বর্ষা প্রকৃতির এক আশীর্বাদ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

এ এন রাশেদা : ষড়ঋতুর দেশ এ বাংলাদেশ। গ্রীষ্মের দাবদাহের পরে বর্ষা প্রকৃতিকে সতেজ ও সবুজ করে। গাছপালা তার শেকড় দিয়ে পানি শুষে নেয়। নদী-নালা কানায় কানায় পূর্ণ হয়। ভূ-গর্ভেও যায় বর্ষার পানি। প্রকৃতিকে ভারসাম্যের জায়গায় নিয়ে আসে। বর্ষার পরে পর্যায়ক্রমে আসে শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। প্রত্যেকের আছে আপন রূপ, মাধুর্য ও মহত্ত্ব। কিন্তু বর্ষার দানেই হয় সব সিক্ত। বর্ষা নতুন করে সাজতে শেখায় গ্রীষ্মের দাবদাহে তপ্ত প্রকৃতিকে। কবি সাহিত্যিকদের লেখায় তাই বর্ষা উঠে আসে নানা মাত্রিকতায়। কবিগুরুর ভাষায় বর্ষা নানা ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। যেমন- ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচে রে, হৃদয় নাচে রে’। ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে, পাগল আমার মন নেচে উঠে’। ‘এমনও দিনে তারে বলা যায়, এমনও ঘনঘোর বরিষায়’ ইত্যাদি। আবার তিনি প্রকৃতির বর্ণনা দিয়ে ‘আষাঢ়’ কবিতায় বলেছেন : নীল নবঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠঁঅই আর নাহিরে। ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে। বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর, আউশের ক্ষেত জলে ভরভর, কালিমাখা মেঘ ওপাড়ে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ চাহিরে! ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।। ওই ডাকে শোনো ধেনু ঘনঘন, ধবলীরে আনো গোহালে। এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে। দুয়ারে দাঁড়ায়ে ওগো দেখ দেখি মাঠে গেছে যারা তারা ফিরিছে কি, রাখালবালক কী জানি কোথায় সারা দিন আজি খোয়ালে। এখনি আঁধার হবে বেলাটুকু পোহালে।। শোন শোন ওই পারে যাবে বলে কে ডাকিছে বুঝি মাঝিরে। খেয়া-পারাপার বন্ধ হয়েছে আজি রে। . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . ,, এই কবিতার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বর্ষায় বাংলার একটি প্রকৃত রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। এই রূপের সঙ্গে আমাদের শৈশবে দেখা বর্ষার অনেক মিল আছে। সারাদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি হলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেত। জানালার ধারে বসে বৃষ্টির অবিরাম সেই দৃশ্য লক্ষ্য করতাম। বাড়ির সামনের মাঠ জলে ভরে উঠতো। বাড়ির হাঁসগুলো মহানন্দে সাঁতার কাটতো। পেছনের ডোবায় থাকা ব্যাঙগুলো কি মধুর সুরে ঘ্যাংগোর ঘ্যাং করেই ডাকতো। মা কিছুটা বৃষ্টিতে ভিজে রান্নাঘরে যেতেন এবং খিচুরি, আলুভর্তা বা কাঁঠালের বিচি ভর্তা বা ডিম ভাজা দিয়ে ভাত খেতে দিতেন। সপ্তাহধরে মুষুলধারার বৃষ্টিতে বাজারে যাওয়া যেত না। তাই সব মধ্যবিত্ত পরিবারই চাল, ডাল, লবণ, মরিচ, আলু বর্ষাকালের জন্য সঞ্চয়ে রাখতেন। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিতে ভিজতে হতো গৃহকর্মীদের। তাদের দেখতাম হাসিমুখেই দৌড়াদৌড়ি করছেন। আমাদের অবস্থান মফস্বল শহরে হওয়ায় গ্রামের মতো গরু চরাবার জায়গা অল্পবিস্তর ছিল বটে, কিন্তু মাঠে নেয়ার লোক সবসময় থাকতো না। তাই গরুগুলোর গোয়ালঘরে থেকে ‘হাম্বা হাম্বা’ করা আর জাবর কাটা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। রবীন্দ্রনাথ খেয়াঘাট বৃষ্টির কারণে বন্ধ হয়ে যাবার বর্ণনা দিয়েছেন, রাখাল বালকের জন্য তাঁর হৃদয়ের ব্যাকুলতাটুকুও প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের দেখা বর্ষার সঙ্গে আজও নদী ঘেঁষা গ্রাম বাংলার মিল পাওয়া গেলেও রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক বর্ষার মিল নেই। তবে গ্রামের খেয়া-ঘাটের খেয়া পারাপার বন্ধ হলেও ঢাকা শহরে অনেক রাস্তায় একটু বৃষ্টি হলেই খেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এখানে কোনো ব্যাঙের ডাক শুনতে পাওয়া যায় না। নালা-নর্দমা ভরাট হওয়ায় রাস্তাই পানির আঁধারে পরিণত হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসচেতনতার অভাব, নদী-নালায় কারখানার বর্জ্য ফেলায় এবং এতদিন কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় নদীর যা ক্ষতি হবার তাই হয়েছে। বুড়িগঙ্গার পানি আলকাতরার মতো হয়েছে। ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যস্ত যে শীতলক্ষ্যায় জাল ফেললে রোদের কিরণে রূপোর মতো চকচকে চাপিলা মাছসহ অন্যান্য মাছ এক কেজি সমপরিমাণ ১ টাকা ৫০ পয়সায় পাওয়া যেতজ্জঅথচ একদিন সকাল বেলা লাখ লাখ মাছ মরে ভেসে উঠতে দেখা গেল। আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। আমরা তখন ছিলাম সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যার পাড়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘সাইলো’র বাংলোতে। নদীর ঘাটে বসার জায়গা ছিল। মাছ ধরা দেখা যেত। গম ভর্তি জাহাজ ভেড়ার জায়গায় পিলারের গায়ে বড় বড় চিংড়িও পাওয়া যেত। তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা ছিলেন তারা যদি প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে আজকে শীতলক্ষ্যার এই করুণ পরিণতি হতো না। এইসব কারখানার মালিকরা যে কত বড় নিষ্ঠুর, কাণ্ডজ্ঞানহীন এবং নদীর পরিবেশ ধ্বংসকারী ব্যক্তি অথচ তাদের চিহ্নিত করতে এবং শাস্তির আওতায় আনতে তৎকালীন সামরিক জান্তার সরকার এবং পরবর্তী সরকারসমূহ কোনো উদ্যোগই নেয়নি। এভাবেই পরবর্তীতে অন্যান্য নদী একদিকে যেমন বিষাক্ত হয়েছে অন্যদিকে দখল হয়ে গেছে। এতদিন পরে সরকারি কোষাগারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে উদ্ধারের নামে হয়তো নাটকই চলছে। কেননা এর আগেও দখলকৃত জায়গা উচ্ছেদ হয়েছিল আবার দখল হয়েছে। কিন্তু তাদের থেকে ক্ষতিপূরণ কখনোই আদায় করা হয় নাই। এমন নানাভাবে অবহেলাজনিত আঘাত আমাদের প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব এনেছে। এগুলোর মধ্যে সম্প্রতি বজ্রপাতও অন্যতম। বজ্রপাতে কয়েকশত মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। কেউ কেউ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে– এদের জন্য সরকারের কোনও সাহায্য তহবিল নেই। সরকার বা জনগণ কেউ এগিয়ে আসছে না, এরা বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান তাই। শুধু মানুষ নয়, পুকুরের মাছও বজ্রপাতে মরে ভেসে উঠছে। বজ্রপাত ঠেকানোর উপায় একমাত্র তালগাছ বলা হচ্ছে, তাই দ্রুততম সময়ে জমির পাশ দিয়ে রাস্তার ধার দিয়ে তা লাগানোর উদ্যোগ নেয়া দরকার। এই উদ্যোগে জনগণও এগিয়ে আসতে পারে এবং আসা উচিত। তাদের নিজস্ব জমির পাশ দিয়ে। আশির দশক থেকেই এদেশের এবং সমগ্র বিশ্বের প্রকৃতিবিদরা সরকার এবং জনগণকে সতর্ক করে আসছে এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু সব সরকারই সব কিছুকেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। সুন্দরবনের পাশে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের তীব্র প্রতিবাদও বর্তমান সরকার অবজ্ঞা করেছে। বিদেশি সংস্থার হুঁশিয়ারিও আছে সুন্দরবন নিয়ে। কিছুদিন পূর্বে জাতিসংঘের ঐতিহ্য রক্ষা কমিটি আবারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে। প্রতিবাদেও তাদের থামাতে পারেনি সেখানকার জনগণ। অথচ প্রকৃতিকে চোখের মণির মতো রক্ষা করা মানব প্রজাতিরই দায়িত্ব ও কর্তব্য নিজের স্বার্থে। বর্ষা ছাড়া প্রকৃতি বাঁচে না। বলা যায়, বর্ষা, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষার পথরেখা। বর্ষার শীতল পরশে তাই উৎসবে মেতে উঠে জনপদ। নৌকাবাইচ, সঁঅতার প্রতিযোগিতা, হা-ডু-ডু, কাদামাটি খেলা ইত্যাদি মানুষকে উদ্বেলিত করে, আন্দোলিত করে বর্ষার মেঘমালার মতোই। এসব উৎসব কোনও বিশেষ সম্প্রদায়ের নয়। সব ধর্মাবলম্বী, আদিবাসিসহ সবার। তাই তো অনেক সংগঠনই আষাঢ়ের প্রথম দিন নাচে-গানে কবিতায় এই বর্ষা উৎসবের আয়োজন করে বর্ষাকে আবাহন করে। এ বছর আষাঢ়ের প্রথম দিনেই মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। আর শেষ সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে এবং উত্তর-পূর্বাংশসহ সারা দেশেই প্রবল বর্ষণ শুরু হয়েছে। ১৩ জুলাই দৈনিক এক পত্রিকার শিরোনামে বলা হয়েছে ‘দশ জেলায় নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপরে’। বাড়ছে নদ-নদীর পানি। বৃষ্টির কারণে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারি বর্ষণে ১০ জেলায় নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশংকায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। বন্যায় চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, সোমেশ্বরী, ফেনী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, হালদাসহ প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। তাই নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। তারা আরও জানিয়েছে, ভারি বৃষ্টির কারণে দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পঞ্চিমাঞ্চল এবং ভারতের আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। কোথাও কোথাও অতি ভারি বৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আরও কয়েকদিন দেশের সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে এবং যমুনা নদীর জামালপুর জেলায় বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর বর্ণনার অর্থ হলো– প্রকৃতির এই অকৃত্রিম দান আমরা সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও মানবজীবনে কাজে লাগাতে পারছি কি না? নাকি তা দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে? দুর্ভোগের ভাগই বেশি। কারণ বৃষ্টি এলে রাস্তা খোড়াখুড়ি, বাঁধ মেরামতের উদ্যোগের জন্য চিঠি চালাচালি, দুর্নীতি অর্থাৎ মেরামতের সবটুকু অর্থই লোপাট করাসহ সব কিছু। আবার সারা বছর সুপেয় পানির জন্য যাদের হাহাকার থাকে, তারা কেউই বৃষ্টির নির্মল সুপেয় পানিটুকুও ধরে রাখতে পারি না দক্ষিণ বঙ্গের মানুষ ছাড়া। তিস্তায় শুষ্ক মৌসুমে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আমাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে আবার বর্ষা মৌসুমে সব স্লুইচ গেট খুলে দেয়– এ পর্যায়ে বিজ্ঞানের আশীর্বাদে কি আমরা বর্ষায় সেই পানিকে ধরে রাখতে পারি না? অবশ্যই পারি। কিন্তু কেন করি না? কারণ বছর বছর লুটপাটের পথ কোনো সরকাররই বন্ধ করতে চায় না–তাই। মানুষের দুর্দশা এবং নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়ায় যাই চলুক না কেন? এখন প্রয়োজন জনগণের সচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রকৃতির দান বর্ষাকে মানুষের মঙ্গলে সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত করা। বর্ষা ধরণী শীতল করুক, সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আনুক সেটাই তো আমাদের সবার কামনা। লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক একতা

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..