সমঅধিকার

এই দুঃস্বপ্নের শেষ কোথায়?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

শান্তা মারিয়া: আমরা কি সবাই মিলে একটা গণ দুঃস্বপ্ন দেখছি? কথাটা কিছুদিন ধরেই মাথায় ঘুরছে। আমরা এমন এক সমাজে, এমন এক সময়ে বাস করছি যেখানে প্রতিদিন কোনো না কোনো অঘটন, হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, হত্যার শিকার হচ্ছে, গণপিটুনিতে প্রাণ হারাচ্ছে। গত কয়েক মাসের পত্রিকার খবরগুলো একটু মনে করার চেষ্টা করি। রাজধানীতে শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হচ্ছে তার নিজ বাসভবনেই। মাদরাসা ও মসজিদের ভেতরে ঘটছে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা, ধর্ষণের শিকার ছাত্রীদের আবার কোরান শরিফ ধরে শপথ করানো হচ্ছে যেন তারা ঘটনা প্রকাশ না করে। তারপর অপরাধী বলছে যে, সে শয়তানের প্ররোচণাতে এ কাজ করেছে! স্কুলে সন্তানের ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়ে গণপিটুনিতে মৃত্যুবরণ করেছে রেনু নামে এক অসহায় মা। শুধু নারী নয়, পুরুষও শিকার হচ্ছে ভয়ংকর সব অপরাধের। প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তরুণকে, কোনো কিশোরকে কুপিয়ে তার রোজগারের বাহন কেড়ে নেয়া হচ্ছে। এক শ্রমিককে চুরির মিথ্যা অভিযোগে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে কারখানা মালিক। তারপর আবার সেই মৃত্যুকে গণপিটুনিতে মৃত্যু বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। পদ্মা সেতুতে শিশুর মাথা লাগবে এই গুজব সৃষ্টি করে ছেলেধরার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে জনমনে। তারই প্রেক্ষিতে শুরু হয়েছে গণপিটুনির এই মারাত্মক প্রবণতা। এমনি আরও অসংখ্য ঘটনা। পৈশাচিকতায় একটি অন্যটিকে হার মানাচ্ছে। আর সেইসঙ্গে পারিবারিক নির্যাতন, পাহাড়ে নির্যাতন ও দখলদারি, গৃহশ্রমিক নির্যাতন, পথশিশু নির্যাতন এগুলো তো চলছেই। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মন্তব্য শুনলে তাদের মানসিক সুস্থতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগতে বাধ্য। কেউ বলছেন- ডেঙ্গু গুজব, কেউ বলছেন উত্তরে ওষুধ ছিটালে মশা দক্ষিণে যায়, কেউ আবার করছেন চরম রেসিস্ট মন্তব্য। এর মধ্যে ডেঙ্গুজ্বর ছড়িয়ে পড়ছে, মহামারির রূপ নিচ্ছে। বন্যাও ডেকে আনছে বিপর্যয়। কৃষকের ফসল তলিয়ে যাচ্ছে বন্যার পানিতে। আরও রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলা, রয়েছে বেকারত্ব, শেয়ার বাজারে ধস, গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, সুন্দরবন ধ্বংসের পায়তাড়া। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় এ থেকে কি মুক্তি নেই? আমাদের দেশটা, সমাজটা কোন অন্ধকারের দিকে ধাবিত? চোখ মেলে তাকাই বিশ্বের দিকে। কোথাও কি কেউ ভালো আছে? নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলায় নিহত, শ্রীলংকায় চার্চে হামলায় নিহত মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, হিন্দুকে হত্যা করতে গিয়ে মানুষ ক্রমাগত হত্যা করছে নিজেকেই। কবে কখন ভালো ছিল মানবজাতি? ফিরে তাকাই ইতিহাসের দিকে। প্রাচীন সুমেরিয়, ব্যাবিলনিয়, মিশরীয় কিংবা চৈনিক সভ্যতার দিকে। আকাশছোঁয়া সৌধ, ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান, জিগুরাতের মন্দির, পিরামিড, মহাপ্রাচীর। মহান শাসকের মহান কীর্তির সৌধ গড়ে উঠছে হাজার হাজার দাসের শ্রমে, ঘামে, রক্তে, অশ্রুতে। রোমের দাসবাজারে বিকিকিনি হচ্ছে মানুষ। প্রভুর মন জোগাতে এক গ্ল্যাডিয়েটর হত্যা করছে অন্য গ্লাডিয়েটরকে, অকারণে, অমানুষদের বিনোদন দিতে। দিগ্বিজয়ীর বাহিনী চলছে ম্যাসিডোনিয়ার সম্রাট আলেকজান্ডারের। পথে পড়ে থাকছে লাখো মৃতদেহ। অ্যাটিলার হুন বাহিনী, চেঙ্গিসের মোঙ্গল সেনার পদভারে পৃথিবী কাঁপছে। বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন, ধ্বংস হচ্ছে মানব প্রাণ। শিশু, নারী, বৃদ্ধ, যুবা কারও রেহাই নেই। যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাস যুদ্ধ, ধ্বংস, হত্যা, ধর্ষণ, নিপীড়নের আর দুর্বলের ওপর সবলের নির্যাতনের। হোক সে যুদ্ধ কিংবা তথাকথিত শান্তিকাল। মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের সূচনালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এমন কোনও সময় কি আমরা পেয়েছি যখন সুখে-শান্তিতে ছিল মানুষ? নগর সভ্যতার বিকাশের সময় থেকেই ক্ষমতার ভরবিন্দু থেকেছে মুষ্ঠিমেয় সুবিধাভোগীর হাতে। নির্যাতিত ও শোষিত হয়েছে বৃহত্তর জনগণ। আর নারীর কথা যদি ধরা যায়, তাহলে বলতে হয়, নারী সর্বহারারও সর্বহারা। সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে থাকে বিত্তহীন নারী। সে দরিদ্র হওয়ার কারণে শোষিত, আবার নারী হওয়ার কারণে দ্বিতীয়বার নির্যাতিত ও শোষিত। সম্প্রতি এক খবরে পড়লাম, ভারতের মহারাষ্ট্রে নারী শ্রমিকদের জরায়ু কেটে ফেলা হচ্ছে। কারণ, জরায়ু থাকলেই মাসিক ঋতুস্রাবের সময় সে কম শ্রম দিবে। জরায়ু থাকলেই সে গর্ভধারণ করতে পারে। ফলে তাকে মাতৃত্বকালীন ছুটি দিতে হতে পারে। কী ভয়াবহ কী নির্মম...! মানুষ যখন গুহাবাসী ছিল, যখন সে যুথবদ্ধভাবে বন-বনান্তরে ঘুরে বেড়াতো সেই সংগ্রহ অর্থনীতির যুগে পুঁজির শোষণ ছিল না। তখন সুখ-দুঃখ সবটাই মানুষ যৌথভাবে ভাগ করে নিতো। সেই মাতৃশাসনের যুগেই বোধহয় মানবজাতি সুখে ছিল। হ্যাঁ, তখনও সংগ্রাম ছিল প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে নিয়ত। কিন্তু তখন অন্যায়, অবিচার নামক দুঃখ, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, ধর্ষণ, হত্যা ছিল না। সেটাই বোধহয় ছিল মানবজাতির স্বর্ণযুগ বা সত্যযুগ। কারণ তখন বৈষম্যও ছিলো না। পরবর্তিতে মানুষে মানুষে বৈষম্য ও শ্রেণি-শোষণ যত বেড়েছে ততই মানুষ নিপীড়িত হয়েছে। তাহলে মূলত শোষণ ও বৈষম্যই মানবজাতির দুঃখের গোড়ার কারণ। দাসতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, পুঁজিতন্ত্র মানবজাতিকে মুক্তি দিতে পারেনি। তাহলে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদ কি পারবে মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে? পারবে কি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে? আসলে বৃহত্তর আন্দোলন ও গণজাগরণ ছাড়া শ্রমিক-কৃষকের তথা সাধারণ মানুষের মুক্তির কোনো পথ খোলা নেই। দেশের উন্নয়নের জন্য শ্রমিক-কৃষকের অবস্থার উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। তারাই তো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। একমাত্র শ্রেণিশোষণহীন সমাজই সবরকম নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে পারে। নারীকে যেখানে ভোগ্যবস্তু হিসাবে বিবেচনা করা হয় সে সমাজে কখনও নারীর ওপর ধর্ষণ ও নিপীড়ন বন্ধ হবে না। যে সমাজে নারী-পুরুষ সকল মানুষ নিজ অধিকার নিয়ে সমানভাবে দাঁড়াতে পারে সেখানেই একমাত্র সকল শ্রেণির মানুষ স্বাধীনতার সুখ উপলব্ধি করতে পারে। সেখানে মশার ওষুধ কেনার টাকা নিয়ে দুর্নীতি হয় না, সেখানে ডেঙ্গু রোগ এভাবে ছড়ায় না। সাম্যবাদী সমাজে সরকারি হাসপাতালে রোগীকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হয় না এবং প্রাইভেট প্র্যাটিসের পেছনে চিকিৎসককে দৌড়াতে হয় না। আমরা যে সম্মিলিত দুঃস্বপ্নটি দেখছি সেখান থেকে মুক্তির উপায় হলো গণজাগরণ। বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে যেদিন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবো, যেদিন আমাদের সম্মিলিত শক্তিতে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে সেদিনই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি মিলবে, তার আগে নয়। আমরা এখন তারই প্রতীক্ষা করি। লেখক : সাংবাদিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..