‘লুটপাটের টাকার যোগান দিতেই এই মূল্যবৃদ্ধি’

৭ জুলাই সারাদেশে ৬টা-২টা হরতাল

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
একতা প্রতিবেদক : এই সরকার মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতির পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতকে লুটপাটের অন্যতম ক্ষেত্র হিসিবে পরিণত করেছে। সরকার গত দশ বছরে তাদের লুটপাট, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে উপর্যুপরি গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে আসছে। এবারো গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে জনগণের পকেট কেটে সরকার ও ব্যবসায়ীদের লুটপাটের টাকা যোগাতে। যে এলএনজি আমদানির ঘাটতি মেটানোর কথা গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে সেই এলএনজি প্রতিহাজার ঘনফুট বাংলাদেশ আমদানি করে ১০ ডলারে; আর ভারত আমদানি করে ৬ ডলারে। লুটপাটের টাকা যোগান দিতে গ্যাসের এই মূল্য বৃদ্ধি জনগণ মেনে নেবে না। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে, সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কামানোর দাবিতে এবং জনদুর্ভোগের বাজেটের প্রতিবাদে আগামী ৭ জুলাই দেশব্যাপী সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল সফল করার আহ্বান জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই বলেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। গত ২ জুলাই সকাল ১১টায় মুক্তিভবনের মৈত্রী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জোটের সমন্বয়ক ও ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, বাসদের নেতা বজলুর রশীদ ফিরোজ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাসদ (মার্কসবাদী)’র নেতা শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা বাচ্চু ভূঁইয়া, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা মমিনুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয় সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী বিইআরসি আবারো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ছাড়া বাসা-বাড়ি, বিদ্যুৎ, সার, শিল্প-কারখানা, সিএনজি, ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ সকল ক্ষেত্রে গড়ে ৩২.৮% গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ঘাটতি মিটাতে গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধির কথা হয়েছে। কিন্তু বিইআরসি-র গণশুনানীতে কোম্পানিসমূহের প্রতিনিধিগণ গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যৌক্তিকতা এবং গণশুনানীতে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি ও বিশষজ্ঞদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধির ফলে আবারো বিদ্যুতের দাম বাড়বে, বাড়বে বাসাবাড়ী, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানিসহ জনজীবনের ব্যয়। কৃষিসহ শিল্প উৎপাদন খরচ বাড়বে। ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন আরো দুর্বিসহ হয়ে পড়বে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতারা বলেন, গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে জনগণ নিয়মিত অর্থের যোগান দিয়ে আসলেও গত দশ বছরে বাপেক্সকে শক্তিশালী করে স্থলে ও সমুদ্রে দেশের গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের কার্যকর ব্যবস্থা সরকার গ্রহণ করেনি। সরকারের এই ভুলনীতি এবং দুর্নীতি-লুটপাট দেশকে এলএনজি নির্ভরতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধিকে যুক্তিযুক্ত করার চেষ্টা করছে। বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও আমরা একই নীতি দেখে আসছি। এর পিছনে দেশি-বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থ আছে। সরকারের এই অপতৎপরতা মেনে নেয়া যায় না। দেশে সিলিন্ডার গ্যাসের বিপুল চাহিদা রয়েছে। সিলিন্ডার ব্যবসাও ব্যবসায়ীদের অনিয়ন্ত্রিত মুনাফার ক্ষেত্র বানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাজেটে কৃষিখাত, শিল্পখাত, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নিম্ন আয়ের মানুষের স্বার্থকে অবহেলা করা হয়েছে। নেই কর্মসংস্থানের কোন দিকনির্দেশনা। বিশাল খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকগুলোর বেহাল অবস্থা নিয়ে স্পষ্ট কোন দিকনির্দেশনা নেই। উপরন্তু ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে বাড়বে দ্রব্যমূল্য। নিম্ন আয়ের মানুষে জীবনে নাভিশ্বাস উঠবে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি-বিদেশি খাত থেকে ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধে বিশাল বরাদ্দ অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে ঋণের জালে আবদ্ধ করে ফেলবে। লুটেরা বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠীর বিদ্যমান ব্যবস্থায় রাজনীতি ও অর্থনীতিতে দুর্নীতি ও লুটপাটের যে সংস্কৃতি চালু আছে, এবারের বাজেটে সরকার তা উলঙ্গভাবে প্রকাশ করেছে। তাই এই বাজেট লুটপাট ও দুর্ভোগের বাজেট। সংবাদ সম্মেলনে হরতাল সফল করতে ৩ জুলাই বিভিন্ন থানায় প্রচার মিছিল, ৪ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে গাবতলী অভিমুখে পদযাত্রা, বিভিন্ন থানায় গণসংযোগ; ৫ জুলাই গণসংযোগ, ৬ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে যাত্রাবাড়ী অভিমুখে পদযাত্রা, বিভিন্ন থানায় থানায় মিছিল ও জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে মশাল মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। আগের দিন বাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পরিষদ-এর এক জরুরি সভায় হরতালের এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জোটের সমন্বয়ক ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহ আলম, বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাসদ (মার্কসবাদী)’র শুভ্রাংশু চক্রবর্তী, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের আহ্বায়ক হামিদুল হক, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির মমিনুল ইসলাম, অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, বজলুর রশীদ ফিরোজ, সাজ্জাদ জহির চন্দন, আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, রুহিন হোসেন প্রিন্স, মানস নন্দী, ফখরুদ্দিন কবীর আতিক, বাচ্চু ভূঁইয়া, জুলহাসনাইন বাবু। হরতালে পরিবহন শ্রমিকদের সমর্থন: গত ৪ জুলাই সেগুনবাগিচার স্বাধীনতা হলে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময় করেন। পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ৭ জুলাইয়ের হরতালের দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন প্রদান করেন। বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জোটের সমন্বয়ক ও ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, বাসদ সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, কমিউনিস্ট পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদ (মার্কসবাদী)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মানস নন্দী, গণসংহতি আন্দোলনের মনিরউদ্দিন পাপ্পু, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশিদ ফিরোজ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য বহ্নি শিখা জামালী, সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জনাব শাহজাহান খান, সাদিকুর রহমান হিরু, ওসমান আলী, শিমুল বিশ্বাস, মোতাহার হোসেন। শ্রমিক স্বার্থবিরোধী বাজেটের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার আহ্বান: জনস্বার্থ উপেক্ষা করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং জনদুর্ভোগের বাজেটের প্রতিবাদে দেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসমূহের মোর্চা বাম গণতান্ত্রিক জোট আহূত আগামী ৭ জুলাই, রবিবার দেশব্যাপী অর্ধদিবস হরতাল কর্মসূচিতে সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। গত ৩ জুলাই গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’র সভাপতি শ্রমিকনেতা অ্যাড. মন্টু ঘোষ এবং সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা জলি তালুকদার এক বিবৃতিতে দেশের সকল শ্রমিক-জনতার প্রতি হরতাল সফল করার আহ্বান জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বলেন, শ্রমিকরা বাজেটে রেশন, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার জন্য বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিল। সরকার শ্রমিকদের দাবির প্রতি কর্ণপাত করেনি। উপরন্তু মালিকদের মুনাফার হাত বৃদ্ধির সহায়ক বাজেট পাশ করেছে। সরকার একদিকে শ্রমিক-মেহনতি মানুষের জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলেছে অপরদিকে জনগণের পকেট কেটে কতিপয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও মালিকগোষ্ঠীর সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেছে। এরই সর্বশেষ পদক্ষেপ গ্যাসের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি। নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, গার্মেন্ট শ্রমিকরা এদেশের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের সবচেয়ে অগ্রসর ও সংগঠিত অংশ। তারা সরকারের এই গণবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলবে। হরতালে ক্ষেতমজুর সমিতির সমর্থন : অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে, সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কমানোর দাবিতে এবং বাজেটে ক্ষেতমজুরসহ গরিব মানুষের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দিয়ে ধনীদের স্বার্থে বাজেট করার প্রতিবাদে ৭ জুলাই, রবিবার বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকে অর্ধদিবস হরতালে সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি। গত ৫ জুলাই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যকরি সভাপতি অ্যাড. সোহেল আহমেদ এবং সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন রেজা এক বিবৃতিতে গণমানুষের দাবি আদায়ের এই শান্তিপূর্ন হরতাল সফল করতে সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..