ইতিহাসের পাতা থেকে

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা
প্রমিতি কিবরিয়া ইসলাম : ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে মহাশূন্যে পরিভ্রমণ করেন। তার পুরো নাম ভ্যালেন্তিনা ভ্লাদিমিরোভনা তেরেশকোভা। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত সোভিয়েত নভোচারী, প্রকৌশলী। ভ্যালেন্তিনার জন্ম ১৯৩৭ সালের ৬ মার্চ মধ্য রাশিয়ার ভোলগা নদীর পাশে মাসলিনিকোভা গ্রামে। শৈশবকালে তিনি প্যারাসুটের মাধ্যমে আকাশে চড়ার স্বপ্ন দেখতেন। ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা ২১ মে ১৯৫৯ সালে, ২২ বছর বয়সে প্রথম প্যারাসুট নিয়ে প্রথম আকাশ থেকে লাফ দেন। এ অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানই তাকে নভোচারী হিসেবে যোগ দিতে ব্যাপকভাবে সহযোগিতা করেছিল। সোভিয়েত স্পেস প্রোগ্রাম বিশ্বের প্রথম নারী হিসেবে একজনকে মহাশূন্যে ভ্রমণে পাঠানোর জন্য আবেদনপত্র আহ্বান করে। চার শতাধিক আবেদনকারীর মধ্যে ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা নির্বাচিত হন। এই একক অভিযানে তিনি ছাড়াও নির্বাচিত হয়েছিলেন আরও চারজন নারী নভোচারী। তিনি রাশিয়ার প্রথম নারী হিসেবে মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন ভস্তক ৬ মহাযানে মহাশূন্য ভ্রমণ করেন। একক মিশনে পৃথিবীকে ৪৮ বার আবর্তিত করা, একমাত্র নারী নভোচারী হলেন ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভা। মহাকাশে অবস্থান করেন দুদিন ১২ ঘণ্টা ২৩ মিনিট। ‘ভস্তক ৬’-এর দুদিন আগে উৎক্ষেপণকারী ‘ভস্তক ৫’-এর রুশ নভোচারী ভালেরি এফ বাইকোভস্কিকে সঙ্গে নিয়ে ১৯ জুন পৃথিবীতে অবতরণ করেন। তবে সবার তুলনায় বেশি সময় কাটিয়ে মহাকাশ বিজ্ঞানীদের তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভ্যালেন্তিনা। তার ফ্লাইটের পরে, তেরশকোভা ‘ঝুভোস্কি এয়ার ফোর্স ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমিতে’ অধ্যয়ন করেন এবং মহাজাগতিক প্রকৌশলী হিসেবে পার্থক্য নিয়ে স্নাতক হন। ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে তিনি অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডক্টরেট অর্জন করেন। নিজের কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্য দেশে-বিদেশে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ভ্যালেন্তিনা তেরেশকোভার অবদানের জন্য তার দেশ তাকে রাষ্ট্রীয় বীর উপাধি দেন। অ্যাডা লাভলেস ১৯ শতকের নারী গণিতবিদ অগাস্টা অ্যাডা কম্পিউটার প্রোগ্রামের প্রথম ধারণা দেন । পুরো নাম তার অ্যাডা অগাস্টা কিং, আর ডাকা হতো কাউন্টেস অব লাভলেস বা শুধুই অ্যাডা লাভলেস নামে। তিনি বিখ্যাত ব্রিটিশ কবি লর্ড বায়রন এবং আনা ইসাবেলা বায়রনের কন্যা। অগাস্টা অ্যাডা বায়রন ১৮১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর লন্ডন, ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেবেলা থেকেই অ্যাডার মা তাকে গণিত ও বিজ্ঞানে দক্ষ করে তুলতে চাইতেন। ১৮২৯ থেকে তিনি হাম এবং পক্ষাঘাতগ্রস্ততায় ভুগছিলেন। কিন্তু ক্র্যাচে

অ্যাডা লাভলেস
ভর দিয়ে তিনি শিক্ষা চালিয়ে গিয়েছেন। ১৮৩২ এ যখন তার বয়স ১৭ তখন তার বিশেষ গাণিতিক প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। তার শিক্ষক ছিলেন গণিতজ্ঞ ও যুক্তিবিদ ডি-মরগ্যান। স্যার চার্লস ডিকেন্স, স্যার চার্লস হুইটস্টোন এবং বিজ্ঞানি মাইকেল ফ্যারাডের সঙ্গেও তার জানাশোনা ছিল। ১৮৩৩ সালের ৫ জুন তার সঙ্গে পরিচয় হয় বিশ্ববিখ্যাত স্যার চার্লস ব্যাবেজের সঙ্গে। ১৮৪১ সালের দিকে চার্লস ব্যাবেজ ডিফারেন্স ইঞ্জিনের চেয়ে অধিকতর আধুনিক এবং জটিল কম্পিউটার ‘অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন’ এর ধারণা উপস্থাপন করেন। অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিনের পরিকল্পনা করতে গিয়ে ব্যাবেজ যে সমস্যার সম্মুখীন হন তা হচ্ছে– এই ইঞ্জিনের গাণিতিক হিসাবগুলো কোন পদ্ধতিতে করবে তা। এ ক্ষেত্রে ব্যাবেজকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন অ্যাডা। তিনি অসংখ্য বীজগাণিতিক উপায় যোগ করেন তার নোটগুলোতে। অন্যদিকে ‘বার্নোলি সংখ্যা’ নামক একটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হন ব্যাবেজ। অ্যাডা এই সমস্যার সমাধান করেন। তিনি পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার অ্যালগরিদম রচনা করেন। বার্নোলি সংখ্যার এই অ্যালগরিদমের জন্যই অ্যাডা লাভলেসকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার। আজকের যুগের আধুনিক কম্পিউটারের ধারণা প্রবর্তনে ব্যাবেজের পাশাপাশি অ্যাডার ভূমিকাও অপরিসীম। অ্যালগরিদম রচনা করে তিনি অনুধাবন করেন যে, অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন কেবল গণনাযন্ত্র হিসেবে নয়, ব্যবহৃত হবে আরো অসংখ্য কাজে। তিনি তার নোটে লিখেছিলেন, যে কোনো বিষয় যেমন গান, ছবি ইত্যাদিকে যদি সংখ্যায় পরিণত করার উপায় খুঁজে বের করা যায়, তাহলে কম্পিউটারের মাধ্যমে তার পরিবর্তন করা সম্ভব। ল্যাভলেস ২৭ নভেম্বর, ১৮৫২ সালে ক্যান্সার এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা যান । মৃত্যুর প্রায় ১৫০ বছর পর ১৯৫০ সালে কম্পিউটার সায়েন্সে অ্যাডা ল্যাভলেসের অবদানটি নজরে আসে এবং ১৯৫৩ সালে B.V. Bowden অ্যাডার আর্টিকেল ‘Faster than Thought: A Symposium on Digital computing Machines’ এ পুনঃপ্রকাশ করেন। ১৯৮০ সালে ‘The U.S Department of defense’ একটি নতুন কম্পিউটার ল্যাঙ্গুয়েজের নামকরণ করে “Ada”। অগাস্টা অ্যাডা ল্যাভলেসের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এ বিশেষ অবদানের জন্য বিশ্বব্যাপী ২৪ মার্চ “অ্যাডা ল্যাভলেস” দিবস হিসেবে পালিত হয়। “কনসিভিং অ্যাডা” নামে তাকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। সেলমা লাগেরলফ সেলমা লাগেরলফ ছিলেন একজন সুইডিশ লেখক, শিশুসাহিত্যিক এবং শিক্ষক। সুইডেনে জন্ম নেয়া সেলমা হচ্ছেন পৃথিবীর প্রথম নারী, যিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেলমা লাগেরলফ

সেলমা লাগেরলফ
১৮৫৮ সালের ২০ নভেম্বর তিনি সুইডেনের মারবাকা অঞ্চলের ভার্মল্যান্ড শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এরিক গুস্তাফ লাগেরলফ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন এবং মাতা ছিলেন এলিজাবেথ লভিসা ওয়ালওর্য়াথ। মাত্র তিন বছর বয়সের সময় লাগেরলফ পক্ষাঘাতের কারণে পঙ্গু হয়ে যান। এরপর আর কখনও খুব একটা চলাচল করতে পারেন নি। তিনি ছোটবেলায় বাবা, মা, ঠাকুমা ও প্রিয় সেবিকা কায়েসোর কাছ থেকে মজার মজার গল্প শুনতেন আর কোন গল্প বা কবিতার বই পেলে সাথে সাথে পড়ে ফেলতেন। পঙ্গুত্বের কারণে ছোটবেলা তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্ভব হয়নি, ঘরে বসে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেছেন। শারীরিকভাবে পঙ্গু হলেও মানসিকভাবে কখনই ভেঙে পড়েননি সেলমা। ১৮৮২ সালে তিনি স্কুলে শিক্ষকতা করার প্রত্যাশায় সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের ‘রয়্যাল উইমেন্?স সুপিরিয়র ট্রেনিং একাডেমি’ থেকে প্রশিক্ষণ নেন। ১৮৮৫ লান্ড্?সক্রোনায় অবস্থিত একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত এই স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে ইডান নামক একটি সুয়েডীয় পত্রিকায় গল্প লেখার প্রতিযোগিতার আহ্বান জানানো হয়। এখানে গল্প লিখেই সেলমা লেখালেখি জীবনের সূচনা ঘটান। প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। এরপর থেকে প্রায়শই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। ১৮৯১ সালে সেলমা লাগেরলফের প্রথম বই দ্য স্টোরি অফ গোস্টা বার্লিং প্রকাশিত হয় । দুই খণ্ডের এই বইটি ছিল ভার্মল্যান্ডের লোককাহিনীর একটি গীতিধর্মী বর্ণনাকেন্দ্রিক উপস্থাপনা। ১৮৯৮ সালে এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ১৮৯৫ সালে শিক্ষকতা ত্যাগের পর পুরোদমে লেখালেখি শুরু করেন। তার উল্লেখযোগ্য লেখার মধ্যে রয়েছে- গোস্টা বার্লিংয়ের গল্প (১৮৯১), অদৃশ্য সংযোগ (১৮৯৪), লিলজেক্রোনার বাড়ি (১৯১১), নির্বান্ধব মানুষেরা (১৯১৮), এক সুয়েডীয় বাস্তভিটা থেকে(১৮৯৯), নীল নদের চমৎকার রোমাঞ্চ অভিযান, (১৯০৬), মানব ও দানবেরা (১৯১৫)। তাঁর আত্মজীবনীর মধ্যে রয়েছে- মারবাকা (১৯২২), আমার বাল্যস্মৃতি (১৯৩০), সেলমা লাগেরলফের ডায়েরি (১৯৩২)। ১৯০৪ সালে একাডেমি তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯০৯ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার এবং ১৯১৪ সালে তিনি সুইডিশ একাডেমির সদস্য হন। একাডেমী সদস্যপদ এবং তার নোবেল সাহিত্য পুরস্কার উভয় ক্ষেত্রে তিনি প্রথম সম্মানিত নারী ছিলেন। ১৯৯১ সালে যখন প্রথম ২০-ক্রোনার নোট প্রকাশ করা হয় তখন তিনি সুইডিশ ব্যাংকনোটে চিত্রিত প্রথম মহিলা হন। দীর্ঘদিন অসুস্থতার পর তিনি ১৯৪০ সালের ১৬ মার্চ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..