একাত্তরের ‘লেফটেন্ট’ নুরুল হক

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
জামশেদ আলম : বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাদের একজন এ.কে.এম নুরুল হক (জন্ম তারিখ: ১ নভেম্বর ১৯৫২ ইং)। তাঁর বাবা মির্জা মো. আহসান উদ্দিন (মরহুম) বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মায়ের নাম ছিল মিসেস নুরুন নেছা। তিনি প্রথমে ঢাকার গুলবাগ এবং পরবর্তীতে আজিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। নুরুল হক তিন ভাই এবং তিন বোনের মধ্যে জ্যৈষ্ঠ। অন্য দুই ভাই হলেন এনামুল হক এবং মাজহারুল হক। তিন বোনের নাম- শিরীন, রুবি এবং ছবি। যুদ্ধকালীন সময়ে নুরুল হকের মা ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঢাকার গুলবাগে এবং নুরুল হক বাবার সাথে ঢাকার বাড্ডায় বসবাস করতেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নুরুল হকের মা-বাবা সবাই মিলে ১৮/এন আজিমপুর কলোনিতে সরকারী বাসায় বসবাস শুরু করেন। নুরুল হক ১৯৭৯ সালে বেলারুশ ন্যাশনাল টেকনিক্যাল ইউনির্ভাসিটি (Belarus National Technical University/BNTU) হতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ মাস্টার্স ডিগ্রি এবং ১৯৮৩ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় হতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (মেশিন টুলস) - এ পিএইচ.ডি (চয.উ) ডিগ্রি লাভ করেন। নুরুল হক ১৯৬৮ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি সরকারি বিজ্ঞান কলেজ (সাবেক Intermediate Technical College) এ ভর্তি হন। ১৯৬৯ সালে ১১ দফা আন্দোলনের সময় নুরুল হক বন্ধু আবদুস সোবহানের অনুপ্রেরণায় বিভিন্ন মিটিং এবং মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, নুরুল হকের মায়ের আপন মামা কাজী জহিরুল হক (মরহুম) - তখনকার বামপন্থি আন্দোলনের সক্রিয় নেতা ও কর্মী ছিলেন। কমরেড সাজ্জাদ জহির (চন্দন) এর বাবা হলেন কাজী জহিরুল হক এবং উনার বাসা ছিল ঢাকা আগামাছি লেইন- এ। জনাব কাজী জহিরুল হক ন্যাপ (মোজাফ্ফর) এর ঢাকা শহর কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন। অন্যদিকে নুরুল হকের মা-এর মামাতো ভাই হলেন জনাব মতিউর রহমান (বর্তমানে দৈনিক প্রথম আলো’র সম্পাদক)। জনাব মতিউর রহমান এর বাবা জনাব ফজলুর রহমান মোক্তার ঢাকার বংশালে বসবাস করতেন। কাজী জহিরুল এবং জনাব ফজলুর রহমান মোক্তার ছিলেন মামাতো-ফুপাতো ভাই। আত্মীয়তার সূত্রে কাজী সাজ্জাদ জহির (চন্দন) এবং জনাব মতিউর রহমানের বাসায় নুরুল হকের প্রায়ই যাতায়াত ছিল। তাঁদের সংস্পশে থেকে বামপন্থি ধারার বইপুস্তুক পড়ার সুযোগ পায় নুরুল হক। শিখা-র গোপন কপিগুলো নুরুল হক পড়েছেন কাজী জহির এর বাসার সংগ্রহ থেকে। ২৫ মার্চ ৭১-এর রাতে নুরুল হকের মা ছিলেন ঢাকায় গুলবাগে। সেই সময় পাক-সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে তার রুখে দাঁড়ানোর প্রবল ইচ্ছা জাগলো। উল্লেখ্য যে, সে সময় ঢাকা শহরে চলাচল এবং যোগাযোগ করাটা খুব সহজ ছিল না। যে যার মত ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন স্থানে প্রাণ রক্ষার্থে আশ্রয় নিয়েছিল অথবা ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলো। এমতাবস্থায় নুরুল হককে হায়দার এর সাহায্য নিতে হলো, যদিও ফারুকী সে সময় আওয়ামী লীগ কর্তৃক মনোনীত প্রাদেশিক গণপরিষদের সদস্য ছিলেন। যেকোনভাবে হোক যার মাধ্যমেই হোক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করাই ছিল নুরুল হকের একান্ত ইচ্ছা। ফারুকীর বাড়ি ছিল কুমিল্লার মতলবে ছেংগার চরে। ফারুকীর বাসায় একরাত যাপনের পর তিনি একখানা চিঠি লিখে নুরুল হকের হাতে দেন। উক্ত চিঠিতে লিখা ছিল “পত্র বাহক আমার পরিচিত। পত্র বাহক এবং তাঁর সাথী কাজের প্রত্যাশী”। সে দিন সকাল বেলায় তিনি (ফারুকী) একজন নৌকার মাঝি-কে বলে দিলেন যাতে মাঝি নুরুল হক এবং তাঁর সঙ্গী তারেককে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপর কালির বাজারের নিকট একটা স্থানে পৌঁছে দেন। সেই নৌকার মাঝি ছিলেন ব্রিটিশ শাসন আমলের লাল ঝান্ডায় অংশগ্রহণকারী একজন সাহসী মানুষ। তিনি ফারুকী সাহেবের খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন বলে নুরুল হক ও তাঁর সঙ্গীর কাছে মনে হয়েছে। নৌকাতে কালির বাজারের কাছে নিরাপদে পৌঁছে তারা দু’জন কালির বাজার থেকে বাসযোগে কুমিল্লার চান্দিনা এবং সেখান থেকে রিকশা করে কুমিল্লার জাফরগঞ্জ এবং জাফরগঞ্জ থেকে পদব্রজে বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ভিতরে বক্সনগরে পৌঁছেন। এ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে নুরুল হক এবং তার সঙ্গী জনাব তারেক খুবই ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েন। ভারত থেকে ফেরত এসে ঢাকাতে অবস্থানের কিছুদিনের মধ্যে নুরুল হক বন্ধু সোবহানের সাথে যোগাযোগ করে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দু’জন ভারতের উদ্দেশে যাত্রার দিন-ক্ষণ ঠিক করে। এ সময় নুরুল হক তাঁর মায়ের অনুমতি নিয়ে যাত্রার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু তাঁর মা এতে অনীহা পোষণ করেন। মায়ের অনুমতি প্রার্থনা করে নুরুল হক তখন প্রখ্যাত রুশ লেখক নিকোলাই অস্ত্রভক্সির উক্তিটি মাকে শুনিয়ে মা-কে উদৃদ্ধ করতে সক্ষম হন। উক্তিটি ছিল: ‘মানুষের জীবন শুধুমাত্র একটিবারের জন্য আসে। তাকে এমনভাবে বাঁচতে হবে যেন মৃত্যুর সময় কোনও গ্লানি তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে।’ নুরুল হকের মা নিজ হাতে পিঠা বানিয়ে পুত্রকে খাইয়ে বিদায় দেন। উল্লেখ্য যে, নুরুল হক মাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হন যে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার (নুরুল হকের) মৃত্যুও হতে পারে। নুরুল হক সাথী সোবহানকে নিয়ে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করে। প্রথমে তারা ঢাকা থেকে বাসযোগে কুমিল্লার চান্দিনা, তারপর চান্দিনা থেকে রিকশা করে জাফরগঞ্জ এবং জাফরগঞ্জ থেকে পায়ে হেঁটে বক্সনগর পৌঁছেন। তবে জাফরগঞ্জ থেকে পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথটি কিছুটা পরিবর্তন করে যাতে করে পাক মিলিটারিদের বাঙ্কারে বসে থাকা অবস্থানকে এড়িয়ে যাওয়া যায়। বক্সনগর পৌঁছে নুরুল হক দেখতে পায় যে, প্রফেসর রউফ এর পূর্বের ক্যাম্পটা স্কুল ঘর থেকে একটি উঁচু পাহাড়ে স্থানান্তরিত হয়েছে এবং তা পূর্বের তুলনায় অনেকটা সুশৃঙ্খল। প্রফেসর রউফ এর ক্যাম্প এ পুনরায় এসে নুরুল হকের মনের মধ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রবল ইচ্ছা জাগলো-কবে যুদ্ধে যাবে। সে চিন্তা থেকে নুরুল হক বন্ধুকে নিয়ে আগরতলা যাবার সিদ্ধান্ত নেন বামপন্থিদের খুঁজে বের করার এক দৃঢ় প্রত্যয়ে। এমতাবস্থায় বন্ধু সোবহান এবং ঢাকার ধনিক নুর আলীকে নিয়ে আগরতলা রওনা দেয়ার জন্য গভীর রাতে গোপনে ক্যাম্প ত্যাগ করেন। অবশ্য এ সময় তাদের মনে ভয় ছিল যে ক্যাম্প ছাড়ার জন্য বাধা আসতে পারে। অনেক পথ হেঁটে তারপর সোনাইমুড়ি থেকে বাসযোগে ভারতের আগরতলাতে অবস্থিত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সি.পি.আই.) অফিসে পোঁছাতে সক্ষম হন। পথিমধ্যে ক্ষুধা নিবারণের জন্য নুর আলী তাঁর ভাঙা ছাতাটির বিনিময়ে একটা কাঁঠাল নেন এবং তা তিন জনে খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেন। উল্লেখ্য যে, উক্ত সি.পি.আই. অফিস থেকে তাদের তিনজনকে আগরতলায় অবস্থিত Craft Teacher Training Institute (CTTI) হোস্টেলে পাঠানো হলো। এই CTTI হোস্টেলে নুরুল হক তাঁর পূর্বের পরিচিত অনেক বামপন্থি নেতাদের (কমরেড মণি সিংহ, পংকজ ভট্টাচায্য এবং আরও অনেককে) দেখতে পান। যতটুকু মনে পড়ে CTTI হোস্টেলে ৩-৪ দিন থাকার পর তাদেরকে বরদোয়ালী স্কুল অবস্থিত ক্যাম্পে পাঠানো হলে নুরুল হক ও কাজী আকরাম সেখানে কমরেড মঞ্জুরুল আহসান খান (সাবেক সিপিবি সভাপতি) এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। এর কিছুদিন পর তাদেরকে বরদোয়ালী ক্যাম্প থেকে আগরতলা কর্তাবাড়ী ক্যাম্পে পাঠানো হয়। সেখানে চট্টগ্রামের ছাত্রনেতা মাহবুবুল হক ও ঢাকার মাহফুজ আনাম এর সাক্ষাৎ লাভ করেন। কর্তাবাড়ীতে কিছুদিন থাকার পর উড়োজাহাজে (DC-8) করে ভারতের তেজপুরে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই Second batch-এ ট্রেনিংয়ের প্রধান ছিলেন কমরেড মঞ্জুরুল আহসান খান। ট্রেনিং চলাকালে নুরুল হককে ‘লেফটেন্ট’ বলে ডাকা হতো। এই batch এ ইয়াফেস ওসমান (বর্তমানে প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী ), নিজামউদ্দিন আজাদ (বেতিয়ারা যুদ্ধের শহীদ) এবং উদিচী শিল্পীগোষ্ঠীর মাহমুদ সেলিমসহ ৪০০ জন ছিলেন। সেখানে ৩ (তিন) মাস ট্রেনিং কোর্স ছিল। বি.এস.এফ-এর অফিসারগণ উক্ত ট্রেনিং প্রদান করেন। তিন মাসের ট্রেনিং এর শেষ পনের দিন বিশেষ ট্রেনিং এর জন্য Weapon পাঠানো হয়। এটি চীন সীমান্তের খুবই কাছে ছিল। যতদূর মনে পড়ে এই ট্রেনিং ক্যাম্পের নাম ভারুক পং। এই জায়গাটি বন্য জন্তুর অভয়ারণ্য ছিল। ধর্ম নগর থেকে মিলিটারী লরীতে যাত্রা শুরু হলে এর গন্তব্য Base camp এ, যা ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলে। মিলিটারী লরী অগ্রসর হতে হতে নোয়াখালীর বিলোনিয়ার কাছাকাছি ভারত সীমান্তের ভেরত বাইকোরা Base camp এ পৌঁছে। এই Base Camp এ থেকে ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশের ভিতরে মুক্তিযোদ্ধাদের চঁংয করা হয়। ফেনী থেকে সাত মাইল দূরে বেতিয়ারা গ্রামের সোজা পূর্ব দিকে ভারত এর ভৈরব টিলা-তে ১১ ই নভেম্বর’৭১ অবস্থান নেয়া হলো। ভৈরব টিলা থেকে রাত ১২টা পর চুপি চুপি ৪টা গ্রুপ (ঢাকা শহর, মানিকগঞ্জ, রায়পুরা এবং মুনসিগঞ্জ) একই সংঙ্গে একজন বেসামরিক গাইড (Civilian Guide) এর পেছনে সবাই অগ্রসর হন। .......... বাংলাদেশের ভিতরে প্রবেশ করে প্রথমে হাঁটতে হাঁটতে মুক্তিযোদ্ধারা নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে পৌঁছেন। বেগমগঞ্জ পৌঁছানোর পর বেগমগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের কাছে রাজাকারদের সাথে অন্য একটা মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপের যুদ্ধ চলার খবর পাওয়া গেল। সেই মুক্তিযোদ্ধারা সাহায্য চাওয়াতে তাদের সাহায্য করা হয়। সারাদিন যুদ্ধের পর সন্ধ্যার দিকে রাজাকররা আত্মসমর্পণ করলো। তারপর এই রাজাকার শত্রুদের দায়িত্ব নেয় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এবং রাতের মধ্যে তাদেরকে হত্যা করা হয়। সেখানের জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অভূতপূর্ব সংবর্ধনা জানায়। জনগণ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভালো ভালো খাবার নিয়ে আসে। নুরুল হক সহ অন্য সকল মুক্তিযোদ্ধারা বেগমগঞ্জে দিনের বেলায় বিশ্রাম শেষে রাতে হেঁটে হেঁটে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দেশে ফিরে আসলেন। ৩১ জানুয়ারি ’৭২ বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করা হলো মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এর নেতৃত্বে। উল্লেখ্য যে, নুরুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ডা: সোবহান সহ আতাউল গনি ওসমানীর স্বাক্ষরিত মুক্তিযুদ্ধের সনদপত্র হাতে পান। কিন্তু এরশাদের শাসনকালে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, কেন্দ্রীয় কমান্ড কার্যালয়ে উক্ত মুক্তিযুদ্ধের সনদপত্র জমা দিতে হয়। দুঃভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বিজয়ের ৪৮ বছর পরও নুরুল হক অনেক চেষ্টা করেও মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাননি। তাঁর নাম আজও গেজেটভুক্ত হয়নি। লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, যন্ত্রপ্রকৌশল বিভাগ, চুয়েট

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..