ঝর্ণাধারা চৌধুরী

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

মৌরী সিদ্দিকা : সমাজসেবা ও জনকল্যাণে আত্মনিবেদিতা চিরকুমারী পরম শ্রদ্ধেয়া মহীয়সী ঝর্ণাধারা চৌধুরী মানবসেবার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শুধুমাত্র মানবসেবার জন্য তিনি গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। সংসার ত্যাগী, ব্রহ্মচারিণী ঝর্ণাধারা চৌধুরী ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা গান্ধীয়ান প্রমথ চৌধুরী ও মা আশালতা চৌধুরীর দশম সন্তান তিনি। মাত্র নয় বছর বয়সে ১৯৪৬ সালে নিজ চোখে দেখেছিলেন অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞের বীভৎস ঘটনা। ২৬ জন নিরীহ মানুষকে আগুনে নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে মারার দৃশ্য তাঁকে দারুণভাবে মর্মাহত করে। মানুষের অসহায়ত্ব এবং দুর্দশাই মূলত তাঁকে মানবসেবার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছে। ঝর্ণাধারা চৌধুরী চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৭ বছর বয়স থেকেই মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। নিজ গ্রামে দুস্থ শিশুদের জন্য স্কুল চালু করলেও অর্থাভাবে তা বেশিদূর এগোয়নি। এরপর তিনি নিজেকে বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলেন। চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘের শিক্ষিকা এবং অনাথালয়ের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে তার মানবসেবা শুরু হয়। সমাজ সেবার পাশাপাশি তিনি পড়াশুনা চালিয়ে গেছেন। ১৯৫৪ সালে তাঁর বাবা মারা যাওয়ার পর ১৯৫৬ সালে গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত অম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্টে (গান্ধী আশ্রমা ট্রাস্ট) যোগ দেন। এই ট্রাস্ট নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও কুমিল্লা জেলার প্রায় বারো লাখ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার পাশাপাশি শান্তি, সম্প্রাতি ও অহিংসা প্রসারের লক্ষ্যে কাজ করেছে। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের মাধ্যমে দরিদ্র জনগণ শিক্ষার আলো লাভ করেছে। এছাড়াও কৃষি, মৎস্য, কুটিরশিল্প প্রভৃতির মাধ্যমে গ্রামীণ জনগণ স্বাবলম্বী হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নে ঝর্ণাধারা চৌধুরীর অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৬০ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সংসারত্যাগীদের সংগঠন চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘে যোগদানের মাধ্যমে সরাসরি মানবসেবায় নিয়োজিত হন। অনাথ শিশুদের জীবন গঠনে তিনি মূল্যবান ভূমিকা পালন করেছেন। সেবার মধ্য দিয়ে তিনি অনাথ শিশুদের আত্মপ্রত্যয়ী ও স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলেছেন। তিনি তাদের শিখিয়েছেন জীবনে পরাজিত হতে নেই, জয় পতাকা হাতে অগ্রসর হয়ে জীবনকে সার্থক করে তুলতে হবে। এরপর ’৭১। প্রবর্তক সংঘ ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুুদ্ধ চলাকালে প্রবর্তক সংঘের প্রায় ৫০০ শিশু ও কিশোরীকে ক্যাথলিক মিশনের সহায়তায় পাকহানাদার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচিয়ে আগরতলা নিয়ে যান। আগরতলা গিয়ে তিনি ত্রাণ কাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। হানাদার বাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত প্রবর্তক সংঘের কর্তাব্যক্তিদের মরদেহ সৎকার এবং স্বাধীন বাংলাদেশে বিধ্বস্ত প্রবর্তক সংঘ পুনর্গঠনে তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালে আবারো গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টে ফিরে আসেন এবং ১৯৯০ সালের ১৩ জুন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের ৮০ টি বছর পার করেছেন মানবসেবায় নিজেকে ডুবিয়ে রেখে। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শকে মনের মধ্যে লালন করেছেন তিনি। মানবপ্রেমে ডুবে থাকার অনুপ্রেরণা তার অবচেতন মনে সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি মনে করতেন নিজেকে সংসারের মায়ায় জড়িয়ে সমস্ত লোভ-লালসা বিসর্জন না দিতে পারলে পরিপূর্ণরূপে মানবসেবায় ডুবে থাকা যায় না। এজন্যই হয়তো তিনি চিরকুমারী থেকে গেলেন। তিনি অনাথ, হতদরিদ্র শিশুগুলোকেই নিজের সন্তান মনে করতেন। তিনি মনে করতেন তারাই তাঁর আপনজন। জীবদ্দশায় বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এরকম কথা বলেন তিনি। তাঁকে একবার এক সংবাদ কর্মী জন্মদিনের কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, আমার জন্মদিনে কেউ যদি আমাকে মনে করতে চায়, তবে সে যেন কোনো প্রতিবন্ধী শিশুর মায়ের কাছে যায়। তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে মিষ্টি কথা বলে। ইচ্ছে হলে তাকে কোনো উপহার দিতে পারে। সেটাই আমার জন্য কিছু করা হবে। ঝর্ণাধারা চৌধুরী আজীবন হতদরিদ্র, অসহায়, নির্যাতিত, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ আলোর পথ খুঁজে পেয়েছে, আবার তারা বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পেয়েছে সমানতালে। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গান্ধীজী নোয়াখালীতে প্রায় চার মাস ছিলেন। ৪৯ টি গ্রাম হেঁটে পরিদর্শন করেছিলেন। নোয়াখালীর জয়াগের তৎকালীন জমিদার হেমন্তকুমার ঘোষের বাড়িতে একদিন ছিলেন তিনি। হেমন্তকুমার আড়াই হাজার একর জমি দান করেছিলেন গান্ধী আশ্রম করার জন্য। পাকিস্তানিরা সে জমি কেড়ে নেয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অবস্থা পাল্টালেও ১৯৯০ সালে দুর্বৃত্তরা আবার গান্ধী আশ্রম দখল করতে আসে। আড়াই হাজার একর জমি কমতে কমতে এখন ২৫ একরে ঠেকেছে। আমৃত্যু তিনি সমাজসেবায় নিজেকে জড়িয়ে রাখেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ, ভারতের ৬৪ তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে ভারত সরকার ঝর্ণাধারা চৌধুরীকে ভারতের তৃতীয় বেসামরিক সর্বোচ্চ পুরস্কার পদ্মশ্রী খেতাবে ভূষিত করেন। পদ্মশ্রী পুরস্কার কয়েকটি বিদেশি নাগরিকদের প্রদান করা হয়ে থাকে। ঝর্ণা ধারা চৌধুরী পদ্মশ্রী পুরস্কার বিজেতা প্রথম এবং এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি নাগরিক। সমাজ সেবক হিসেবে ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক বাজাজ পুরস্কার, ২০০০ সালে শান্তি পুরস্কার, ২০১৫ সালে একুশে পদক, ২০০২ সালে নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি হিসেবে অনন্যা পুরস্কার, ২০১৩ সালে বেগম রোকেয়া পদক, ২০০৭ সালে সাদা মনের মানুষ পদক, ২০১০ সালে শ্রীচৈতন্য পদক ও চ্যানেল আই এবং রাঁধুনীর পক্ষ থেকে ‘কীর্তিমতি নারী’ পুরস্কার, ২০১১ সালে হরিয়ানা কর্তৃক ‘গান্ধী স্মৃতি শান্তি সদ্ভাবনা’ পুরস্কার, ২০০৩ সালে নারী পক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক, নিউ ইয়র্কের ওল্ড ওয়েস্টবেরি ইউনিভার্সিটির শান্তি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এই প্রখ্যাত সমাজসেবী ২০১৯ সালের ২৭ জুন বার্ধক্যজনিত কারণে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..