মিয়ানমারে যুদ্ধাপরাধের নতুন অভিযোগ জাতিসংঘ তদন্তকারীর

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা বিদেশ ডেস্ক : মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিচ্ছিন্নতাবাদীরা দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় অস্থিতিশীল প্রদেশগুলোর বেসামরিক নাগরিকদের মানবাধিকার লংঘন করে নতুন যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতিসংঘের এক তদন্ত কর্মকর্তা। গত ২ জুলাই মানবাধিকার কাউন্সিলের কাছে মিয়ানমারের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ইয়াংঘি লি এ অভিযোগ করেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মিয়ানমারের যাতায়াত ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গত ২২ জুন রাখাইন ও চিন প্রদেশের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন বন্ধ করতে টেলিকম কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়। ‘শান্তি বিঘ্ন এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ে ইন্টারনেটের ব্যবহার’ রুখতে মন্ত্রণালয় ওই নির্দেশ দেয় বলে জানিয়েছে টেলিনর গ্রুপ। রাখাইন ও চিনে মোবাইল ফোন ‘ব্ল্যাক আউটের’ মাধ্যমে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সম্ভবত বড় ধরনের কোনো মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে গত সপ্তাহে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন লি। তিনি ওই আশঙ্কার বিষয়টি ২ জুলাই আরও বিস্তৃতভাবে হাজির করেন। ‘রাখাইন প্রদেশের উত্তরে ও দক্ষিণাঞ্চলীয় চিন প্রদেশের একাংশে আরাকান আর্মির সঙ্গে (সেনাবাহিনীর) যে সংঘর্ষ গত কয়েক মাস ধরে চলছে, তা বেসামরিকদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। তাতমাদাও (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) ও আরাকান আর্মির অনেক কাজই মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে; মানবাধিকার লংঘনের পাশাপাশি সম্ভবত এগুলো যুদ্ধাপরাধের মাত্রাও ছুঁয়েছে,’ বলেন তিনি। পালেতোয়ার ১২ নির্মাণশ্রমিক এবং বাংলাদেশ সীমান্তের কাছ থেকে ৫২ গ্রামবাসীসহ অনেক বেসামরিক লোককে আরাকান আর্মি অপহরণ করেছে বলে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলকে জানান লি। অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাসাজশ আছে এমন সন্দেহে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীও রাখাইনের অসংখ্য বাসিন্দাকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। আটক অনেকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে বলেও দাবি তার। এপ্রিলে সামরিক বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার বাঁশ সংগ্রহে ব্যস্ত রোহিঙ্গাদের ওপর গুলি ছুড়েছিল বলেও জানান জাতিসংঘের এ বিশেষজ্ঞ। চলতি বছর সহিংসতার কারণে ৩৫ হাজারের মতো লোক পালিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ইয়াংঘি লি বলেন, মিয়ানমারে অবস্থান করা রোহিঙ্গাদেরও অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ থেকে বাকিদের ফিরিয়ে আনা অসম্ভব। তারা সবাই মানবাধিকার সংকটের মুখোমুখি। আর এর দায়ভার মিয়ানমারের। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তাদের। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পর বছরের পর বছর ধরে নিপীড়ন ও নিধনযজ্ঞ চালানো দেশটির কর্মকর্তাদের বিচারের আওতায় আনতে জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ইয়াংঘি লি। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইতোমধ্যে পরিস্থিতি বিচারে ব্যর্থ হয়েছে। গত মাসে অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক অভিযানে সৃষ্ট সংকটে নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এই সংকট মোকাবিলায় ‘পদ্ধতিগতভাবে ব্যর্থ’ হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় তাদের ঐক্যবদ্ধ কোনও কৌশল ছিল না। এছাড়া নিরাপত্তা পরিষদের পর্যাপ্ত সমর্থনেরও অভাব ছিল। ইয়াংঘি লি বলেন, বিশেষ দূতের দেওয়া প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা চলছে মানবাধিকার পরিষদে। এদিকে মিয়ানমারে জাতিসংঘের এই বিশেষ দূতের অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের কর্মকর্তারা। জাতিসংঘে নিযুক্ত মিয়ানমারের দূত কিয়াও মো তুন বরং দাবি করেছেন যেন ইয়াংঘি লিকে তার চলমান দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মিয়ানমারের দূত বলেন, বিশেষ দূতের অভিযোগ নির্ভরযোগ্য নয়। তার দেশের সরকার অগাস্ট পর্যন্ত যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে এবং সংকট সমাধানে চেষ্টা করছে। তিনি দাবি করেন, জাতিসংঘের উচিত মিয়ানমারের সঙ্গে এক যোগে কাজ করে এর সমাধান করা। ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে ৭ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত টপকে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে বাস করা রোহিঙ্গার সংখ্যা দশ লাখেরও বেশি। ‘গণহত্যার উদ্দেশ্যে’ মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী ওই অভিযানে ব্যাপক খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগ করে বলে পরে জাতিসংঘের তদন্ত কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছিলেন। ইয়াঙ্গুনের সরকার এসব বর্বরতার অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার জবাবেই ওই অভিযান চালানো হয়েছিল।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..