মার্কসবাদ

এরিখ ফ্রমের চিন্তা : ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে মার্কসীয় মানবতাবাদের দাওয়াই

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

অভিনু কিবরিয়া ইসলাম: এই তথাকথিত বিশ্বায়নের কাল আমাদের অনেক সংকটের মুখে এনে ফেলেছে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। আমাদের এলিয়েনেশন ঘটেছে ভীষণভাবে, নিওলিবারেল সময় আমাদের ক্ষতবিক্ষত করছে। ফরাসি বিপ্লব বা এনলাইটমেন্ট যে মানবকেন্দ্রিকতার জয়গান গেয়েছিল, খোদ সেই মানবতাই আজ বিপন্ন হয়ে উঠছে। এনলাইটমেন্টজাত আধুনিকতা আমাদের দিয়েছে অনেক, উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সংগতি রেখে একসময় বুর্জোয়া আধুনিকতা এমন কিছু মূল্যবোধ জন্ম দিয়েছিল যা অনেক পুরাতন সামন্ত সংস্কারকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। অথচ এই সময়ে এসে আমরা দেখছি, ফরাসি বিপ্লবজাত মর্মবাণীগুলোকে পুঁজিবাদ আজ ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে, গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমের বিপরীতে বিশ্বব্যপী ডানপন্থি উগ্রবাদ ও ফ্যাসিবাদ নতুন চেহারা নিয়ে ফিরে ফিরে আসছে। ফরাসি বিপ্লবকালে মানুষকে জ্ঞানকাণ্ডের কেন্দ্রে আনার প্রবণতা মানুষের আত্মশক্তির উন্মেষ ঘটিয়েছিল। কিন্তু এই সময়ে পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করায় প্রকৃতির সাথে মানুষের, মানুষের সাথে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে, সেই সাথে পুঁজিবাদ; মানুষকে তার সামাজিক স্বত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্ন করায় কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদ জেঁকে উঠতে পেরেছে। আমাদের দেশেও আমরা লক্ষ্য করছি ক্ষমতার নিরঙ্কুশ চেহারার বিপরীতে কার্যকর কোনো প্রতিরোধ নেই, ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’-ধরনের আত্মমুখী চিন্তা ও বিচ্ছিন্নতা কার্যকর গণপ্রতিরোধ তৈরি করতে দিচ্ছে না। উপরন্তু এই বিচ্ছিন্নতাবোধ ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক মনস্তত্ত্বে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখছি বীভৎস হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে পিটিয়ে কুপিয়ে মারা, শিশু ও নারী ধর্ষণের মত বিষয়গুলোকে। একথা বলাই বাহুল্য যে, ফ্যাসিবাদ বা কর্তৃত্ববাদী শাসন নিছক রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর প্রভাব ফেলে না, সামাজিক মনস্তত্ত্বেও এক বিশাল প্রভাব ফেলে। ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদ শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই সমাজের ব্যাপকতর অংশকে শাসন করে না, বরং রাষ্ট্রের বাইরেও নাগরিক সমাজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নাগরিক সমাজে তার মতাদর্শিক আধিপত্য বা হেজিমনি কায়েম করে থাকে। সমাজের উপরিকাঠামোয় এই ধরনের আধিপত্য তাদের শোষণ ও নিপীড়নমূলক চরিত্রকে আড়াল করে রাখে, ব্যাপকতর জনগোষ্ঠীকে লড়াই সংগ্রাম থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। আধিপত্য কায়েম করার লক্ষ্যে শাসকগোষ্ঠী সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া ও অনুগত বুদ্ধিজীবীদের ব্যবহার করে এবং তাদের মাধ্যমে এক ধরনের সামাজিক সম্মতি আদায় করে নেয়ার পাশাপাশি মানুষকে তাদের অনুগত হতে বাধ্য করে। একসময় মানুষ ভুলে যায় তার মানুষ হয়ে ওঠার গল্প। অস্তিত্বের তীব্র সংগ্রাম, জীবনযাপনের নানা সংকট তাকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেয় যেখানে আমিত্ববোধ গিলে খায় মানবিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ ও প্রতিরোধের শক্তিকে। পুঁজিবাদের ফ্যাসিবাদী চেহারা নেবার এই সময়ে বিচ্ছিন্ন ও বিপন্ন মানুষের এই অসহায়ত্বকে বুঝতে আমরা এরিখ ফ্রমের চিন্তার দিকে চোখ ফেরাতে পারি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনোসমীক্ষকদের মধ্যে একজন, এরিখ ফ্রম, যিনি প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মানুষের হিতাহিতজ্ঞানশূন্য বিপন্ন আচরণকে মনোবিজ্ঞানীর চোখে দেখেছেন, আর এই বিপন্নতার দাওয়াই হিসেবে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে মানবপ্রকৃতির স্বরূপকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছেন। বিংশ শতাব্দির প্রারম্ভে, ১৯০০ সালের ২৩ মার্চ জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে এক ইহুদি রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেন ফ্রম। কিশোর বয়সে প্রলয়ংকরী প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ফ্রমের বিশ্বাসকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিলো এবং তার বিশ্ববীক্ষাকে সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত করেছিলো। তিনি বলেছিলেন, ‘যখন ১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হলো, আমি একজন ভীষণ বিপর্যস্ত তরুণ যে কিনা মানুষের আচরণের অযৌক্তিকতাকে বোঝার ইচ্ছা থেকে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক বোঝাপড়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে, কীভাবে যুদ্ধের মত ঘটনা সম্ভব হলো এই প্রশ্নটি নিয়ে একেবারে আচ্ছন্ন। তদুপরি, আমি সকল অফিশিয়াল মতাদর্শ ও ঘোষণার ব্যাপারে ভীষণ সন্দেহপ্রবণ হয়ে উঠলাম, এবং এই বিশ্বাসে উপনীত হলাম যে, সবকিছুর উপরই সন্দেহ করতে হবে।’ পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদের উত্থানও এরিক ফ্রমের চিন্তাধারাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিলো। এ সময়ে, তাঁর ক্রিটিকাল ও সামাজিক তত্ত্ব ও চিন্তাগুলো তাকে বিখ্যাত ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে জায়গা করে দেয়। তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট মনোসমীক্ষণ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন ও পরবর্তীতে ম্যাক্স হোর্হেইমারথেনের প্রস্তাবে সম্মানজনক ফ্রাঙ্কফুর্ট সামাজিক গবেষণা ইনস্টিউটে যোগদান করেন। ফ্রমের প্রথম দিককার গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা ছিলো ১৯৪২ সালের ‘স্বাধীনতা থেকে পরিত্রাণ’ (Escape from Freedom)। এর প্রধান কথা ছিলো, ‘মধ্যযুগের ঐতিহ্যিক বন্ধনগুলো থেকে মুক্তি যদিও ব্যক্তিকে স্বাধীনতার একটি নতুন অনুভূতি প্রদান করে, একই সাথে তা আবার তাকে একাকী ও বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তাকে সন্দিগ্ধ এবং উদ্বিগ্ন করে, এবং তাকে নতুন ধরনের বশ্যতা এবং ধরাবাঁধা অযৌক্তিক কার্যক্রমের দিকে পরিচালিত করে।’ সমাজ ও মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা, এবং জীবন সম্পর্কে প্রবল অনিশ্চয়তা ও সন্দেহবোধ সাধারণ মানুষকে একটি আশ্রয়স্থল খুঁজতে তাড়িত করে। এর ফলশ্রুতিতেই মানুষ ফ্যাসিবাদী সমাজের মত একটি কর্র্তৃত্ববাদী সমাজের দ্বারা উদ্দীপ্ত হয় বলে ফ্রম মনে করতেন। এই রচনাটি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে মানবিকতার যুদ্ধে ফ্রম সবচে বেশি যে মানুষটির শরণাপন্ন হন, তিনি হলেন কার্ল মার্কস, যাকে তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ চিন্তকদের একজন মনে করতেন। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত তার ‘প্রকৃতিস্থ সমাজ’ (The Sane Society) বইটি মার্কসের শিক্ষা দিয়ে ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলো। মার্কসের রচনার নির্যাস থেকে মানুষ সম্পর্কিত ধারণাকে সমৃদ্ধ করে ফ্রম নিজেকে সামাজিক (মার্কসীয়) মানবতাবাদের অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরিখ ফ্রমের মত মার্কসীয় বা সামাজিক মানবতাবাদ নিয়ে কাজ করেছিলেন গিওর্গি লুকাস, আর্নস্ট ব্লখ, জন লুইস, ওয়াল্টার বেনজামিন, হার্বার্ট মার্কুইস ও সি এল আর জেমস প্রমুখ। অনেকে আন্তনিও গ্রামসিকেও এই কাতারে ফেলেন। চিলির সালভেদর আলেন্দে, যুগোস্লাভিয়ার টিটো এবং সেখানকার প্রাক্সিস স্কুল এই মার্কসীয় মানবতাবাদকে সমর্থন করে। পরবর্তীতে টিওডর শ্যানিন, রায়া দুয়ানেভস্কায়া এই সামাজিক মানবতাবাদ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি করেন। ফ্রম এবং অন্যান্য মার্কসীয় মানবতাবাদীরা মার্কসের প্রথম দিককার রচনাগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তারা মনে করেন, মার্কসের প্রথমদিককার লেখাগুলো পড়ে তার দার্শনিক ভিত্তিটাকে বুঝতে না পারলে, মার্কসের পরবর্তী লেখাগুলোর মর্মকথাকে বোঝা সম্ভব নয়। তারা বিশেষত মার্কসের ‘ফিলোসোফিকাল অ্যান্ড ইকোনমিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ (১৮৪৪) কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ফ্রমও মনে করতেন এই ‘ফিলোসোফিকাল অ্যান্ড ইকোনমিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ মার্কসীয় দর্শনের মূল সারসংক্ষেপ। ফ্রম তার ‘মার্কসের মানুষ’ গ্রন্থটিতে ‘ফিলোসোফিকাল অ্যান্ড ইকোনমিকাল ম্যানুস্ক্রিপ্ট’ এর বিভিন্ন উক্তি উদ্ধৃত করেছেন। বিশেষত পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের বিচ্ছিন্নতা বা ‘এলিনিয়েশন’ এর তত্ত্বটি তাকে আকৃষ্ট করে। তিনি মনে করেছেন, মার্কসের এই এলিনিয়েশন তত্ত্বকে আরো বিস্তৃত করে আলোচনার প্রয়োজন আছে, এমনকী তিনি মনে করতেন, যান্ত্রিকভাবে মার্কসকে প্রয়োগ করা হয় যেসব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সেখানেও মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মার্কসের প্রভাবেই মনোবিদ্যাকে তিনি নিছক জীববিজ্ঞানের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেন নি, বরং মনোবিদ্যাকে সমাজ ও সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশের ধারাবাহিকতায় সম্পর্কিত করেছেন। সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন মানবপ্রকৃতি, ব্যক্তিমানুষ, মানুষের চরিত্রকাঠামো ইত্যাদি বিষয়কে। তবে, ফ্রম মনে করতেন, সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলোকে প্রভাবিত করে ঠিকই, কিন্তু মানবপ্রকৃতি বা মানুষের অন্তঃসার কেবলমাত্র ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল একটি বাস্তবতামাত্র– এ ধরনের সরলীকৃত ব্যাখ্যাকে তিনি গ্রহণ করেননি। ফ্রম মনে করতেন উপরিকাঠামোর অনেক বিষয়কে ব্যাখ্যা করা সম্ভব মনোবিদ্যা বা মনোসমীক্ষার মাধ্যমে। মার্কসীয় তত্ত্বকে সামাজিক মনোবিদ্যার মাধ্যমে আরো বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন তিনি। মনস্তাত্ত্বিক প্রয়োজনগুলো, কিংবা সমাজ থেকে পাওয়া চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অথবা ব্যক্তির চরিত্রকাঠামো সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়েও ফ্রমের বিভিন্ন চিন্তায় উঠে আসে। উদাহরণস্বরূপ একটি চমকপ্রদ গবেষণার কথা উল্লেখ করা যায়। হিটলারের ক্ষমতা দখলের পূর্বে কিছু শ্রমিকদের নিয়ে একটি মনোসমীক্ষা করেন ফ্রম, যেটি শ্রমিকদের চরিত্রকাঠামো বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলো- হিটলার ক্ষমতায় গেলে কারা কারা হিটলারের পক্ষ নেবে, কারা বিরোধিতা করবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভবিষ্যদ্বাণীটি মিলে গিয়েছিলো। এই কাজটি তার মৃত্যুর পর ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয়। ফ্রমের বেশিরভাগ কাজগুলোই ছিলো দার্শনিক মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে রচিত। মানবজীবনের পরিস্থিতি, মানুষের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার বিবর্তন ফ্রমকে আকৃষ্ট করেছিলো। যে বিশ্ব ক্রমশ প্রযুক্তির মাধ্যমে আত্মাহীন যান্ত্রিক অস্তিত্বের দিকে এগুচ্ছে, সেখানে তিনি মানুষের মূল্যবোধ, অস্তিত্বের মূলধারা, জীবনের উদ্দেশ্য এবং সমাজের ভাঙনকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন উপায়ে লড়াই করেছেন। দুটি প্রলয়ংকরী বিশ্বযুদ্ধ এবং এর ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে ফ্রম প্রযুক্তির এই আত্মাহীনতা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে মানুষের প্রত্যয় এবং তার সক্ষমতা, এবং সকল সংস্কৃতির একে অপরের সাথে সম্প্রীতিমূলক অবস্থানই হলো ইতিবাচক ও সুখি ভবিষ্যতের ভিত্তি। সেই সাথে তিনি মার্ক্সের ‘মানুষ’ ধারণাটিকে কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে উপরিকাঠামোগত হেজিমনিক লড়াইয়ের এক আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন। উৎপাদন প্রক্রিয়াই যেহেতু মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্ক সৃষ্টি করে, মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে, এমনকী বিষয়গত এইসব উৎপাদনের মধ্য দিয়েই যেহেতু সে নিজেই নিজেকে উৎপাদন করে, তাই উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা মূলত মানুষ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেই এক বিশাল অন্তরায়। বুর্জোয়া সমাজে মানুষের শ্রম যখন বিচ্ছিন্ন (ধষরবহধঃবফ) হয়ে নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়, শ্রমশক্তিকে যখন বিক্রি করা হয় কেবল খেয়েপরে বেঁচে থাকার বাধ্যতামূলক তাগিদে, শ্রমবিভাজন বাড়ার সাথে সাথে শ্রম যখন হয়ে ওঠে আনন্দহীন, একঘেঁয়ে – তখন মানুষ সৃষ্টিশীল হয়ে উঠতে পারে না, সে নিজের ‘প্রজাতি সত্তা’ থেকেই নিজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন মানুষ কর্তৃত্ববাদের অনুগত হয়ে পড়ে, হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক ও সংকীর্ণ, বিপন্ন অস্তিত্ব তৈরি করে মনোবিকৃতি। কেবলমাত্র নিজের সৃষ্টি-নিজের শ্রমের উৎপন্ন থেকে নিজের বিচ্ছিন্নতা ঘুচলেই মানুষ প্রকৃতি ও সমাজের সাপেক্ষে নিজের অবস্থান পুনরাবিষ্কার করতে শিখবে, এক অনন্য ‘প্রজাতি সত্তা’ হিসেবে ‘সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে’ জীবনকে যাপন করতে শিখবে। ফ্যাসিবাদ ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী লড়াই তাই এক অর্থে পুঁজিবাদবিরোধী লড়াই এবং আরেক অর্থে সাম্য-সমাজ সৃজনের মাধ্যমে ‘মানুষ’কে ফিরে পাবারও লড়াই। লেখক : শিক্ষক, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..