বাজেটের দহন-গ্যাসের আগুনে পুড়ছে মানুষ

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
মোহাম্মদ শাহ আলম : ভ্যাট নির্ভর, ঋণ নির্ভর, কর নির্ভর, বৈষম্য ও ধনিক তোষণ-নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত নিপীড়নের ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী বাজেট ঘোষণা ও পাশের পর সরকার ১ জুলাই থেকে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। সরকার ও লুটেরা গোষ্ঠী কারো কোনো কথা শুনতে চায় না- শুনছে না। সরকার ও লুটেরা গোষ্ঠী বেপরোয়া। আওয়ামী লীগ সরকার টানা দশ বছরে সাতবার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এক চুলা ৯২৫, দুই চুলা ৯৭৫ টাকা। আগে ছিল এক চুলা ৭৫০, দুই চুলা ৮০০- তারও আগে দুই চুলার দাম ছিল ৪৫০ টাকা। ২০০৮ সালে প্রতি ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সি.এন.জি) দাম ছিল ১৬ টাকা ৭৫ পয়সা। কিছুদিন আগে ৩৮ টাকা ছিল। ৩৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৩ টাকা করা হলো। এবারের গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির হারই সর্বোচ্চ, গড়ে প্রায় ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম কমলেও বাংলাদেশে তা সব পর্যায়ে বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আবাসিক পর্যায়ে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ঠিকই কমিয়েছে ভারত। গত ১ জুলাই থেকে সিলিন্ডারপ্রতি তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ১০০.৫০ রুপি কমিয়ে ৬৩৭ রুপি নির্ধারণ করেছে ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন। এর আগে গত ৩০ জুন ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন এক বিবৃতিতে জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দর ও রুপির বিপরীতে ডলারের বিনিময়হার সুবিধাজনক থাকায় গ্যাসের দাম কমানোর এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। নতুন দাম অনুযায়ী গৃহস্থালিতে ব্যবহারের জন্য ভর্তুকি পাওয়া এলপিজির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯৪.৩৫ রুপি। অর্থাৎ গ্রাহকরা ৬৩৭ রুপিতে সিলিন্ডার কিনলেও পরে ১৪২.৬৫ রুপি ভর্তুকি হিসেবে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হবে। এখন বছরে ১৪.২ কেজির ১২টি সিলিন্ডারে ভর্তুকি দেয় ভারত সরকার। অতিরিক্ত ক্ষেত্রে বাজারদর অনুযায়ী সিলিন্ডার কিনতে হয় ভোক্তাকে বিদেশি মুদ্রার বিনিময়হার এবং বাজার অনুযায়ী ভর্তুকির পরিমাণ ওঠানামা করে।’ (সূত্র: আমাদের সময় ডেস্ক, ২ জুলাই ২০১৯)। বাংলাদেশ সরকারের এরকম কোনো নমনীয় নীতি গ্রহণ করার বালাই আছে বলে মনে হয় না। সরকারের নীতি হলো একরোখা। বাজেট নীতি ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয়, পণ্য উৎপাদন, ভোজ্যতেল, চিনি, বিদ্যুৎ, সুতা, রড, টাইলসসহ যেখানে গ্যাসের ব্যবহার হয় সেখানে তার প্রতিক্রিয়া পড়বে। এই বাড়তি খরচ ব্যবসায়ীরা নিজের ব্যাগ থেকে কি দেবে? দেবে না। জনগণের পকেট কেটে এই টাকা তারা পুষিয়ে নিবে। ফলে দেশের ৯৫ ভাগ মানুষ হবে স্তরভেদে আরো গরিব, ৫ ভাগ মানুষ হবে আরো ধনী। ধনীদের এই টাকা দেশে থাকবে না। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের টাকা। শোনা যায় জ্বালানি খাতে লুটপাট হচ্ছে অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে। মানুষের জীবনপাত করা শ্রমে উপার্জিত টাকা বছরকে বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই যে, কৃষক, গার্মেন্ট শ্রমিক, বিদেশে কর্মরত শ্রমিক ও অন্যান্যদের কষ্টে উপার্জিত টাকা ঋণখেলাপী ও পাচারকারীরা পাচার করছে তার কোনো প্রতিকার নেই। রাষ্ট্রে সমস্ত নীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি এদের স্বার্থে চালিত হচ্ছে। রাষ্ট্রটা এদের সিন্ডিকেটে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র-প্রশাসন সংসদ এদের দখলে। সরকারি দলের রাজনীতিবিদরাও ছিটকে পড়েছে। দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্বস্তিকর। অর্থনীতি-রাজনীতিতে নৈরাজ্য, সমাজ-সংস্কৃতিতে মূল্যবোধের অবক্ষয়, সড়কে মৃত্যুর মিছিল, ক্ষমতার উচ্চ পর্যায় থেকে তৃণমূল পর্যন্ত আকণ্ঠ দুর্নীতি। ব্যাংকে হরিলুট চলছে-নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাংক ব্যবস্থাপনা। গুম-খুন-বিচার বহির্ভুত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, বিচার ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, দলীয়করণ ও হুকুমদারীর করণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর ও ভেঙে পড়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন মহামারীর রূপ নিয়েছে। শ্রমিকের ধর্মঘট ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-এলাকা-পাড়া-মহল্লা সরকার-সরকারি দল ও দুর্বৃত্তদের দখলে। বরগুনার প্রকাশ্য দিবালোকের হত্যাকাণ্ড তার প্রমাণ। বরগুনায় নয়ন বাহিনী, অন্য জায়গায় অন্য বাহিনী। বাংলাদেশের কোনো গ্রাম-মহল্লা কি দুর্বৃত্তমুক্ত আছে? উন্নয়ন হচ্ছে! উন্নয়ন প্রয়োজন। উন্নয়নের নীতি কৌশল কি? প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ এই উন্নয়নে রক্ষিত হচ্ছে কি? উন্নয়নের নামে উগ্রতা নয়, মানুষ চায় ভারসাম্যমূলক উন্নয়ন। উন্নয়নে চলছে বৈষম্য ও দুর্নীতি। মেগা প্রজেক্টে মেগা দুর্নীতি। উন্নয়ন ব্যয় বিশেষ করে সড়ক উন্নয়নে ব্যয় বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে কয়েকগুণ বেশি। মিছিল-মিটিং-সমাবেশের অধিকার নেই– করতে হলে পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি প্রয়োজন। পারমিশন পাওয়া না পাওয়া তাদের মর্জির উপর নির্ভরশীল। প্রেস, মিডিয়া, সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রিত। ২০১৮-এর ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত নির্বাচনের ফলে মানুষের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র নির্বাসনে। গণতান্ত্রিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তি সংকোচিত ও সন্তস্ত্র। গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে Mean না করলেও যুক্তফ্রন্ট ও বিরোধী দল বিপর্যস্ত ও ছত্রখান। ফলে সরকারের বেপরোয়া মনোভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রের নির্বাহী, আমলা-প্রশাসন দেশ ও জনগণের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে মানুষ রাজনীতি নির্লিপ্ত ও অসহায় হলেও বিক্ষুব্ধ। এই অবস্থা থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায়, মুক্তি চায়, চায় অবলম্বন ও নেতৃত্ব। হঠাৎ বিস্ফোরণে নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হতে পারে। নৈরাজ্য দেশ ও জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে না। চাই পরিবর্তনের জন্য সচেতন সংগঠিত নেতৃত্ব। যারা ষড়যন্ত্রকারী নয়, গণতন্ত্রকে নিয়ে খেলবে না, গণতন্ত্রকে আমল করে, Mean করে– জনগণ চায় এরকম নেতৃত্ব। আগেই উল্লেখিত হয়েছে, রাষ্ট্র-প্রশাসন লুটেরা ব্যবসায়ী-দুর্নীতিবাজ আমলা ও লুটেরা রাজনীতিবিদের সিন্ডিকেশনের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। রাষ্ট্রের এই সিন্ডিকেশনের জন্য, মুক্ত বাজরের উন্মুক্ত লুটের জন্য সমাজ-অর্থনীতি ও রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব সংঘাত চলছে। কৃষক-কৃষিতে, শ্রমিক-শ্রমে-কলে-কারখানায়, স্বাস্থ্যে-শিক্ষায়, নারী-শিশু নির্যাতনে, সড়কে-যানবাহনে, সামাজিক নির্যাতন-নিপীড়নে, কর্মসংস্থান-বেকার সমস্যার সমাধানে, আইনের শাসন-গণতন্ত্রের জন্য অর্থাৎ সব পর্যায়ে যে দ্বন্দ্ব সংঘাত চলছে, তাকে বুঝা ও আবিষ্কার করা, হ্যান্ডেল করা সময়ের দাবি ও প্রয়োজন। আরোপিত নয়, বিরাজিত দ্বন্দ্বের মধ্যে রয়েছে শক্তির উৎস। (Contradiction, motion and development) দ্বন্দ্বের ফলে গতি, গতির ফলে উন্নতি। দ্বন্দ্বকে পাশ কাটিয়ে অগ্রগতি সম্ভব নয়। সম্ভব নয় বিকল্প গড়া। দ্বন্দ্বকে মোকাবেলা করেই এগুতে হবে। গণবিরোধী বাজেট, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে উত্তেজনা। বাজেটের দহনে-গ্যাসের আগুনে পুড়ছে মানুষ। গণবিরোধী বাজেট ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বাম গণতান্ত্রিক জোট সারাদেশে অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে। হরতাল সফল করতে জনগণের স্বার্থের যোদ্ধা প্রগতিশীল গণতন্ত্রপ্রেমী কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সাহসের সাথে নামতে হবে রাজপথে। লুটপাটের অর্থনীতি-লুটেরা রাজনীতি ও লুটেরা মূল্যবোধের কারণে সমাজের যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলছে, যা আগেই উল্লেখিত হয়েছে তাকে মোকাবেলা করে সমাজে স্থিতি ও জনগণের মুক্তি আনতে পারে বিকল্প অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মসূচি। কমিউনিস্ট পার্টির ১৭ দফাতে রয়েছে এই বিকল্প কর্মসূচি ও পথরেখা। যা জনগণের লড়াইয়ের মাধ্যমে হয়ে উঠবে যুগোপযোগী।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..