কঠিন কথা সহজে বলতেন কমরেড আব্দুস সামাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

আলমগীর স্বপন ও সাফিয়া নায়লা শুভ্রা : রেশনে চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু রেল শ্রমিকদের দেয়া হতো চালের ভাঙা অংশ খুদ। কাহাতক আর সহ্য করা যায়। খুদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ঘেরাওয়ের মুখে পড়েন মুসলিম লীগের যোগাযোগমন্ত্রী আবদুর রব নিস্তার। সৈয়দপুরে রেল কারখানা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন তিনি। ফেরার পথে সৈয়দপুর রেল স্টেশনে ঘেরাও করা হয় মন্ত্রীকে। সেখানে প্রখ্যাত শ্রমিক নেতা কমরেড জসীম মন্ডলসহ আরো অনেক শ্রমিকই গিয়েছিলেন। মন্ত্রী শ্রমিকদের সাথে কথাবার্তার পর বললেন, ‘এদের বহু চাহিদা, এখন কথা বলার সময় নেই। চলে যাব।’ মন্ত্রীর এই কথা শুনে ‘সামাদ ’ নামের লাল ঝান্ডার এক শ্রমিক রেলের কম্পাউন্ডে উঠে ট্রেন জোড়া লাগানোর আংটা কেটে দেন। পার্বতীপুর যাওয়ার জন্য যখন ইঞ্জিন চালু করা হলো, গোটা ট্রেন অচল হয়ে গেল। কর্মকর্তারা মন্ত্রীকে বললেন, ‘আপনার ট্রেন শ্রমিকরা কেটে রেখেছে। কিভাবে যাবেন?’ তখন মন্ত্রী বললেন, ‘ঠিক আছে, শ্রমিকদের কথা শুনবো।’ পরে শ্রমিকদের রেশনে খুদের বদলে চাল দেয়া হলো। মৃত্যুর মাসখানেক আগে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বর্ষীয়ান নেতা কমরেড জসীম উদ্দীন খুদবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণে এই ঘটনা তুলে ধরেন। তাঁর সাক্ষাতকারটি প্রকাশিত হয়েছিলো দৈনিক কালের কণ্ঠে (২৫ আগস্ট, ২০১৭)। যেখানে তিনি স্মরণ করেছিলেন তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর সৈয়দপুর রেল শ্রমিক ও কমিউনিস্ট পার্টি নেতা কমরেড আব্দুস সামাদকে। তুলে ধরেছিলেন পাকিস্তানের তখনকার যোগাযোগমন্ত্রীর রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে কমরেড সামাদের লড়াকু ও সাহসী ভূমিকার কথা। কমরেড জসীম মন্ডল তার আত্মজীবনীমূলক বই, ‘জীবনের রেলগাড়ি’ তে সেদিনের সেই ঘেরাওকে শ্রমিক আন্দোলনের এক অনন্য ঘটনা হিসেবে উল্লেখ্য করেছেন। তিনি লিখেছেন , ‘সে সময় সৈয়দপুর রেল স্টেশনে সংগঠিত হয়েছিলো একটি ব্যতিক্রমী আন্দোলন। বোধ করি শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানে প্রথম ‘ঘেরাও’ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিলো সৈয়দপুর রেল স্টেশনেই।’ কমরেড জসিম মন্ডলের নেতৃত্বে গড়ে উঠা সেদিনের খুদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রমিথিউস ছিলেন তখনকার তরুণ কমরেড আব্দুস সামাদ। সৈয়দপুরে শ্রমিক আন্দোলন, সংস্কৃতি ও রাজনীতির অন্যতম পুরোধা কমরেড আব্দুস সামাদের প্রয়াণ ঘটেছে গত ২৭ জুলাই। দীর্ঘ একযুগ অসুস্থ অবস্থায় সজ্জাশায়ী ছিলেন তিনি। দু’বছর আগে শ্রমিক আন্দোলনে তার প্রেরণা জসিম মন্ডলের মৃত্যু সংবাদে আরো দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। কারণ জসিম মন্ডল ও আব্দুস সামাদ অনেকটা হরিহর আত্মা ছিলেন। তাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিলো ভিন্ন মাত্রার। দু’জনই শ্রমিক নেতা ছিলেন। আরো নির্দিষ্ট করে বললে রেল শ্রমিক নেতা হিসেবেই রাজনীতিতে পা পড়েছে তাদের। যদিও দু’জনের বয়সের তফাৎ ছিলো ১৮ থেকে ২০ বছর। কমিউনিস্ট পার্টির কাজে উত্তরের জেলা নীলফামারীর সৈয়দপুরে গেলে কমরেড সামাদের বাড়িই ছিলো জসিম মন্ডলের ঠিকানা। সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কমরেড সামাদের স্ত্রী মোসলেমা সামাদ বলেন, ‘তাঁরা বড় ভাই, ছোট ভাইয়ের মতো ছিলেন। দু’জনই দু’জনার পরামর্শ নিতেন। জসীম মন্ডল কোন বিষয়ে ঠেকলে তার পরামর্শ নিতো, আবার কমরেড সামাদ ঠেকলে জসীম মন্ডলের আশ্রয় নিতো। কোন কোন দিন তাঁরা সারারাত পার করে দিতেন রাজনৈতিক আলাপ, তর্ক-বিতর্কে।’ খুদ বিরোধী আন্দোলনে জসীম মন্ডলের পরামর্শে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তরুণ শ্রমিক সামাদের মতো কর্মীরা, সেই বিপ্লবী কাজ পরবর্তিতে থেমে থাকেনি। আন্দোলনের বীজ ছড়িয়েছে শ্রমিকদের আরো বড় বড় দাবিকে ঘিরে। রেল কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের বোনাস পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বৈষম্য ছিলো । কর্মকর্তারা বোনাস পেলে তাদের পরে তা শোধ করতে হতো না। কিন্তু শ্রমিকদের দেয়া বোনাসের টাকা পরে কেটে নেয়া হতো বেতনের টাকা থেকে। এর বিরুদ্ধে এরশাদ সরকারের আমলে বড় আন্দোলন হয়েছিলো। সৈয়দপুরে এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কমরেড আব্দুস সামাদ। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ের সাবেক স্টোর কিপার ও উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কাজী আবুল হাসনাত ও শ্রমিক নেতা মিয়া মোঃ ইলিয়াস জানিয়েছেন, ‘এখন রেল শ্রমিকরা যে বোনাস পায় এর পেছনে তাঁর বড় অবদান আছে। বোনাসের দাবিতে সৈয়দপুরে শ্রমিকদের লাল পতাকার বিশাল সমাবেশ হয়েছিলো। সেই সমাবেশে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি কমরেড ফরহাদ বক্তব্য দিয়েছিলো। পরবর্তীতে বোনাসের দাবি মানতে বাধ্য হয়েছিলো স্বৈরাচারী এরশাদ সরকার। ’ কমরেড সামাদ কেমন সংগঠক ও সুবক্তা ছিলেন এ নিয়ে তারা বলেন, ‘একদিনের শ্রমিক হরতালের কথা মনে আছে। হরতাল চলছে। কিন্তু হুইসেল বাজলে শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকে যেতে থাকে। এই অবস্থা দেখে কমরেড সামাদ একটা চোঙ্গা নিয়ে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানান তারা যেন কাজে যোগ না দেন। সবাই সেদিন বেরিয়ে এসেছিলো তার আহ্বানে।’ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার তখনকার ডব্লিউএম আহসান জাকিরের মুখেও একই কথার অনুরণন। স্মৃতিচারণে তিনি বলছিলেন, ‘শ্রমিকদের দাবি দাওয়া, বেতনভাতা নিয়ে উনি (কমরেড সামাদ) যে যুক্তি দিতেন, তা আমরা মেনে নিতে বাধ্য হতাম। তাঁর সঙ্গে যুক্তিতে পারা কঠিন ছিলো। সে অন্যরকম শ্রমিক নেতা ছিলো। রেলের উন্নয়নে অনেক সময় তার পরামর্শ নিতাম।’ শ্রমিক আন্দোলনে কমরেড সামাদের এতোসব কীর্তি অবশ্য তাঁর মুখে শোনা হয়নি। প্রচারের আড়ালে থাকতে পছন্দ করতেন। প্রচারবিমুখ এই মানুষটির জন্ম ১৯৪২ সালের ১ জুলাই ফরিদপুরের দয়ারামপুরে। দূরন্ত ও দুর্দান্ত সাহসী কমরেড সামাদের শৈশব, কৈশোরের কিছু অংশ কেটেছিলো বেদে বহরে। এরপর ভাইয়ের কর্মস্থলের সুবাদে চলে আসেন সৈয়দপুরে। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। বিহারি অধ্যুষিত পাকিস্তানিভাবাপন্ন সৈয়দপুরে শ্রমিক আন্দোলন বা বাম গণরাজনীতিই শুধু নয়, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন খেলা ঘর, মহিলা পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন গড়ে তোলার পেছনে বড় ভূমিকা ছিলো তার। সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা শাহাদত হোসেন রংপুর অঞ্চলের সংগঠক হিসেবে দীর্ঘদিন কমরেড সামাদের বাসায় ছিলেন। সে সময়ের একটি ঘটনার উল্লেখ্য করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি ৯১ সালে ক্ষমতায় আসে। সে সময় বিএনপি-জামাতের ক্যাডাররা সৈয়দপুর ছাত্র ইউনিয়ন অফিস দখল করার ঘোষণা দিয়েছিলো। এ খবর পেয়ে কমরেড সামাদ একাই লাঠি নিয়ে ছাত্র ইউনিয়ন অফিসের দরজায় অবস্থান নিয়েছিলেন। সেদিন বিএনপি-জামাতের ক্যাডারার মিছিল করে গেলেও সাহস করেনি অফিস দখলের।’ কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার পেছনে কমরেড সামাদের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রেল শাখায় থেকেও পুরো সৈয়দপুরে পার্টির নেতৃত্ব দিতেন কমরেড সামাদ। সরকারি চাকরি করতেন। কিন্তু চাকরি হারানোর ভয় ছিলো না। ঠোঁটকাটা মানুষটি প্রকাশ্যেই বলতেন- ‘চাকরি থাক বা না থাক। আমি কমিউনিস্ট পার্টি করবো।’ এরকম শক্ত ও সাহসী মনোভাবের কারণে সৈয়দপুর অঞ্চলের আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। অথচ এমন সাহসের জন্য তাঁর পায়ের তলায় শক্ত পারিবারিক ভিত্তি বা অর্থনৈতিক শক্তি ছিলো না। পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। কিন্তু তিনি ভয় পেতেন না। স্বৈরাচারি এরশাদের সামরিক সরকারের আমলে রাজনীতি করা কঠিন ছিলো। তখন তার বাড়িতেই বসতো কমিউনিস্ট পার্টির গোপন বৈঠক। সেসব বৈঠক গোপনও থাকেনি। রাষ্ট্রযন্ত্র জেনেছে। এর পরিণতি সাহসের সঙ্গেই বরণ করেছেন কমরেড সামাদ। খাটতে হয়েছে জেল। ১৯৮৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর রংপুর কারাগার থেকে স্ত্রী মোসলেমার কাছে চিঠি লিখেছিলেন। নিজের চার সন্তান শিখা, রুস্কি, সুবীর ও শুভ্রার খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি চিঠিতে জেল জীবনের কথা জানিয়েছিলেন। জেলখানার চিঠি : প্রিয় শিখার আম্মা, ‘পত্রবাহক আজ জেল থেকে ছাড়া পেলো। জানিনা সে ঠিকমতো পৌঁছে দিবে কিনা। আমার আরো তিন মাসের ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। সে যাই হউক। প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে। কারো কাছে রংপুর জেলে একটা কম্বল, একটা লুঙ্গি ও আমার নতুন কেনা ট্রাকসুট সুয়েটারটা পাঠিয়ে দিও। ..ট্রাক সুটের দুই পায়ের নিচে এলাসটিক ঢুকিয়ে সেলাই করে দিয়ো যাতে পায়ের সঙ্গে টাইট হয়ে লেগে থাকে। পারলে এক জোড়া স্পঞ্জের স্যান্ডেল দিয়ে দিও। হাত মোজা ও পায়ের মোজা যদি থাকে দিয়ো, নচেত কেনার দরকার নাই।’...(সংক্ষেপিত) ইতি সামাদ, রংপুর জেল, ৪ নং ওয়ার্ড জেলজীবন সম্পর্কে কমরেড সামাদ তাঁর বইয়ে লিখেছেন। কবিতার ছন্দে লেখা সেই বইয়ের তিনি বলছেন, ‘এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বন্দি অবস্থায় জেলের ঘটনা/ প্রায় সত্তর জনা ছিলাম জেলে একসাথে বিরাট এক হলে/ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাসদ, জামাতসহ আরো দল মিলে /... আমরা কয়েকজনা ও সকল বামপন্থি, কমিউনিস্টরা মিলে পাঠচক্র গড়ে তুলি তখন রংপুর জেলে/ ...একদিন আমাদের পাঠচক্রে মার্কসের শ্রমবিভাজন পড়ে/...তারা আমার মতামত জানতে চায় কিছুক্ষণ পরে/ আমি উদাহরণ দিয়ে তখন শ্রম বিভাজন বুঝাই সকলেরে।’ মুক্তিযুদ্ধে কমরেড সামাদ : মুক্তিযুদ্ধে আট নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন কমরেড সামাদ। ফরিদপুরের দয়ারামপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করেছিলেন। সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন গেরিলা যুদ্ধে। তাঁর স্ত্রী মোসলেমা সামাদ সে সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান, ‘ন্যাপ-কমিউনিস্ট পাটি ও ছাত্র ইউনিয়নের অধীনে গেরিলা ট্রেনিং করেছিলেন তিনি। সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন ফরিদপুর অঞ্চলে। যুদ্ধে বুকের বামপাশে আঘাত পেয়েছিলেন। ওই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। সেই ক্ষতচিহ্ন নিয়েই বেঁচেছিলেন পরবর্তী জীবনে।’ মার্কসবাদের চারণকর্মী : কমরেড আব্দুস সামাদ সহজ কথা সহজে বলতে চেয়েছেন সব সময়। নিজের বোঝাপড়ার অনেক কঠিন বিষয়ও সহজ করে বলতে পারতেন। শিশুদের জন্য সহজ করে লিখেছিলেন, ‘বঙ্গ ও বাংলাদেশের রুপকথা’। তিনি তার ‘বিশ্বের সৃষ্টি হতে স্বদেশের বর্তমান/ বিপ্লবী মন্ত্র যত কড়চায় উপাখ্যান’ বইতে বিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক মতবাদ, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ অত্যন্ত সহজ কবিয়াল ভাষায় কড়চাকারে লিখেছিলেন। স্বল্পশিক্ষিত হলেও মার্কসবাদসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্রে বিস্তর জানাশোনা ছিলো তার। দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ, উদ্ধৃত্ব শ্রম তত্ত্ব-তিনি সহজ ভাষায় হাজির করেছিলেন শ্রমিক, মুটে মুজুর ও সাধারণ মানুষের কাছে। তিনি লিখেছেন, ‘উদ্ধৃত্ত শ্রম হরণে জন্মে পুঁজিপতি কতিপয়/ যুগে যুগে শ্রেণি সংগ্রামেই সমাজ পরিবর্তন হয়।’ কবিতার ছন্দে বইয়ের ব্যতিক্রমী নাম শুধু নয় তিনি লেখকের অংশে নিজের নাম না দিয়ে শুধু ‘কমরেড’ লিখেছিলেন। যেখানে এখন অনেককেই দেখা যায় বইয়ের নামের চেয়ে প্রচ্ছদে নিজের নামটাই বড় করে লেখেন। তার এই বইয়ের রিভিউ ছেপেছিলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম মুখপত্র দৈনিক গণশক্তি। ২০০১ সালের ১ আগস্ট গণশক্তিতে ছাপা বুক রিভিউয়ে লেখক নৃপেন্দ্র সাহা লিখেছেন, ‘সাধারণ মানুষ আজও ব্রত-পাঁচালি-কীর্তন-কথকতা পরিত্যাগ করেনি। ..গণনাট্য সঙ্ঘের আহুত লোকআঙ্গিকের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে সাম্যবাদী জীবনদর্শন প্রচার করার পন্থা অনুসরণ করে কোন লোককবি যদি পয়ার আশ্রিত কড়চা রচনার দ্বারা সাম্যবাদী মতাদর্শ প্রচারে ব্রত হন, তবে তাকে সংগ্রামী অভিনন্দনে অবশ্যই আমরা স্বাগত জানাবো।’ কমরেড সামাদ বইটিতে শুধু মার্কসবাদ নয় ধর্ম, নারীবাদ, কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে তার নিজস্ব মত দিয়েছেন। পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বে শ্রমিক শ্রেণি ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন। পার্টিতে ধর্মীয়ভাবে গোরা ও ভাববাদী বিশ্বাসের কাউকে সদস্য করার একেবারে বিপক্ষে ছিলেন তিনি। লিখেছেন, ‘কোন পাস করা ডাক্তার যদি ভূত প্রেত, পানিপড়া, পাথরের আংটি বিশ্বাস করে/ তাহলে সেই ডাক্তারের সার্টিফিকেট নেয়া উচিত কেড়ে/ তেমনি কোন উচ্চশিক্ষিত প্রার্থী সদস্য যদি ভাববাদে বিশ্বাসী হয়/ কোনক্রমেই সে পার্টি সদস্য হওয়ার উপযুক্ত নয়।’ তবে ধর্মীয় সামাজিকতার বিরোধিতা করেননি কখনও। বলেছেন, ‘মনে করি হিন্দু পার্টি সদস্যরা পূজা কমিটির নেতৃত্ব দিয়ে করবে বারোয়ারী পুজা/ মুসলমানেরা ঈদের নামাজ পড়বে প্রকাশ্যে খাবে না যে মাসে থাকবে রোজা।’ ধর্মকে তিনি বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন দ্বাদ্বিকতা দিয়ে। মার্কসবাদের সেই জ্ঞান তিনি ব্যক্তি জীবনেও প্রয়োগ করেছেন। মৃত্যুর প্রায় ১২ বছর আগে তার মৃতদেহ সরকারি হাসপাতালে দানের জন্য নোটারি পাবলিক করে রেখেছিলেন। ‘ইচ্ছাপত্রে’ দেহদান : দেহদানের উইল বা ইচ্ছাপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমার বর্তমান বয়স ৬৫ বছর।.... আমি চেতনায় বাঙ্গালী ও বিশ্বাসে বস্তুবাদী। মানবতা আমার ধর্ম। ‘সবার উপর মানুষ শ্রেষ্ঠ’ লক্ষ্যে শ্রেণি শোষণ ও শ্রেণি বৈষম্য দূর করে মানব কল্যাণই আমার ব্রত। এদেশের লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসা সেবা হইতে বঞ্চিত। সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেকেই বিদেশে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের জন্য আমি সুস্থ চিত্তে আমার জীবদ্দশায় আমার দেহটি বাংলাদেশের যে কোন সরকারি চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের নিকট দান করলাম।’ মৃত্যুর পর তার এই ইচ্ছাপত্র কার্যকর করেছে পরিবার। তার দেহ দান করা হয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজে। আজীবন ‘চেতনায় বাঙ্গালী, বিশ্বাসে বস্তুবাদী’ ছিলেন কমরেড সামাদ। মার্কসাবাদী দৃঢ়তা আর অসাম্প্রদায়িক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। লাল সালাম কমরেড আব্দুস সামাদ। দীর্ঘজীবী হোক আপনার শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লাল স্বপ্ন। লেখক : আলমগীর স্বপন, সাংবাদিক ও সাবেক ছাত্র নেতা এবং সাফিয়া নায়লা শুভ্রা, কমরেড আব্দুস সামাদের সন্তান ও সাবেক ছাত্র নেতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..