জাতীয় বাজেট ও পরিবেশ প্রশ্ন

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
পাভেল পার্থ : জাতীয় বাজেটকে বাংলাদেশ সরকার প্রণীত এক বার্ষিক দলিল বলে উল্লেখ করেছে জনপ্রিয় অনলাইন সার্চইঞ্জিন গুগল এবং উল্লেখ করেছে জাতীয় বাজেটে রাষ্ট্রের সাংবাৎসরিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়। কিন্তু একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বাজেট কেবলমাত্র আয়-ব্যয়ের হিসাবমাত্র নয়। এর মাধ্যমেই রাষ্ট্রের দর্শন ও রাজনৈতিক শ্রেণিচরিত্র প্রতিফলিত হয়। চলতি আলাপখানি জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পরিবেশ-মনস্তত্ত্বখানি আন্দাজ করতে চায়। ১৯৭৫ সনের পর থেকে বিশ্বব্যাংকসহ বহুপাক্ষিক দাতাদের খবরদারির মাধ্যমে প্যারিস কনসোর্টিয়ামে দেশের বাজেট নির্ধারিত হতো। আজ বাংলাদেশ সেই উপনিবেশ ছিন্ন করতে পেরেছে। দেশে মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে। ১৯৭২ সনে দেশে কোটিপতি ছিল দুজন, আর এখন ব্যাংকের হিসাবেই তা প্রায় ৫৬ হাজার! বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নয়া মেরু ও সমীকরণে এসে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুধার বিরুদ্ধে নানাভাবে মানুষ দাঁড়াতে পেরেছে। তবে ক্ষুধা নিবারণের পথ, পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে হয়তো তর্ক আছে। কারণ একতরফাভাবে কেবল মানুষের উন্নয়নের কথা ভাবতে গিয়ে আমরা আমাদের প্রিয় মাটি, পানি, বায়ু ও প্রাণের বৈচিত্র্যকে বিনষ্ট করে চলেছি। সকলের সাথে সকলে মিলে বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছি। হয়তোবা মানুষের যন্ত্রণা কিছুটা কমেছে, কিন্তু দেশেজুড়ে প্রাণ ও প্রকৃতি আজ নিদারুণভাবেই ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত। দেশ আজ এক মুদ্রানির্ভর অর্থনীতির বিস্ময়কর অগ্রযাত্রায় সামিল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণীত হয় ১৯৭২ সনের ৩০ জুন। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট বরাদ্দ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। মাত্র ৪৭ বছরে একই বাংলাদেশ আজ ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে ৫,২৩,১৯০ কোটি টাকা। প্রায় ৬৭০ গুণ। বাড়ছে বাজেট, বাড়ছে দেশের মানুষও। কিন্তু কমছে প্রাকৃতিক বন, নদী, জলাভূমি, কৃষিজমি ও প্রাণবৈচিত্র্য। প্রতিবছর দেশের জাতীয় বাজেট বাড়ে, কিন্তু কমতে থাকে জাতীয় পশুর সংখ্যা, হারিয়ে যায় জাতীয় পাখির আবাসস্থল। তাহলে এই উন্নয়ন অভিযাত্রা কী কেবল মানুষেরই জন্য? এভাবে কী এককভাবে মানব প্রজাতি দুনিয়ায় টিকে থাকতে পারবে? তাছাড়া মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কিছু খাতওয়ারী বাজেট দিয়েই কি কেবলমাত্র দেশের প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষা দেয়া সম্ভব? রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়নচিন্তা কি পরিবেশবান্ধব? আমাদের জাতীয় বাজেটগুলো কি মানুষ ছাড়া দেশের পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের কথা বিবেচনায় রাখে? কৃষি, দুর্যোগ, পানিসম্পদ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন’ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখাই কেবলমাত্র পরিবেশবান্ধব চিন্তা নয়। সামগ্রিক বাজেট চিন্তা ও ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ সুরক্ষার ছাপ থাকা জরুরি। আয়তনে ছোট হলেও প্রাণ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ও উন্নয়নচিন্তা ভিন্ন হওয়া জরুরি। দেশের প্রাণ ও প্রকৃতির আহাজারি ও যন্ত্রণাকে বিবেচনায় রেখেই দেশের জাতীয় বাজেট তৈরি হতে পারে। আর এটিই হয়ে ওঠতে পারে দুনিয়ার বুকে এক অনন্য দলিল, বাংলাদেশের সত্যিকারের পরিচয়। ২. “সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের” শিরোনামে প্রস্তাবিত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আয়-ব্যয় খাতই শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়, এবছরের বাজেট শিরোনামখানি খুবই আশাব্যঞ্জক। এখানে এক সমৃদ্ধ আগামীর চিন্তা করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশের সামগ্রিক পরিবেশ সুরক্ষাকে গুরুত্ব না দিলে এই সমৃদ্ধ আগামী কি সম্ভব? চলতি বাজেটের ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি হলে মাথাপিছু গড় ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০,৭৭৬ টাকা। কিন্তু মানুষের পাশাপাশি যদি এই প্রশ্ন করা হয় জাতীয় বাজেটের কতভাগে দেশের ২৩০টি নদী, ৩০টি কৃষি প্রতিবেশ ও ১৭টি হাইড্রলজিক্যাল অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ হলো? দেশের পাখি, পতঙ্গ, বৃক্ষ, শস্য, মাছ, সরীসৃপ, উভয়চর, গৃহপালিত ও বন্যপ্রাণীরা এই বাজেট থেকে কী পেল? হয়তো এর কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো আমাদের কাছে নেই। কিন্তু এর উত্তর আমাদের তৈরি করতে হবে, দেশের সকল প্রতিবেশ ও বাস্তুসংস্থান এবং প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য খাতওয়ারি বাজেট সুনির্দিষ্ট করা দরকার। দেশের সবচে বড় শিল্পখাত এখন গার্মেন্টস। এখানে অনেক গ্রামীণ নাগরিকের কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই শিল্পের কারণে নিশ্চিহ্ন হয়েছে প্রাকৃতিক বন, বিস্তৃত কৃষিজীবন ও জলাভূমি। বহুজাতিক কোম্পানির এরসব কারখানায় একটি জিন্সের প্যান্ট বানাতে প্রায় ২২০ লিটার পানি লাগে, তবে দেশের পানিসম্পদ সুরক্ষায় জাতীয় বাজেট কোথায় খাত বরাদ্দ করবে? কিংবা কাকে থামাবে আর কাকে চাঙ্গা রাখবে? ৩. পরিবেশ খাতে বাজেট কমছে না বাড়ছে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কিন্তু তারচে’ জরুরি হলো বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয় ১৮৫০ কোটি টাকা। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে আগের বছর থেকে ৭৩১ টাকা কমিয়ে বরাদ্দ রাখা হয় ১১১৯ কোটি টাকা। আবার ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি বাড়িয়ে বরাদ্দ রাখা হয় ১২৭০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ২২৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ১৪৯৬ কোটি টাকা করা হয়েছে। তার মানে পরিবেশ খাতে বাজেট বাড়লো না কমলো? সরাসরি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের জন্য এ বছরের বরাদ্দ ধরলে তা গতবছরের চেয়ে বেড়েছে, কিন্তু ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরের চেয়ে অনেক কমেছে। ২০১৯-২০ বাজেটে কৃষিমন্ত্রণালয়ের জন্য ১৪,০৫০ কোটি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ২,৯৩২ কোটি, পরিবেশ-বন ও জলবায়ু পরিবর্তন ১৪৯৬ কোটি, ভূমি ১৯৪১ কোটি এবং পািনসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৭৯৩৪ কোটি এই সব মিলিয়ে ২৮,৩৫৩ কোটি টাকার বরাদ্দকে ‘কৃষি খাত উন্নয়ন’ হিসেবে জাতীয় বাজেট বিবেচনা করেছে। চলতি বাজেটের এই চিন্তাখানি বেশ গুরুত্ববহ এবং এখানে এক স্পষ্ট প্রতিবেশ-রাজনৈতিক দর্শন আছে। রাষ্ট্র দেশের কৃষিখাতকেই দেশের পরিবেশ, বৈচিত্র্য, ভূমি, পানির কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চায়। তার মানে রাষ্ট্র এখনো দেশকে এক কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে সাজাতে চায়। যদি তাই হয় প্রশ্নটাও একইসাথে সেখানেই জুড়ে আছে। রাষ্ট্র তাহলে দেশের জন্য কেমন কৃষি চায়? কেমন কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা রাষ্ট্র আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশে দেখতে চায়? পরিবেশবিনাশী বিপদজনক রাসায়নিক কৃষি না প্রকৃতিনির্ভর প্রতিবেশবান্ধ কৃষি? তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের রাজনীতিতে তৈরি হওয়া বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য চাঙ্গা রাখার রাসায়নিক কৃষি দিয়ে কি কোনোভাবেই দেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও সমৃদ্ধ আগামী সম্ভব? সরকার জৈব কৃষি নীতি করেছে, সরকার সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা চালু করেছে, সরকার ভূগর্ভস্থ পানির আধার রক্ষা করতে মরিয়া, সরকার দেশের শস্যবৈচিত্র্যর সুরক্ষা দিতে চায়। তাহলে পরিবেশবান্ধব কৃষিদরদি সরকারের পক্ষে কি বহুজাতিক কোম্পানির সার-বিষ-বীজ নির্ভর বাণিজ্যিক কৃষিকে বাংলাদেশে চাঙ্গা রাখা সম্ভব? সরকার শস্যবীমা, কৃষিঋণ, প্রবীণ কৃষকের জন্য বিশেষ ভাতা ও পেনশন, দুর্যোগ ঝুঁকি বীমা এরকম নানাকিছু চিন্তা করছে। আমাদের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে ২০১০ সনে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে বহুজাতিক সিনজেনটা কোম্পানির হাইব্রিড সবল টমেটো বীজ কিনে লাখো কৃষক প্রতারিত হয়ে ক্ষতিপূরণ আদায় ও বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিল। হাইব্রিড ঝলক, আলোক, হীরা এসব ধানের ফলন বিপর্যয়ের বিরুদ্ধেও কৃষকেরা আন্দোলন করেছে। কৃষক ঠগতে চায় না, কৃষক কৃষি জমিকে বিনাশ করতে চায় না। কিন্তু যে কৃষিব্যবস্থা বহাল আছে তা জমির মাটি থেকে শুরু করে অণুজীব সবকিছু বিষ দিয়ে হত্যা করে। পুরো বাস্তুসংস্থান ওলটপালট করে দেয়। ত্হালে বিদ্যমান বাণিজ্যিক কৃষিব্যবস্থা কীভাবে পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখবে? কিংবা পরিবেশ খাতের বাজেট দিয়ে এই ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ করা বা সামাল দেয়া সম্ভব? ৪. পরিবেশ প্রশ্নে সবসময় দেশের নদী সুরক্ষা ও নদী দূষণের প্রসঙ্গ আসে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে শিল্পমন্ত্রণলায়ের বাজেট ধরা হয়েছে ১৫৫৬ কোটি টাকা। দেশের অন্যতম নদী বুড়িগঙ্গা মরেছে নগরের বর্জ্য ও ট্যানারী শিল্পের অত্যাচারে। দেশের সকল অঞ্চলের নদ-নদী ও জলাভূমি নানাভাবেই শিল্পদূষণের নিশানা। তাহলে পরিবেশ সুরক্ষার বাজেট কীভাবে একা এই দূষণ থামাবে? এখানে শিল্পমন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকেই পরিবেশের ব্যাকরণগুলো নিজের বুকে ধারণ করতে হবে। এ বছরের বাজেটে পাট মন্ত্রণালয়ের জন্য ৭৯৯ কোটি এবং রেল মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৬,২৬৩ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। পাটশিল্পের বিকাশ যেমন জরুরি তেমনি রেলের মতো পাবলিক পরিবহনের বিকাশও জরুরি। আর এ সবই মৌলিক পরিবেশ প্রশ্ন। বাংলাদেশের নদীসহ দুনিয়ার অধিকাংশ নদীতে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ভয়াবহমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। এই অ্যান্টিবায়োটিক এল কোথা থেকে? মানুষ ও গবাদি প্রাণিসম্পদ থেকে। তাহলে আমরা যদি নদীকে আজ দূষণমুক্ত করতে চাই, যুক্ত করতে হবে স্বাস্থ্যসেবাসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষকেও। পরিবেশ সুরক্ষার বাজেট তাহলে কতভাবে পরস্পরযুক্ত তা এখন থেকেই আমাদের খতিয়ে দেখা জরুরি। ৫. বাংলাদেশে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে অর্থ বিভাগ প্রথম ‘জলবায়ু সুরক্ষা ও উন্নয়ন বাজেট’ প্রতিবেদন তৈরি করে। পরবর্তীতে পরিবেশ ও বন, পানিসম্পদ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, দুর্যোগ ও ত্রাণ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, মহিলা ও শিশু, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ, স্থানীয় সরকার, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, ভূমি, শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ বিভাগ, খাদ্য, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, সমাজকল্যাণ এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এই বিশটি মন্ত্রণায়ের কাজ বিশ্লেষণ করে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। আমরা আশা করবো দেশের সকল মন্ত্রণালয় ও দফতরের কাজ ও বাজেট বিশ্লেষণ করেই পরবর্তীতে জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন প্রণীত হবে। বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এখানে যুক্ত করা জরুরি। পরিবেশ সুরক্ষার নানামুখী প্রশ্ন বাণিজ্য বিভাগের তৎপরতার সাথে জড়িত। বিশেষত দেশে ক্ষতিকর রাসায়নিক পণ্য আমদানি/রফতানির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন, পলিথিন নিষিদ্ধকরণ এবং দেশজ পাটজাত পণ্য বিপণন ও রফতানির ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরো বেশি সক্রিয় হতে পারে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এই তৎপরতা দেশের পাটশিল্পকে যেমন বিকশিত করবে পাশাপাশি পলিথিন বন্ধে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে। এ জন্য জাতীয় বাজেটে এ বিষয়ে বরাদ্দ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে থাকলেও সকল সংশ্লিষ্টজনকে নিয়ে এই কর্মসূচি সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট নিরসনে এবং ঘাত মোকাবিলায় অভিযোজন ও সক্ষমতা বাড়াতে আমাদের বাজেট দরকার, দরকার সুনির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনাও। পাশাপাশি আপদ-বিপদ ও দুর্যোগ মোকাবেলায়ও সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন, এক্ষেত্রে ত্রাণ ও সহযোগিতার চিন্তাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বরং জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধির খাত গুলোকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের সাথে জড়িয়ে থাকা বহুজাতিক করপোরেট ও ধনী দেশের নানাবিধ বাণিজ্য ও রাজনৈতিক দরবারকে বিশ্লেষণ করে এই সংকট মোকাবিলায় জাতীয় বাজেটের কতটুকু কীভাবে দায়ী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করা যায় সে বিষয়ে সক্ষমতা অর্জনও আজকের পরিবেশ-প্রশ্ন। ৬. আমরা দেশ থেকে কোন ধরণের পণ্য কোথায় রফতানি করবো তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি, তা না হলে প্রাণ কোম্পানির গুঁড়া হলুদের মতো সীসা থাকায় তা আবার মার্কিনমুলুক থেকে ফেরত পাঠানো হতে পারে। ঠিক একইভাবে বিদেশ থেকে খাদ্য, কৃষিজাত, প্রসাধনীসহ সকল ধরণ্যের পণ্য আমদানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। দুনিয়াজুড়ে জনসন অ্যান্ড জনসনের প্রসাধনী, কোক-পেপসি, ম্যাগী নুডলস এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মামলা হচ্ছে, ক্ষতি প্রমাণিত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে এসব পণ্য দেদারসে বাণিজ্য করছে। জাতীয় বাজেট উন্নয়ন প্রক্রিয়া যদি এসব সামাল না দিতে পারে তবে বিষাক্ত, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ক্ষতিকর পণ্যের জন্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরির পর তা সামাল দিতে আবার আমাদের নাগরিক জীবনেই রাষ্ট্র বাজেটের চাপ তৈরি করবে। এর জন্য আবার নানামুখী বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াবে। যেমন, ১৯৮৫ সনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদফতর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর ডিডিটি পাউডার আমদানি করেছিল। দীর্ঘদিন ধরে এই ৫০০ টন ডিডিটি চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে পড়েছিল। সম্প্রতি সরকার এই ডিডিটি নষ্ট করতে ‘পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ৩৫৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পে সরকার নিজে খরচ করবে ২১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। বাকি ৭০ কোটি ১০ লাখ দেবে গ্লোবাল ইনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটিজ এবং ৬৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা দেবে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। প্রশ্ন হলো সরকার যখন ডিডিটির মতো ক্ষতিকর পণ্য আমদানি করলো তাও করলো জনগণের টাকায় আবার তা নিষিদ্ধও করতে হচ্ছে জনগণের কষ্টের টাকায়। এ ধরণের উন্নয়নচিন্তা এবং এসব প্রাণঘাতি প্রকল্পের জন্য বাজেট বরাদ্দ কোনোভাবেই পরিবেশসুরক্ষার বিষয়টিকে প্রথমদিকে বিবেচনায় নেয়নি। আর তাই দেশের জনগণের টাকায় কেনা পণ্য নিষিদ্ধ করতে এখন আবার জনগণের উপরই চাপ তৈরি করছে রাষ্ট্র। জাতীয় বাজেট এবং উন্নয়নচিন্তাকে অবশ্যই পরিবেশবান্ধব মনস্তত্ত্ব গড়ে তুলতে হবে। বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সামগ্রিক পরিবেশ-প্রশ্নকে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আর তা না হলে উন্নয়ন ও বাজেট বরাদ্দ ভবিষ্যতের জন্য কেবল ভোগান্তি ও যন্ত্রণাই বাড়াবে, সরকারের সমৃদ্ধ আগামীর স্বপ্নপুষ্প বিকশিত হওয়ার পথ রুদ্ধ করবে। ৭. বাংলাদেশের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজেট হলেই ভ্যাট ও ট্যাক্স বেড়ে যাওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা। পাশাপাশি পরিবেশবিনাশী নানান উন্নয়ন প্রকল্প ও তৎপরতা বেড়ে যাওয়াও একটি বাজেট পরবর্তী সক্রিয়তা। প্রাকৃতিক শালবন বিনাশ ও জবরদখল করে সমানে কারখানা গড়ে তোলা, জলাভূমি ভরাট করে আবাসন বাণিজ্য, লাগাতার ইটভাটা, কৃষিজমির অবাধে অকৃষিখাতে ব্যবহার, প্রতিবেশগত সংকটপূর্ণ এলাকা ও বনভূমিতে শিল্পাঞ্চল ও বহুজাতিক খননের অনুমতি, পারমানবিক প্রকল্প, বৃহৎ বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প, সমানে বাণিজ্যক হাইব্রিড ফসলের বীজ আমদানি কী ক্ষতিকর সার-বিষ ব্যবসার প্রসার এমনতর পরিবেশবিনাশী তৎপরতাগুলো প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার পর আরো বেশি প্রবল হয়। আরো জোরালো হয়। দেখা যায় দেশের বাজেটের আকার বাড়ার পামাপাশি পরিবেশবিনাশী তৎপরতা গুলোরও বাণিজ্য ও মুনাফা দিনে দিনে বাড়ে। অন্যদিকে দেশে প্রাণ ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও সম্ভার কমতে থাকে। দারুণসব প্রাকৃতিক অঞ্চল ও বাস্তুসংস্থান তাদের টিকে থাকবার শেষ দমটুকুও হারিয়ে ফেলে। জনগণের টাকা দিয়ে সরকার মোটাদাগে ১৪ টি খাতে যেমন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, জনপ্রশাসন, জনশৃঙ্খলা, প্রতিরক্ষা, ভর্তুকি, প্রানোদনা, সুদ, জ্বালানী ও বিদ্যুৎ ইত্যাদির খরচ মেটাচ্ছে। কিন্তু এখানে মানুষবাদে দেশের পরিবেশ ও বৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও হিস্যা কতখানি এ প্রশ্ন খুব জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাও কি সমাজের সব শ্রেণি ও বর্গের মানুষ জাতীয় বাজেটে জায়গা পায়? দেশের আদিবাসী, দলিত, নগর দরিদ্র, বস্তিবাসী, ভাসমান, ভূমিহীন, মেহনতি ও শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন ও আকাংখা কী আমাদের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেটচিন্তায় প্রতিফলিত হয়? ৮. পরিবেশ ও উন্নয়ন যৌথসারথী। সত্যিকারের উন্নয়ন মানেই যেখানে পরিবেশ সুরক্ষার তৎপরতা গুলো জেগে থাকে। আবার অপরদিকে পরিবেশ সুরক্ষা মানেই সত্যিকারের উন্নয়ন। উন্নয়নের নামে পরিবেশকে কোনোভাবেই প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো যায় না, জোর জবরদস্তিতে প্রাণ ও প্রকৃতি সুরক্ষা করা যায় না। চারপাশের বাস্তুসংস্থানের জটিল অনবদ্য সম্পর্ক ও বিবেচনাকে বুঝতে জানতে নিজের ভেতর আকাংখা তৈরি হতে হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে এই পরিবেশ-আকাংখার বীজ বুনে গেছেন। প্রাণ ও প্রকৃতির প্রতি এক অনবদ্য দরদ ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর কাজ ও দর্শনে। কেবলমাত্র মানুষের জন্য দেশ নয়, অপরাপর প্রাণবৈচিত্র্যের কথা ভেবেই তিনি প্রথম বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেন। কেবল মানুষের জন্য নয়, উদ্ভিদবৈচিত্র্য সুরক্ষায় ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের যাত্রা শুরু করেন। কেবল গ্রাম নয়, নগরে বৃক্ষরোপণ ও প্রকৃতি সুরক্ষার কাজ তাঁর সময়েই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর এই পরিবেশচিন্তা বাংলাদেশকে জাগ্রত করুক। দেশের জাতীয় বাজেট ও উন্নয়নচিন্তায় পরিবেশবান্ধব দরদ বিকশিত হোক। জাতীয় বাজেটে সুনির্দিষ্টভাবে পরিবেশ সুরক্ষার খাত গুলোকে চিহ্নিত করে বিশেষ বরাদ্দ তৈরি হোক। জাতীয় বাজেটে পরিবেশ সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ুক এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অপরাপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষ নিজেদের বাজেট ও ব্যবস্থাপনাকে আরো বেশি পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলবে এই আমাদের প্রত্যাশা। পরিবেশ সুরক্ষা কোনোভাবেই কারো একার দায় বা দায়িত্ব নয়। এটি প্রজাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকবার এক মৌলিক শর্ত। কেবলমাত্র বরাদ্দই শেষ কথা নয়, এই বরাদ্দ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, এর ব্যবস্থাপনা কেমন এবং কিসের জন্য কী ধরণের কর্মসূচি নেয়া হচ্ছে এসব সকল কিছু মিলিয়েই পরিবেশ-প্রশ্ন। আশা করি রাষ্ট্র দেশের প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় সক্রিয় ও দরদি হবে, রাষ্ট্রের উন্নয়ন মনস্তত্ত্বে মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। কিছু লুটেরা ধনীর জন্য জাতীয় বাজেট নয়, জাতীয় বাজেট দেশের সকলের। কেবলমাত্র মানুষ নয়, দেশের সকল প্রাণ ও বাস্তুসংস্থান সুরক্ষায় জাতীয় বাজেট প্রণীত হোক। মানুষসহ দেশের সকল প্রাণসত্তা নিয়ে বাংলাদেশ আগামীর এক সমৃদ্ধ আখ্যান রচনা করতে চায়। আসুন সামিল হই সকলেই, এক পরিবেশবান্ধব দীর্ঘ অগ্রযাত্রায়। লেখক : গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..