ইতিহাস

সাংবিধানিক স্বীকৃতির আন্দোলন সাঁওতাল-আদিবাসীদের সংগ্রাম

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

জাকির তালুকদার : এটা এখন সকলেই স্বীকার করেন যে, সাঁওতাল বিদ্রোহের একটা গভীরতর, অন্ততপক্ষে অতিরিক্ত কারণ হচ্ছে সাঁওতালদের স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা; যখন তাদের মাথার উপর কোনও উৎপীড়ক প্রভু চেপে বসেনি সেই প্রাচীন অতীত দিনের স্বপ্ন; হয়তো বা প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই স্মৃতি যখন কোনও কোনও পণ্ডিতের মতে, সাঁওতালরা নিজেরাই ছিল গাঙ্গেয় উপত্যকার একচ্ছত্র প্রভু এবং আর্য আক্রমণকারীদের দ্বারা তখনও সেখান থেকে তারা বিতাড়িত হয়নি। কোনও কোনও সময় সাঁওতালদের মধ্যে খেরওয়াড়ি নামে একটা আন্দোলন দেখা যায়। খেরওয়াড় সাঁওতালদের প্রাচীন নাম এবং সাঁওতালদের মনে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত হয়ে আছে সেই অতীত দিনের স্মৃতি, যখন তারা চম্পা দেশে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাস করত, কাউকে খাজনা বা কর দিতে হতো না।-ডব্লিউ জি আর্চার সাঁওতাল বিদ্রোহের পশ্চাতে ছিল জমির ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা এবং তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সাঁওতালদের স্বাধীনতা স্পৃহা, যার ফলে তারা ধ্বনি তুলেছিল : ‘আমাদের নিজ দলপতির অধীনে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য চাই’। -বেঙ্গল ডিস্ট্রিক গেজেটিয়ার ফর সানতাল পারগানাস ইহুদিদের মতো ঈশ্বর কর্তৃক কোনো ‘প্রমিজড ল্যান্ডে’র ধ্বনি সাঁওতালরা তোলেননি বটে, কিন্তু নিজেদের জন্য, একটুকরো স্বাধীন সাঁওতালভূমি সবসময়ই তাদের স্বপ্নে ছিল। খুব প্রবলভাবেই ছিল। ইতিহাসে দেখা যায়, সাঁওতালদের যাযাবরত্ব স্বেচ্ছাকৃত নয়, বরং তাদের বারংবার বিতাড়িত করা হয়েছে ছলে-বলে-কৌশলে সেই মাটি থেকে, যে মাটিকে কেন্দ্র করে তারা স্থায়ীভাবে নিজেদের মতো করে বসবাস করতে চেয়েছেন। সাঁওতালরা ভারতবর্ষের কোনও প্রান্ত থেকে ঘুরতে ঘুরতে বর্তমানের সাঁওতাল অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এসেছেন, তার কোন ইতিহাস বা ভূগোল নৃৃ-বিজ্ঞানীরা আজও রচনা করতে পারেননি। সাঁওতাল জাতির মধ্যে মুখে মুখে প্রচলিত নানা রকমের পৌরাণিক ইতিবৃত্তের মধ্যে তার আভাসমাত্র পাওয়া যায়। তাঁদের মৌখিক পুরাণে প্রথমেই আসে হিহিড়ী পিপীড়ি ও হারাতা পর্বতের কথা। হারাতা থেকে সাসাংবেডা। সেখান থেকে জারপি দেশ। তারপরে ঠাকুর তাদের দিলেন আয়রে দেশ। তারপর কাঁয়ড়ে দেশ। সেখান থেকে চাঁইদেশ। সেই হিহিড়ী পিপীড়ি, হারাতা, সাসাংবেডা, জারপি, আয়রে, কাঁয়ড়ে, চাঁই পর্যন্ত স্থানগুলি যদি উত্তর ও পূর্ব ভারতের মানচিত্রে চিহ্নিত করা সম্ভব হতো তাহলে আমাদের দেশের আদিমানুষ নিষাদজাতীয় সাঁওতালদের সুদীর্ঘ যাযাবরত্বের বিচিত্র ইতিহাস আমরা জানতে পারতাম। জানতে পারতাম এই সুদীর্ঘ যাযাবরত্বের কারণও। তবে কৃষিজীবী জাতি যদি যাযাবর হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে তার কারণ হচ্ছে বারংবার বহিঃশত্রুর আক্রমণ। এই পুরাবৃত্ত থেকে যে জিনিসটি বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে দাসত্বের বীজাঙ্কুর তাদের রক্তে নেই। বরং তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো জাতিগত বংশগত জন্মগত স্বাতন্ত্র্যবোধ ও স্বাধীনতাবোধ। যখনই তাদের ওপর দাসত্বের হুমকি এসেছে, তখন হয় তারা বিদ্রোহ করেছেন, অথবা হিজরত করেছেন দলে দলে। এ যেন এক অন্তহীন এক্সোডাস। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ বিশ্বের কৃষক সংগ্রামের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। তবে এটাই সাঁওতালদের সংগ্রামী ইতিহাসের একমাত্র মাইলফলক নয়। এর আগে এবং পরে সাঁওতালরা অনেকবার প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছেন। তবে পূর্বের সংগ্রামগুলির লিখিত দলিল ও প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। লিখিত দলিলের সূত্রপাত হয়েছে ইংরেজ আমলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের ব্যবসা এবং সাম্রাজ্যের স্বার্থে গেজেট-দলিল-পরোয়ানা ইত্যাদি সংরক্ষণ শুরু করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দলিলে দেখা যায়, প্রথম সাঁওতাল গণআন্দোলনের সূচনা হয় ১৭৮০ সালে সাঁওতাল নেতা তিলকা মাঞজহির নেতৃত্বে। ১৭৭৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অগাস্টাস ক্লিভল্যান্ডকে ভাগলপুরের কালেক্টর নিয়োগ করে। তিনি দামিন-ই-কোর সীমানা নির্ধারণ করেন। সাঁওতালরা কটক, ধলভূম, মানভূম, বড়াভূম, ছোট নাগপুর, পালামৌ, হাজারিবাগ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম থেকে ঐ অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন শুরু করেন। গভীর জঙ্গলাকীর্ণ এই অঞ্চলকে শস্য-শ্যামলা করে তোলেন সাঁওতালরা। তখনই ইংরেজরা খাজনার নামে বশ্যতা স্বীকারের দাবি নিয়ে হাত বাড়ায়। সাঁওতালরা কোম্পানির বশ্যতা স্বীকার করতে রাজি হননি। তারা রুখে দাঁড়ান বাবা তিলকা মাঞজহির নেতৃত্বে। পুরো পাঁচ বছর লাগাতার চলেছিল এই প্রতিরোধ আন্দোলন। বিদ্রোহ দমনে স্বয়ং নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছিলেন ক্লিভল্যান্ড। তিনি নিহত হয়েছিলেন বিদ্রোহী নেতা তিলকা মাঞজহির নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতেই। এই গণবিদ্রোহের আপাতসমাপ্তি ঘটে ১৭৮৫ সালে তিলকা মাঞজহির গ্রেপ্তার এবং ফাঁসির মাধ্যমে। ১৮৫৫ সালের ‘হুল’ এর পশ্চাৎপটেও ছিল অর্থনৈতিক দাবি-দাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতার তীব্র আকাক্সক্ষা। সাঁওতালদের রক্ত জল করে ফলানো ফসল, বন্য হাতি-শুয়োর-হরিণের হাত থেকে জানবাজি রেখে রক্ষা করা ফসল চলে যেত মহাজনের ঘরে, জমির খাজনার নামে জমিদারের পাইক-পেয়াদা তছনছ করত তাদের ক্ষেত-ফসল, ঘরবাড়ি-গ্রাম, দারোগা-হাকিম-আমলা-মোক্তারদের কাছে বিচারের জন্য গেলে তাদের ভাগ্যে জুটত বিপরীত ফলাফল, পরিবারের পর পরিবার বাধ্য হচ্ছিল মহাজনদের ক্রীতদাসত্ব বরণে, রেললাইেেনর সাহেবরা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের মুরগি ছাগল, তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তাদের যুবতী মেয়ে-বউদের- এসবের যে কোনো একটিই কোনো জনগোষ্ঠীর রুখে দাঁড়ানোর জন্য যথেষ্ট কারণ। সাঁওতালদের ক্ষেত্রে ঘটেছিলো সবগুলো দুরবস্থার বিষাক্ত সমন্বয়। বিদ্রোহ তাদের করতে হতোই। কারণ আর্জি-ধর্না-আবেদন-নিবেদন সবকিছুই নিষ্ফলা প্রমাণিত হয়েছে। তবে এইসব অর্থনৈতিক শোষণের পেছনে যে স্বাধীনতাহীনতা একটি বড় কারণ তা বুঝতে সাঁওতালদের বেশি সময় লাগেনি। সেই কারণেই ভগনাডিহিতে দশহাজার সাঁওতালের সমাবেশে সিধু-কানু ঘোষণা করলেন যে, তাদের এবার নিজেদের রাজ কায়েম করতে হবে। জমিদার-মহাজন-পুলিশ-ইংরেজসহ সমস্ত অত্যাচারী শোষক বা দিকুদের হটিয়ে দিয়ে এক স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য স্থাপন করতে হবে। সিধু-কানুর ঘোষণা ছিল যে স্বাধীন রাজ্যে কাউকে রায়তি কোনো কর দিতে হবে না। যে যার সাধ্যমতো জমি চাষা করবে। সমস্ত মহাজনী ঋণ মকুব করে দেওয়া হবে। বলদের লাঙলের ওপর দুই পয়সা আর মোষের লাঙলের ওপর দুই আনা খাজনা ধার্য হবে। তারা জানিয়ে দিলেন চিরন্তন গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজব্যবস্থায় পরিচালিত হবে তাদের জীবনযাত্রা। প্রত্যেক গ্রামে নির্বাচিত হবেন একজন সর্দার– যার পদবী মাঝি। গ্রামের মানুষের সমষ্টিগতই হোক আর ব্যক্তিগতই হোক প্রতিটি ক্ষেত্রে তাকে দেয়া হবে চূড়ান্ত ক্ষমতা। নিজেদের মধ্যে যাবতীয় মতপার্থক্যে মাঝিই হবেন সর্বমান্য বিচারক। এছাড়াও বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করার জন্য থাকবেন পরামানিক, গোরাইত, যোগমাঝি, দেশমাঝি। সবার ওপর থাকবেন পরগণাইত। সবমিলিয়ে সেদিনের সমাবেশে অতি সংক্ষেপে ঘোষিত হয়ে গেল স্বাধীন সাঁওতালরাজ্যের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপরেখা। অর্থাৎ এই বিদ্রোহেরও মূল আকাঙ্ক্ষা স্বাধীনতা; নিজেদের জন্য শোষণমুক্ত একটি দেশ। আর.সি. মজুমদারের লেখাতেও একই প্রসঙ্গ-‘১৮৫৭-৫৮ সালে সাহাবাদে যে বিদ্রোহ হয়েছিল, তার সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহের ব্রিটিশবিরোধী মনোভাবের তীব্রতা, সংগঠন ও ভৌগলিক অঞ্চলের বিষয়ে তুলনা করা যেতে পারে। সুতরাং ১৮৫৭ সালে বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, তাকে যদি স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে মনে করা হয়, তাহলে সাঁওতালরা বা সুরেন্দ্র সাই এবং সম্ভবত আরও অনেকে যে কঠিন সংগ্রাম চালিয়েছেন, তাঁদেরও সেই একইরকম মর্যাদা দিতে অস্বীকার করা যা না।’ সাঁওতালরা একথাও জানতেন যে একইসঙ্গে পাশাপাশি বসবাসরত অন্য জাতিগুলিকে বাদ দিয়ে বিশুদ্ধ সাঁওতাল রাজ্যের কল্পনা করা যায় না। তারা তাই তাদের মুক্তিসনদে অন্য জাতির নিপীড়িত মানুষদের জন্যও জায়গা রেখেছিলেন। এই ক্ষেত্রে তারা আশ্চর্যজনকভাবে সুস্থ শ্রেণিচেতনার পরিচয় দিয়েছেন। সেই কারণেই সাঁওতালরা ছাড়াও এলাকার বাঙালি হিন্দু-মুসললমান গরিব কৃষক ও কারিগররাও এই বিদ্রোহে বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এঁরা মূলত হিন্দু-মুসলমান সমাজের নীচুতলার মানুষ হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন। যেমন কামার, কুমোর, তেলী, গোয়ালা, চামার, ভুঁইয়া, বাগদি, হাড়ি, ডোম এবং জোলা সম্প্রদায়ের মুসলমান, যাদের মোমিন বলা হতো। সাঁওতালদের মতো এঁরাও আর্থিক নিষ্পেষণের শিকার ছিলেন। এঁরাও জমিদার, মহাজনদের দ্বারা শোষিত হতেন, ইংরেজ পুলিশের হাতে নির্যাতিত হতেন। তাদের ও সাঁওতালদের শ্রেণিস্বার্থ অভিন্ন ছিল। এঁরা কেউ কেউ প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, কেউ কেউ অন্যভাবে বিদ্রোহীদের সাহায্য করেছিলেন। কেউ শত্রুপক্ষের খবর এনে দিতেন, কেউ পথ দেখিয়ে দিতেন, যুদ্ধের নাকাড়া বাজাতেন, কাজের ধারা ঠিক করে দিতেন, যুদ্ধের জন্য তীর, তলোয়ার ও কুঠার তৈরি করে দিতেন। এইভাবে তারা সাঁওতাল বিদ্রোহকে যথেষ্ট শক্তি যুগিয়েছিলেন। সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়ে উঠেছিল সব সম্প্রদায়ের গরিব জনসাধারণের মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ সাত মাসের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর সাঁওতাল বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হয়েছিল বলে মনে করেছিল ইংরেজরা। কিন্তু আবার সাঁওতালরা জ্বলে উঠেছিল ১৮৮৯-৯১ সালে। জ্বলে উঠেছিল বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকেও। মালদহ জেলার খোচকাফর গ্রামের জিতু হেমব্রম বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেদের সহযোদ্ধার সাথে আদিনা মসজিদ দখল করে নিজেদের স্বাধীন হিসাবে ঘোষণা করেন।আর সর্বশেষ সাঁওতাল জাগরণ ঘটেছিল নাচোলে রানীমা ইলা মিত্রের নেতৃত্বাধীন কৃষক বিদ্রোহের সময়। এই উপমহাদেশে কৃষক আন্দোলনে নাচোলের তেভাগা আন্দোলন আরেক কিংবদন্তি। নিজস্ব স্বাধীন অঞ্চলের স্বপ্ন সাঁওতালদের বারবার উদ্বুদ্ধ করেছে সংগ্রামে। আক্রমণাত্মক প্রয়াস যখনই ব্যর্থ হয়েছে তখনই তারা পিছিয়ে এসে সমাজকে রক্ষণাত্মক করে গড়ে তুলেছে। নিজস্ব সামাজিক রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার ঐতিহ্যবাহী চিন্তা-চেতনা অটুট রাখার চেষ্টা করেছে। এখন তারা চায় বাংলাদেশে তাদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। কেবলমাত্র তখনই এই দেশকে পরিপূর্ণভাবে নিজেদের দেশ বলে ভাবতে পারবে তারা। লেখক : কথা সাহিত্যিক

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..