আত্মসুরক্ষার শঙ্কায় নারীর দিনরাত্রি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা ফিচার : নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি সর্বোপরি নারী নির্যাতন বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহতম রূপ ধারণ করেছে। কী গ্রাম কী শহর-নগর নারী আজ আর কোথাও নিরাপদ নয়। ঘর থেকে শুরু করে চলার পথে কর্মস্থলে প্রতিটি পদে পদে আত্মসুরক্ষার শঙ্কা নিয়ে যাপিত হচ্ছে নারীর দিনরাত্রি। পুরুষের হিংস্র নখর আর লোলুপতা নারীকে অহর্নিষ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। গৃহ, সমাজ, রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষরূপী বিকৃত দানবদের চোখে নারী হয়ে উঠেছে কেবলই ভোগ্যপণ্য, যৌন লালসার এক মাংসপি-। নারীর ক্ষমতায়নে সারা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। অথচ বাংলাদেশে ধর্ষণ-যৌন হয়রানি আজ কত সহজ ও সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা- আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েরাই সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ১৮ দিনে ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাদের মধ্য ১৫ জনই শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের পর হত্যার শিকারও হয় এরাই বেশি। বলার অপেক্ষা রাখে না, অনেক ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। কী ভয়ংকর উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। অথচ রাষ্ট্র নির্বিকার। প্রায় একশ কুড়ি বছর আগে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সময়ে আমাদের চোখ, আমাদের সমাজ, আমাদের রাষ্ট্র যে চোখে নারীকে দেখত, এখনও সেই চোখেই দেখে। ১৮৪২ সালে মাইকেল যখন হিন্দু কলেজের ছাত্র, বয়স আঠারো, তখন নারী শিক্ষা নিয়ে যে প্রবন্ধ লিখে প্রথম পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেই প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন- ‘ভারতীয় নারীরা যেন বস্তুসামগ্রী- তারা আসবাবপত্রের মতো। তারা শুধু ভোগের উপকরণ মাত্র’। বলাবাহুল্য, তখন বাংলাদেশ অবিভক্ত ভারতবর্ষেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারপর সেই নারীসমাজ রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামালের মতো মনীষী-বিদূষীদের হাত ধরে অন্ধকার ঘরের কোণ ছেড়ে মুক্তির পথ খুঁজেছে। কিন্তু যথার্থ মুক্তির পথ আজও মেলেনি। এর অন্যতম প্রধান কারণ রাষ্ট্রের সদিচ্ছার অভাব। যাকে মোটা দাগে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বললেও অত্যুক্তি হয় না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জরিপে যে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে সেই একই সময়ে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ১৯ হাজারের বেশি; গড়ে প্রতিদিন ১১টি মামলা হচ্ছে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম। গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ১৫ বছরে (২০০২-১৬) আসা ধর্ষণসংক্রান্ত নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোর মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয়েছে। এ চিত্র শুধু যে বাংলাদেশে তা নয়। বিশ্বজুড়েই আজ নারীর প্রতি যৌন নিপীড়নের মাত্রা চরমে পৌঁছেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ নিয়ে গেল বছর ‘মি টু’ আন্দোলনের ঝড় উঠেছিল। শুনলে ভয়ে গা শিউড়ে উঠে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন জাতিসংঘের কর্মচারীদের হাতেও নারী আজ নিরাপদ নয়। জাতিসংঘ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু ম্যাসেলিওড এক প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, ১০ বছরে জাতিসংঘ কর্মীদের দ্বারা ৬০ হাজারেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রায় ২০ বছর ধরে এমন তথ্য গোপন রাখার পর গেল বছর ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী প্রীতি পাটেলের হাতে এ বিষয়ক একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন ম্যাসেলিওড। প্রতিবেদনে জানানো হয়, প্রায় ৩ হাজার ৩০০ শিশু নিপীড়ক জাতিসংঘে কর্মরত আছেন। বিশ্বজুড়ে ঝুঁকিতে থাকা নারী-শিশুদের ধর্ষণ করতেই তারা দাতা সংস্থাগুলোতে চাকরি নেয়ার চেষ্টা করেন। বিশ্বজুড়ে চলমান এই বীভৎস পরিস্থিতির বিরুদ্ধে ব্যক্তি পর্যায় থেকে সামাজিক রাষ্ট্রীয় তথা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা আজ একান্ত জরুরি। পাশাপাশি পাল্টাতে হবে সর্বক্ষেত্রে বদ্ধমূল পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..