দখলে সংকুচিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সলঙ্গাহাট, কমছে রাজস্ব

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email
সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা : ডিএস রেকর্ডে সিরাজগঞ্জের সলঙ্গাহাটের জমির পরিমাণ ছিল ৫৪ একর। এরপর এসএ রেকর্ডের ৪৪ থেকে আরএস রেকর্ডে এসে হাটটির আয়তন গিয়ে দাঁড়ায় ২৭ একরে। অভিযোগ রয়েছে, জাল দলিলের মাধ্যমে স্থানীয় প্রভাবশালীরা বিরামহীনভাবে ঐতিহ্যবাহী এ হাটের জমি দখল করছে। নিয়ম না মেনে লিজ নেয়া জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে স্থায়ী পাকা স্থাপনা। এতে আয়তন তো কমছেই, কমছে হাটের রাজস্ব। ব্রিটিশ আমলে রায়গঞ্জের গাড়ুদহ নদের তীরে গড়ে ওঠে সলঙ্গাহাট। সিরাজগঞ্জের সব থেকে বড় এ হাটে সপ্তাহে দুদিন হাটবার ছাড়াও প্রতিদিন হাজারো মণ খাদ্যশস্য কেনাবেচা হয়। ধান, গম, চাল, তিল, কাউন, সরিষা, গবাদিপশু, সবজি, ফল, মসলা, কাপড়, মাছ ও মাংস বিক্রির জন্য রয়েছে পৃথক স্থান। কিন্তু সলঙ্গাহাটের এখন প্রধান সমস্যা দখলদারদের বেপরোয়া আধিপত্য। তারা পত্তনি, কবলা পত্তনি, হেবা, রায়তি, ওয়াকফ বর্গাচাষীসহ নানা শ্রেণিতে বিভিন্ন কৌশলে অবৈধভাবে হাটের জমি দখল করছে। বেদখল হওয়া জমিতে গড়ে তোলা হচ্ছে দোকান ও ধানের চাতাল। অবৈধ দখলের কারণে জমি কমে যাওয়ায় প্রতি বছর কমছে হাটের ইজারা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সলঙ্গাহাটের ইজারা ছিল ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরে হাটের ইজারামূল্য কমে হয় ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ফলে এক বছরেই হাট থেকে সরকারের রাজস্ব কমেছে ৪০ লাখ টাকা। এছাড়া দখল করা জমিতে নির্মিত ভবনের কারণে রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এতে সৃষ্ট যানজটের কারণে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতা ও বিক্রেতারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানায়, বিত্তবান প্রভাবশালীরা বিভিন্ন সময় হাটের ও আশপাশের সরকারি জমি লিজ নিয়ে দখল করছেন। এর মধ্যে ঘুড়কা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান সরকার, তার ভাই আলাউদ্দিন সরকার, তাদের ভাগ্নে ইকবাল, সলঙ্গার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কালিপদ কু-, আনোয়ার আমিন, হাবিবুর রহমান বাচ্চু, আকবর মাস্টার, শুকুর মণ্ডল গংদের নাম উল্লেখযোগ্য। এরাই হাটের বেশির ভাগ জায়গা দখল করে আছেন। নিয়ম অনুযায়ী লিজ নেয়া এসব জমি বিক্রি করা কিংবা সাব-লিজ ও বন্দোবস্ত দেয়া যাবে না। এছাড়া এ জমিতে কোনো পাকা ভবন নির্মাণেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম না মেনে লিজ নেয়া জমি বিক্রি করা হচ্ছে। অনেকেই পাকা ভবন তৈরি করে ভাড়া দিচ্ছেন। সরেজমিন দেখা যায়, হাটের ধান বিক্রির অংশের প্রবেশমুখে পাকা রাস্তার অর্ধেক দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন জিল্লুর সরকার। ফলে এখানে প্রতিদিনই প্রচণ্ড যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, লিজ নেয়া জমি অন্যের কাছে বিক্রি করেছেন ব্যবসায়ী কালিপদ কু-ু। সলঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আশরাফুল ইসলাম ছানোয়ার বলেন, ‘ধাইনা’ হাটের সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করে এ স্থাপনা নির্মাণ করছেন জিল্লুর সরকার। তার মতো আরো অনেকেই এ কাজ করছেন। এতে জেলার ধান ও পাটের বৃহৎ এ হাটের জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে কমছে বড় পাইকারি ব্যবসায়ীর সংখ্যাও। হাটের ইজারাদার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম লাবু বলেন, জায়গা কমে যাওয়ায় চলতি বছর হাটের ইজারা মূল্য কম হয়েছে। এভাবে হাটের জায়গা দখল হতে থাকলে আগামীতে ইজারা মূল্য আরো কম হবে। তিনি দ্রুত অবৈধ দখলদারদের থেকে হাটের জায়গা পুনরুদ্ধারের দাবি জানান। অবৈধ দখলের বিষয়ে কথা হলে ঘুড়কা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান সরকার তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কথা অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ১৯৬৮ সালে লিজ নিয়ে ১৯৮১ সালে তৎকালীন এসডিওর কাছ থেকে এসব জমি দলিলমূলে ক্রয় করি। এসিল্যান্ড ও ইউএনও জমি পরিমাপ করে দেয়ার পর আমি ভবন নির্মাণ শুরু করেছি। অবৈধ দখলের প্রশ্নই ওঠে না। আমিও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের পক্ষে। এ বিষয়ে একই কথা জানান কালিপদ কু-ুও। তিনি বলেন, আমি নিয়ম মেনে সরকারের কাছ থেকে জমি কিনে বিক্রি করেছি। সলঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি রায়হান গফুর বলেন, ডিএস রেকর্ড অনুযায়ী বর্তমানে সলঙ্গাহাটের প্রায় ২৭ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। তিনি এ জমি উদ্ধার করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানান। এ বিষয়ে অতিরিক্তি জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইফতেখার উদ্দিন শামীম বলেন, সলঙ্গাহাট জেলার সব থেকে বড় ও ঐতিহ্যবাহী একটি হাট। যদি কেউ সলঙ্গাহাটের সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করে থাকে, তবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..