শিশুহত্যা-ধর্ষণ-নির্যাতনের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড কেন হবে না?

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
আতিকুল হক খান : প্রতিদিন বাড়ছে ধর্ষণ-হত্যা-গণধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতন। একবিংশ শতকের সভ্য সমাজে এই বর্বরতা আজ মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে ৩৯৯ জন শিশু। ৪০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করে এমজেএফ এ তথ্য তুলে ধরেছে। এই সময়কালে সারাদেশে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬ জুলাইয়ের এই প্রতিবেদনের একদিন পর গত ০৭ জুলাই শিশু সায়মাকে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধের পর গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করে টেনে-হিঁচড়ে রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে নিথর দেহটি ফেলে রাখা হয়। শিশু ধর্ষণ-হত্যার এই সংখ্যা আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটি জানলে হয়তো আরো বেদনাদায়ক হবে আমাদের জন্য। কেন এই ঘটনাগুলো অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক আতিকুল হক খান শিশু কিশোর সংগঠন, শিশু অধিকার আইনজীবী, অপরাধ বিজ্ঞানী, দার্শনিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, সামাজিক কর্মী, গবেষক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদসহ অপরাধ দমন সংস্থা ডিটেক্টিভ ব্র্যাঞ্চ কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে তাদের মূল্যবান মতামত গ্রহণ করেন। জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন খেলঘরের চেয়ারম্যান প্রফেসর মাহফুজা খানম বলেন, ‘বিংশ শতকের মাঝামাঝি থেকে দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত নানাদিকের অধঃপতন শুরু হয়েছে। যা আজ চরম আকার ধারণ করেছে। আমরা জানতাম এই অবস্থার মুখোমুখি আমাদের হতেই হবে। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বহুধা বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা যেমন, ক্যাডেট, প্রি-ক্যাডেট, হাই স্কুল, কিন্ডার গার্ডেন, ইংলিশ মিডিয়াম, ইংলিশ ভার্সন, মাদরাসা, সরকারি, আধা সরকারি, বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, গলির এমবিএ, গলির মেডিকেল কলেজ, গলির টেকনিক্যাল কলেজের শিক্ষার মত জগাখিচুড়ির শিক্ষা ব্যবস্থায় কী জাতি তৈরি হচ্ছে তা সহজেই অনুমেয়! লুটপাটের দলবাজির ভোগবিলাসীদের এই সমাজে ‘আমার’ আর ‘আমিই’ সব। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতা রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার নির্মম থাবা। অপরাজনীতির আদর্শহীন প্রয়োগের যথেচ্ছ ব্যবহার, অবৈজ্ঞানিক সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির অবাধ প্রসার, মাদকের চড়াছড়ি, নয়ন বন্ডদের মত শত শত কিশোর সন্ত্রাসী গ্রুপ। সবকিছু মিলিয়ে ভয়ঙ্কর উদ্বেগজনক লোমহর্ষক পরিস্থিতিতে সমাজে শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ খুন এগুলো তো ঘটবেই। আমরা সকল শিশুহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী এই সমস্ত অপরাধের দ্রুত বিচার চেয়ে আসছি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র এ ব্যাপারে কর্ণপাত করেনি। আজ এই পরিস্থিতে আমরা আবারও এইসব মানবতা বিরোধী অপরাধের দ্রুত বিচার, বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি পরিত্যাগ করে সাত কার্যদিবসের মধ্যে শিশু হত্যা, নারী নির্যাতন ও সকল হত্যাকাণ্ডের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার জোরদাবি জানাচ্ছি। সেই সাথে ইন্ধনদাতার আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। আমাদের পার্শ্ববর্তীদেশ ভারত শিশুহত্যা নারী নির্যাতনের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছে। আমাদের করতে দোষ কোথায়? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি এবং বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা পূরণের সুযোগ না থাকায় দেশে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। এটা এখন বিকৃতির পর্যায়ে পৌঁছেছে। পর্নোগ্রাফির অবাধ প্রবাহকে শিশু ধর্ষণের প্রধানতম কারণ উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, মনস্তাত্ত্বিকভাবে মানুষ ভোগবাদী। নৈতিকতা, ধর্ম ও আইন এই ভোগবাদকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু দেশে নৈতিকতার অধঃপতনের পাশাপাশি আইনেরও কোনো প্রয়োগ নেই। বিচারহীনতার এমন সংস্কৃতি অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ছয় মাসে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণ হয়েছে ৫৩ টি। ২৭ প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষিত হয়েছে। আর ধর্ষণের পর ২৩ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। মোট শিশু হত্যা হয়েছে ২০৫ জন। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২০ শিশু। প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সর্বাধিক এপ্রিল মাসে ১২২ টি শিশু ধর্ষিত হয়। জুন মাসে হয় ১১৯টি। ছয় মাসে শিশু হত্যার চেষ্টা হয়েছে ২৮টি। ৯৩টি আত্মহত্যার ঘটনা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের পর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০টি। চুরি হয়েছে ১২০টি শিশু। হারিয়ে গেছে ৭২ শিশু। এর মধ্যে ২৪ জনকে মৃত ও ২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অপরিচিত নবজাতক শিশুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে ১৬টি। ২৮৬ শিশু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। অগ্নিদগ্ধ হয়ে ৩৫৪, চিকিৎসার অবহেলায় ১১, বর্বর বাবা-মায়ের হাতে ১৮ এবং অন্যান্য দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৫৪ জন শিশু। এছাড়া এসিড সহিংসতার শিকার ২, বাল্যবিয়ের শিকার ৮ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে আহত হয়েছে ২৭ শিশু। গত ছয় মাসে ৯টি শিশু হত্যা, আটটি ধর্ষণ ও চারটি যৌন হয়রানি মামলার রায় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার তপন বলেন, অপরাধের জন্যই আইন, সেখানে ফাঁকফোঁকড়ের দীর্ঘসূত্রিতা, প্রভাবশালীদের ফোন, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের প্রভাবে আমাদের বিচার ব্যবস্থা আজ ঠুটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি দূরে ঠেলে দিয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির কাছে রাষ্ট্রযন্ত্র আত্মসমর্পণ করেছে। ভোগবাদ, লুটপাট, মুক্তবাজার, দলবাজি, সন্ত্রাসবাদ লালনের ফলে দেশে শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন, গুম, খুন, মহামারি আকার ধারণ করেছে। গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক সার্বজনীন একমুখী অভিন্ন শিক্ষানীতি, প্রণয়নের বিকল্প নেই। সেই সাথে দেশীয় সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ও বিদেশি সংস্কৃতির যথেচ্ছ অনুপ্রবেশ রাষ্ট্রকে কঠোর হস্তে ঠেকাতে হবে। আমরা উদীচীর পক্ষ থেকে নারী, শিশু, ধর্ষণ, হত্যার মত জঘন্য অপরাধের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করি। বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এই সমস্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের শাস্তি দশ কর্মদিবসের মধ্যে কার্যকরের জোর দাবি জানাচ্ছি। এক শিশু অধিকার আইনজীবী বলেন, শিশুরা হলো ফুলের মতো। তাদের সুরক্ষার মধ্য দিয়ে লালন-পালন করতে হয়। অথচ বাবা-মা সে দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সর্বত্র শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। গ্রিন ইউনিভার্সিটির ‘সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান’ বিভাগের শিক্ষক আহসান হাবীব বলেন, গত এক বছরের চিত্র লক্ষ্য করলে দেখা যায়, নির্বাচনের সময়টাতে শিশুধর্ষণ তুলনামূলক কম ছিল। এ থেকে অনুমিত হয়, রাজনৈতিক কর্মীরা ব্যস্ত থাকায় তখন এ ধরনের অপরাধ কম সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া ক্ষমতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে বর্তমানে শিশুধর্ষণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। তবে শুধু রাজনীতিকে একচেটিয়াভাবে দায়ী করা যাবে না উল্লেখ করে সমাজবিজ্ঞানের এই গবেষক আরও বলেন, বিগত দুই দশকে দেশের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক ভিত্তিতে পরিবর্তন হয়েছে। এমন বাস্তবতায় শুধু আইন করে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমানো যাবে না। এজন্য প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা আরও জোরদার করা জরুরি। হঠাৎ করেই কেন নারী-শিশু ধর্ষণ ও হত্যার মতো ঘটনা বেড়ে গেছে- এমন প্রশ্নে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)’র একজন কর্মকর্তা আব্দুল বাতেন বলেন, কেন ঘটছে- সমাজবিজ্ঞানীরা তার ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। এটা নিয়ে গবেষণা হওয়া উচিৎ। তবে অপরাধবিজ্ঞান বলে, এ ধরনের ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর যখন সেই ব্যক্তি বিষয়টি জানাজানি হওয়ার কথা চিন্তা করে, বুঝতে পারে- সে বাঁচতে পারবে না; সামাজিক ও আইনগতভাবে তাকে বিরাট চ্যালেঞ্জ ও শাস্তির মুখে পড়তে হবে, তখন সে হত্যার কথা চিন্তা করে। হত্যা বা হত্যার চেষ্টা চালায়। ধর্ষকদের মধ্যে এটি একটি সাধারণ প্রবণতা। এখন কেন এত ঘটনা ঘটছে- তার ব্যাখ্যা তার কাছে নেই জানিয়ে ডিবির এ কর্মকর্তা বলেন, প্রত্যেক ঘটনায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি দায়ী। শিক্ষা ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো দুর্বলতার সুযোগে এমন ঘটছে, তা নয়। লেখক : সম্পাদক, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..