ড. মোহাম্মদ নাসের আর নেই

এ ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়: সিপিবি

Facebook Twitter Google Digg Reddit LinkedIn StumbleUpon Email

একতা প্রতিবেদক: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সিপিবি’র রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসের আর নেই। গত ২৮ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্বরত অবস্থায় আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা ‘মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে’ তার মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে অতি জনপ্রিয় এ কমিউনিস্ট নেতা ও তাত্ত্বিকের বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে এবং বহু আত্মীয় স্বজন ও শুভাকাংখী রেখে গেছেন। বিশ্ব বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে বাদ আছর তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়; পরে সাহেব বাজার জিরো পয়েণ্টে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার লাশ দাফনের উদ্যেশ্যে বাগেরহাটে নিজ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। জিরো পয়েন্টে জানাযা শেষে ড. নাসেরের কফিনে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পুষ্পার্ঘ অর্পন করা হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন, সিপিবি রাজশাহী জেলা কমিটি , সিপিবি চাপাই নবাব গঞ্জ জেলা কমিটি, সিপিবি নওগা জেলা কমিটি, ওয়াকার্স পার্টি রাজশাহী, ন্যাপ রাজশাহী জেলা মহানগর কমিটি, মহিলা পরিষদ জেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ, কবিকুঞ্জ রাজশাহী, উদীচি রাজশাহী জেলা সংসদ, উদিচী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন রাজশাহী জেলা সংসদ, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, রাজশাহী জেলা, মহানগর, বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) মহানগর কমিটি, ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটি রাজশাহী জেলা মহানগর কমিটি, বাসদ জেলা কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আদিবাসী ছাত্র পরিষদ, রাজশাহী থিয়েটার, সিপিবি পুঠিয়া উপজেলা কমিটি, সাবেক প্যানেল মেয়র শরীফুল ইসলাম বাবু, সমাজ তান্ত্রিক ছাত্র ফন্ট , রাজশাহী জেলা কমিটি, বাকবিশিস রাজশাহী কমিটি, মুক্তিযোদ্বা মঞ্চ, তেল গ্যাস বন্দর বিদ্যুৎ জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটি রাজশাহী জেলা কমিটি, খেলাঘর আসর, রাজশাহী জেলা কমিমটি, ইলামিত্র সংসদ রাজশাহী। পরদিন ২৯ জানুয়ারি তাকে দাফন করা হয়। বাবা শামসুদ্দিন আহমেদ, মাতা মোছা. রেশাতুন্নাহারের ৫ সন্তানের মধ্যে কমরেড ড. মোহাম্মদ নাসের ছিলেন ষষ্ঠ। নারিন্দা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরে মোহাম্মদপুর গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন নাসের। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই ছাত্র ইউনিয়নের সংস্পর্শে আসেন নাসের। ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে প্রথম গ্রেডে বৃত্তি লাভ করেন। এবং মাধ্যমিক ঢাকা বোর্ডে তৃতীয় স্থান ও উচ্চ মাধ্যমিকে ৭ম স্থান লাভ করেন। মেধাবী ছাত্র হিসেবে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৭৮ সলে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবিতে) পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। সেখানে মেধাবী ছাত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপরিচিতি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন গড়ে তোলা ও স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পরিসংখ্যান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০২ সালে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায়ই ১৯৮০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর থেকে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। পার্টির দশম কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ লাভ করেন ও পার্টির তথ্য-গবেষণা বিভাগের সাথে আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন। সমাজের প্রতি দায়বোধ, মানুষের প্রতি ভালবাসা ও দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকাই ছিলো তার জীবনের ব্রত। শারীরীক অসুস্থতা কোনো কোনো সময় বাধা হলেও মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। সিপিবির শোক: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)’র কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সিপিবি’র রাজশাহী জেলা কমিটির সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসেরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটি। সিপিবি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমেদ এক বিবৃতিতে পার্টির পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, ছাত্রজীবনেই কমরেড নাসের বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে সিপিবি’র নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে বিপর্যয়ের সময় ও পরবর্তীতে তিনি মতাদর্শিক লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্বকে ধারণ করে, নানা বিচ্যুতির বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। একজন তাত্ত্বিক নেতা ও পার্টির লেনিন স্কুলের একজন প্রশিক্ষক হিসেবে মার্কসবাদ-লেনিনবাদের সৃজনশীল শিক্ষায় তিনি পার্টির তরুণ কর্মীদের গড়ে তুলতে সবসময় সচেষ্ট ছিলেন। রাজশাহীতে সিপিবি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক জোট ও উদীচী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, কমরেড নাসের শুধুমাত্র রাজনীতিবিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠকই ছিলেন না, ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক-শিক্ষাবিদ, ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলের প্রিয় ‘নাসের স্যার’ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে অন্য কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে পুলিশের গুলির সামনে ‘মানবঢাল’ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করছেন। অধ্যাপক নাসেরের অনেক গবেষণা আন্তর্জাতিক অনেক সেমিনারে উত্থাপিত ও আলোচিত হয়েছে এবং খ্যাতি অর্জন করেছে। সিপিবি’র নেতৃবৃন্দ আরো বলেছেন, কমরেড নাসেরের মৃত্যুতে দেশ এমন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হারালো, যিনি একই সাথে ছিলেন রাজনীতিবিদ, শিক্ষক-শিক্ষাবিদ ও গবেষক। তাঁর মৃত্যুতে বামপন্থী আন্দোলনসহ দেশের অসামান্য ক্ষতি হলো, যা সহজে পূরণ হবার নয়।

Print প্রিন্ট উপোযোগী ভার্সন



Login to comment..
New user? Register..