ত হলে ও চিকিৎসা নির্দেশিকা মেনে চিকিৎসা প্রদান করলে রোগী সহজেই সেরে ওঠে। তবে হেমোরেজিক (রক্তক্ষরণ) ডেঙ্গু হলে এবং ডেঙ্গু শকে গেলে অথবা ডেঙ্গুর সাথে কিডনী, লিভার, মস্তিষ্ক ইত্যাদি আক্রান্ত হলে কিংবা গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে তা মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। আমরা জানি ইতোমধ্যে দেশের ৬২টি জেলায় ডেঙ্গুর রোগী সনাক্ত হয়েছে। আসন্ন ঈদে লক্ষ লক্ষ মানুষ ডেঙ্গুর জীবাণু বহণ করে ঢাকার বাইরে যাবে, এর মধ্যে অনেকেই আক্রান্ত হবে বলে আমাদের আশঙ্কা এবং তাদের থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ঢাকার বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগী সনাক্ত করণ ও সঠিক চিকিৎসা প্রদানের প্রস্তুতি গ্রহণের বিষয়টি স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে অতি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। সেই সাথে ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য এ সকল স্থানে এডিস মশা নিধন কার্যক্রম অভিযান পরিচালনা করার এখনই সময় বলে আমরা মনে করি। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, আবহাওয়া অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত আগাম বর্ষার সংবাদ পেয়ে দেশের কীটতত্ত্ববিদগণ, চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে আসন্ন ডেঙ্গুর ভয়াবহতা সম্পর্কে অনেক আগেই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল এবং ভবিষ্যৎ ভয়াবহতা সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়েছিল। কিন্তু মশক নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাতো হয়ইনি বরং যারা এ বিষয়ে কথা বলেছেন বা বলতে চেয়েছেন তাদেরই বিভিন্নভাবে হেয় করা হয়েছে। এখন সকলেই লক্ষ্য করছেন হাজার হাজার অসহায় মানুষ (শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সকলেই) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। ইতোমধ্যে ঝরে পড়েছে অনেকগুলি প্রাণ। ফলে পরিস্থিতি ক্রমান্বেয়ে এখন সামাল দেয়ার বাইরে চলে গিয়েছে। এহেন সংকটজনক জাতীয় পরিস্থিতিতে চিকিৎসক সমাজের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমরা মনে করি ডেঙ্গু রোগের পরিচিতি, এডিস মশা চেনার উপায়, ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, ডেঙ্গু হলে কী করতে হবে এবং এর প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে এ রোগ সম্পর্কে জনগণকে আরো বেশি সচেতন করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে জনগণের মধ্যে বিরাজমান আতঙ্ক দূর করাও এ মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলেও আমরা মনে করি। সেইসঙ্গে মশক নিধনে ব্যর্থতা ও ওষুধ ক্রয়ে দুর্নীতির সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তিবর্গের জবাবদিহিতা এবং বিচার দাবি করছি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..